ভারতের হিন্দু অধ্যুষিত উত্তর প্রদেশের শহর অযোধ্যায় আগামীকাল সোমবার উদ্বোধন হচ্ছে প্রায় দুই হাজার কোটি রুপি ব্যয়ে নির্মিত রাম মন্দির। এ নিয়ে এত বেশি আলোচনার আরেকটি কারণ হলো বাবরি মসজিদ ভেঙে সেখানেই এ মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছে। এ মন্দিরের উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে অযোধ্যায় এখন সাজ সাজ রব। তবে শঙ্কা ও ভীতিতে রয়েছে স্থানীয় মুসলিমরা।
মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনএন বলছে, অযোধ্যায় প্রায় পাঁচ লাখ মুসলিমের বসবাস। স্থানীয় বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী মাওলানা বাদশাহ খান জানান, মন্দিরটি উদ্বোধনের দিন বাড়িতে থাকবেন।
৩০ বছর আগে বাবরি মসজিদ ভাঙা নিয়ে যে ধর্মীয় দাঙ্গা তৈরি হয়েছিল তা আবারও দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাদশাহ খান। ১৬ শতকে তৈরি মসজিদটি ১৯৯২ সালে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনরা ভেঙে ফেলে। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী অযোধ্যা হল রামের জন্মভূমি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, লোকসভার নির্বাচনে আগে বিজেপি তুরুপের তাস হিসেবে এ মন্দিরকে কাজে লাগাতে চায়। এটি হিন্দু জাতীয়তাবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষার একটি স্মৃতিস্তম্ভ।
বাদশাহ খান মনে করেন, বিজেপির সরকারের অধীনে মুসলিমদের যে অবজ্ঞা করা হচ্ছে এই মন্দির উদ্বোধনের আয়োজন তারই প্রমাণ দিচ্ছে।
তিনি বলেন, 'বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ক্ষত এখনও মনে রয়েছে।'
ভারতের সরকারের হিসাব বলছে, অযোধ্যার রাম মন্দির নির্মাণকার্যের জন্য আনুমানিক ১৮০০ কোটি রুপি ( বাংলাদেশি মুদ্রায় দুই হাজার ৩৭০ কোটি টাকা)। এখনো পর্যন্ত এই রাম মন্দির সম্পূর্ণ নির্মাণ হয়নি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শেষে এই মন্দিরের প্রথম ও দ্বিতীয় তলার নির্মাণ কার্য সম্পন্ন হবে। ২০২৫-এর শেষে এই মন্দিরের সব কাজ সমাপ্ত হওয়ার কথা রয়েছে। আগামীকাল সোমবার প্রায় ১১ হাজার মানুষ অযোধ্যার রাম মন্দির উদ্বোধনের আয়োজনে উপস্থিত থাকার নিমন্ত্রণে পেয়েছেন। এরমধ্যে ভারতের বেশ কয়েকজন হাইপ্রোফাইল রাজনীতিবিদও রয়েছে।
এমন উৎসবের আমেজেও অযোধ্যার মুসলিমের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ নিয়ে স্থানীয় ধর্মীয় সংগঠনের প্রধান ৩৯ বছর বয়সী আজম কাদরি বলেন, '১৯৯২ সালের সহিংসতা যারা দেখেছেন তাদের কাছে বাইরের লোকজন আসায় আরও শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। যখনই বাইরে থেকে লোকজন আসে তখনই ঝামেলা হয়। কেউ আর তাদের মূল্যবান জিনিসপত্র, সঞ্চয় বা পরিচয়পত্র হারাতে চায় না। পুনরায় জীবন শুরু করা অত সহজ নয়।'
অযোধ্যায় রাম মন্দির উদ্বোধনের আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কঠোরভাবে কিছু নিয়ম ও আচার-অনুষ্ঠান অনুসরণ করছেন বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। সূত্রের বরাত দিয়ে এনডিটিভি জানিয়েছে, আচারের জন্য ‘যম নিয়ম’ কঠোরভাবে অনুসরণ করছেন মোদি। তিনি শুধু কম্বল গায়ে মেঝেতে ঘুমাচ্ছেন ও ডাবের পানি পান করছেন।
পাশাপাশি পালন করছেন বিশেষ ডায়েট। ফলে খাবার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন পেঁয়াজ, রসুনসহ বেশ কিছু আইটেম।
১২ জানুয়ারি থেকে মন্দিরের পবিত্রতার আচার শুরু হয়েছে। ২২ জানুয়ারি মন্দিরে প্রাণ প্রতিষ্ঠার পূজা করবেন মোদি। লক্ষ্মীকান্ত দীক্ষিতের নেতৃত্বে পুরোহিতদের একটি দল প্রাণ প্রতিষ্ঠার মূল আচার সম্পাদন করবে।
মন্দির কমিটি বলেছে, ‘প্রাণ প্রতিষ্ঠা’ মানে মূর্তিকে ঐশ্বরিক চেতনায় আত্মসাৎ করা এবং মন্দিরে পূজা করা প্রতিটি মূর্তির জন্য এটি অপরিহার্য। এর জন্য শুভ সময় ২২ জানুয়ারি দুপুর সাড়ে ১২টা।
১৯৯২ সালে হওয়া ধর্মীয় দাঙ্গা কাছ থেকে দেখেছেন অযোধ্যার বাসিন্দা হাজী মাহবুব। তিনি বলেন, স্থানীয় মুসলমানরা এ নিয়ে উদ্বিগ্ন কারণ উদ্বেলিত জনতা তাদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক স্লোগান দেবে। তারা অযোধ্যা থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করে হিন্দু রাষ্ট্র (জাতি) করার আহ্বান জানাবে।
২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর ঐতিহাসিক অযোধ্যা মামলার রায় দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ। ওই রায়ে অযোধ্যার মূল বিতর্কিত ২ দশমিক ৭৭ একর জমি শিশু রাম বা 'রামলালা'কে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল শীর্ষ আদালত। এরপর অযোধ্যার মুসলিমরা ভেবেছিল যে, বাবরি মসজিদ নিয়ে বিতর্কের এখানেই শেষ হবে। কিন্তু তা হয়নি।
২০১৪ সালে মোদির নেতৃত্বে ভারতের ক্ষমতায় আসে বিজেপি। দলটি অর্থনীতি ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ ভারতব্যাপী ছড়িয়ে দিচ্ছে।
অযোধ্যা বিরোধ মামলার রায়ের পর উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যার ধান্নিপুরে একটি মসজিদ নির্মাণের আদেশ দেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট । এই মসজিদ অযোধ্যার রাম মন্দির থেকে প্রায় বাইশ কিলোমিটার দূরে নির্মাণ করার কথা রয়েছে। তবে এর কাজ এখনও শুরু হয়নি বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
এই মসজিদ নির্মাণের দায়িত্ব পান বিজেপির সদস্য আরাফাত শেখ। তিনি জানান, এই মসজিদ নির্মাণ কাজের আগে তিনি কখনোই অযোধ্যায় আসেননি।
এ মসজিদেও গেরুয়া রং ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ নিয়ে আরাফাত শেখ বলেন, এই রং গরীবে নেওয়াজ ও বিখ্যাত দরবেশরা পছন্দ করতেন। এটি ভারতে দুটি সম্প্রদায়কে কাছাকাছি নিয়ে আসবে।
১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনা নিয়ে দ্য ডিমোলিশন অ্যান্ড দ্য ভার্ডিক্ট নামের একটি বই লিখেছেন নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, সোমবারের উৎসবে মোদির সভাপতিত্ব করার সিদ্ধান্তই ভারতে হিন্দু আধিপত্যের লক্ষণ।
সূত্র: সিএনএন, এনডিটিভি, হিন্দুস্তান টাইমস, নিউজ১৮



