যেকোনো সংঘাতই জনজীবনে পরিবর্তন আনে। আর সেই সংঘাত যদি যুদ্ধের মাত্রায় হয় এবং একের পর এক গোলার আঘাতে হাজার হাজার মানুষ মরতে শুরু করে, তখন তার প্রভাবের বলয়টা আরও বড় হওয়াই স্বাভাবিক। এই প্রভাব থেকে বাঁচতে পারে না সাধারণ মানুষও। বিশ্বের যে প্রান্তেই যুদ্ধ হোক না কেন, তার প্রভাব পড়ে সব মানুষের ওপর।
বিশ্ব অনেক দিন ধরেই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশে দেশে নানা অস্থিরতা ও সংঘাতের মধ্যে তাই যখন ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ হাজির হয়, তখন সারা বিশ্বের মানুষের কপালেই ভাঁজ পড়েছে। সে ভাঁজ এখনো আছে। এর মধ্যে গত ৭ অক্টোবর নতুন করে শুরু হয়েছে আরেক যুদ্ধ। মানুষ যথারীতি দুই শিবিরে ভাগ হয়ে তর্ক করছে, পক্ষ নিচ্ছে, আলোচনা করছে। এটা মানুষ স্বভাব। আর এই করতে করতে সে ভুলে যাচ্ছে যে, যেখানেই যুদ্ধ হোক, তার ব্যয় তার পকেট থেকেই মেটাতে হবে।
বিশ্বায়নের এই যুগে কোনো সংকটই আর ঘরোয়া নেই। সংকটও এক বিশ্বায়িত পণ্য, যা মুক্তবাজারের বহুবিচিত্র গলিঘুপচি দিয়ে ঠিকই ঢুকে পড়ে ভেতরমহলে। অনেকটা অজান্তেই থালায় সাজানো খাবারে ভাগ বসায়, পকেটে দেয় টান।
কীভাবে? সহজ উত্তর—বাজারে চোখ বোলান। কী দেখছেন? সবকিছুর দাম বেশি? হ্যাঁ, এটা শুধু আপনি নন, সবারই বাস্তবতা। এ ধরনের চরম অস্থির সময়ে আয়ের সাথে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রক্ষা করতে অধিকাংশ মানুষকে হিমশিম খেতে হয়। মনে হয় দ্রব্যমূল্যের মুখোশে এক বিরাট পাথর যেন চেপে বসছে বুকের ওপর।
কেন হয় এমন? সোজা বাংলায় ‘অনিশ্চয়তা’। অনিশ্চয়তা কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়। আজকের বাজার অর্থনীতির যুগে এর সবচেয়ে বড় শিকার বাজার। যেকেনো সংঘাতের ফলে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা সবার আগে ভর করে বাজারে। অবশ্য বাজারের সব পণ্যের ওপর একসাথে নয়। এখানেও ধারা থাকে। প্রথম আক্রান্তের তালিকায় থাকে জ্বালানি তেল, সোনা ইত্যাদি।
ইসরায়েল–হামাস সংঘাতের প্রথম খবরেই তাই প্রথম অস্থিরতা দেখা দেয় জ্বালানি তেলের বাজারে। ইসরায়েলে হামাসের হামলার দ্বিতীয় দিনে সৃষ্ট উত্তেজনার জেরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে। এ ধারা এখনো অব্যাহত। বাণিজ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট লাইভমিন্টের তথ্যমতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে সর্বশেষ ১২ অক্টোবরও ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৭ ডলার ২ সেন্ট হয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি।
গত মাসে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৯০ ডলার পেরিয়ে যাওয়ার পর আবার কিছুটা কমেছিল। তখনই বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারীরা ঘোষণা দিয়েছিল, সম্মিলিতভাবে তাদের তেল উৎপাদন হ্রাসের সিদ্ধান্ত ডিসেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। মূলত রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে রাশিয়ার জ্বালানি তেল বিক্রি বাধাগ্রস্ত হলে সৌদি আরবের সাথে দেশটি একটি সমঝোতায় আসে। সমঝোতা অনুযায়ী তারা তেল উৎপাদন কমিয়ে দেয়। এতে বিপাকে পড়ে পশ্চিমা দেশগুলো।
যুদ্ধ বা এ ধরনের সামরিক সংঘাতের সময় আসলে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। ফলে কম উৎপাদনের পাশাপাশি কাজ করে সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রতিবন্ধকতা। সাথে যুক্ত থাকে নানামাত্রিক ভূরাজনীতি। এতে অবধারিতভাবেই দাম বেড়ে যায় জরুরি এই পণ্যের।
বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা হচ্ছে, যে হারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে এবং মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব আর কোথায় পড়ে? যুদ্ধের বা এ ধরনের অস্থিরতার প্রথম ভুক্তভোগীর তালিকায় আরও রয়েছে পুঁজিবাজার ও সোনার দাম। যেকোনো অনিশ্চয়তা প্রথমেই নানা উদ্বেগের ফেরি করে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারে। যদিও নাসদাকে প্রকাশিত এক নিবন্ধে মুদ্রা বিনিময় ও পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ মার্টিন টিলিয়ার অভয় দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু হামাসের হামলার পরপর প্রভাবশালী কয়েকটি পুঁজিবাজারে দরপতন অন্য কথা বলছে। এটা স্বাভাবিকও। কারণ, মানুষ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে নতুন করে কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। সে তখন নিরাপদ বিনিয়োগের রাস্তা খোঁজে। আর ইতিহাস সাক্ষী নিরাপদ বিনিয়োগের কাতারে সবার ওপরে এখনো সোনা।
ফলে এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে একদিকে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারে, অন্যদিকে বাড়ে সোনার দাম। মানুষ নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনা কিনতে শুরু করে বলে অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী চাহিদা–জোগানের অসাম্য থেকেই দাম বেড়ে যায় পণ্যটির।
এই কেনাকাটার সংকট কোথায়? সংকট হলো—এই কেনাকাটার মধ্য দিয়ে একটা বড় অঙ্কের অর্থ বন্দী হয়ে পড়ে। সোনায় মোড়ানো সেই টাকা অর্থনীতিতে কোনো প্রবাহ তৈরি করে না।
এর সাথে আছে ধাতুসহ সামরিক খাতের জন্য জরুরি বিভিন্ন কাঁচামালের চাহিদা বেড়ে যাওয়া। যুদ্ধ মানেই অস্ত্রের ঝনঝনানি। ফলে আরও আরও বেশি অস্ত্রের উৎপাদন তখন অবধারিত হয়ে পড়ে। অন্য খাত থেকে বিনিয়োগ সরে যেতে থাকে ক্রমেই। ফলে অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হয়। আর যুদ্ধ বা আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে সরবরাহ ব্যাহতের বিষয়টি তো রয়েছেই।
এই সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি এক নিদারুণ বাস্তবতা হিসেবে হাজির হয়। এতে যুদ্ধরত বা এর সাথে সরাসরি যুক্ত বিভিন্ন পক্ষগুলো আক্রান্ত হয় বেশি। বিভিন্ন পণ্যের বাজারদর বল্গাহীন ঘোড়ার মতো শুধু ছুটতে থাকে। আর বিশ্বায়নের বদৌলতে এই ঘোড়া ঢুকে পড়ে অন্য দেশগুলোতেও। ফলে আক্রান্তের কাতারে থাকে আসলে সবাই।
তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে এ সম্পর্কিত বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো একের পর এক সতর্কতা দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মুখ্য অর্থনীতিবিদ পিয়েরে অলিভারের কথার দিকে একটু মনোযোগ দেওয়া যাক। মরোক্কোতে চলতি সপ্তাহে বিশ্বব্যাংকের সাথে যৌথসভায় তিনি বলছেন, ‘বৈশ্বিক অর্থনীতি এই মুহূর্তে গড়িয়ে গড়িয়ে চলছে, ছুটতে পারছে না।’
একই সভায় বিশ্বব্যাংকের প্রধান অজয় বাঙ্গা আরও সোজাসুজি কথা বলেছেন। তিনি বলছেন, ‘এটি (ইসরায়েল–হামাস সংঘাত) একটি মানবিক সংকট এবং অর্থনীতির জন্য এক বড় ধাক্কা, যা আমরা চাই না।’
এটা কেমন? আগেই বলা হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি একটি বড় ইঙ্গিত। সিবিসি নিউজের তথ্য বলছে, হামাসের হামলার পর থেকে এখন পর্যন্ত ব্যারেলপ্রতি ৫ ডলার বেড়েছে। একই সাথে বড় ধাক্কা খেয়েছে ইসরায়েলের অর্থনীতি। এই ধাক্কা কিন্তু ইসরায়েলে আটকে থাকবে না। এটি ছড়িয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে কানাডাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফল ইন্টারন্যাশনাল গভরন্যান্স ইনোভেশন ইন ওয়াটারলুর প্রেসিডেন্ট পল স্যামসন সিবিসিকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো কিছুর প্রভাব সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার উচ্চঝুঁকি থাকে।’
কী রকম প্রভাব? একটু বিশেষজ্ঞ মতের সাথে মিলিয়ে নেওয়া যাক। মিসরিয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ আল–এরিয়ান বলছেন, ‘যদি এই সংকট আরও বাড়ে এবং এর সাথে আন্তর্জাতিক অন্য পক্ষগুলোও জড়িয়ে পড়ে, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতি আরও দুর্বল হবে। ভীষণভাবে বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতির চাপ। সে ক্ষেত্রে বাজারের পক্ষে এর কোনো সমাধান শুধু কঠিনই নয়, প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।’
আর সংঘাত বাড়ার প্রতিটি চিহ্ন তো এখন দৃষ্টিগ্রাহ্যই। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কথা ও কাজে অন্তত তেমন আলামতই মিলছে। ট্যাংকবহর নামানো হয়েছে, হুমকি দেওয়া হয়েছে সমুচিত প্রত্যুত্তর দেওয়ার। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ‘যুদ্ধের নিয়ম মানার’ জন্য ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানালেও এরই মধ্যে সব ধরনের সহযোগিতা তাঁর দেশ করে যাচ্ছে। অর্থাৎ, আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে বরাবরের মতো আগুনে ঘি ঢালার কাজটি নিষ্ঠার সাথেই করে যাচ্ছে এখন পর্যন্ত, যা এই সংকটের ডালপালা মেলবার ইঙ্গিতবাহী। কারণ, আমেরিকার আরও বেশি করে যুক্ততা ময়দানে আরেকটি ছায়াযুদ্ধের জন্য রাশিয়াকে টেনে আনবে নিশ্চিতভাবেই।
ফলে এই সংকট যত গাঢ় হবে, ততই এটি অর্থনীতির ওপর চেপে বসবে। বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতি, যা সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলিয়ে ছাড়বে। কারণ যুদ্ধের মূল্য শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই শোধ করতে হয়, সেটা মরেই হোক, আর না খেতে পেয়েই হোক। তাই আসুন আমরা খালি পেটে “জয় যুদ্ধবাবার জয়” বলে গলা চড়ানোর প্রস্তুতিটা এখনই শুরু করে দিই।



