বিএনপির সঙ্গে সংলাপের জন্য সরকারকে আমেরিকা যে আহ্বান জানিয়েছে, তা নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, খুনিদের সঙ্গে কোনো ডায়লগ নয়।
মঙ্গলবার গণভবনে তাঁর সাম্প্রতিক বেলজিয়াম সফর নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলেন এ কথা জানান সরকার প্রধান। এ সময় বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপে বসতে আহ্বান জানানোয় মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসেরও সমালোচনা করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেভাবে পিটিয়ে পিটিয়ে পুলিশ হত্যা করেছে, সেই খুনিদের সাথে আবার কীসের বৈঠক। খুনিদের সাথে আবার কীসের আলোচনা? সে (পিটার হাস) বসে ডিনার খাক, সে বসে ডায়লগ করুক। এটা আমাদের দেশ, আমরা স্বাধীনতা এনেছি রক্ত দিয়ে। আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম দেশ, এ কথাটা মনে রাখা উচিত। খুনিদের সাথে ডায়লগ, এটা আমাদের দেশের মানুষও চাইবে না। বরং বাংলাদেশের মানুষ এখন তাদের (বিএনপি) ঘৃণা করে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখানে বিরোধী দল বলতে যাদের পার্লামেন্টে এমপি আছে, নির্বাচিত প্রতিনিধি আছে তারাই হলো বিরোধী দল। এর বাহিরের গুলো কিন্তু দল হিসেবে গণ্য হয় না। আমেরিকাতেও হয় না। ট্রাম্পকে তাঁরা কি বলবে? ট্রাম্পের দলকে তাঁরা বিরোধী দল হিসেবেই দেখে। যদিও আমরা তাঁদের থেকে আলাদা সিস্টেমে। অনেকটা ওয়েস্ট মিনিস্টার টাইপের ডেমোক্রেসি আমরা অনুসরণ করি। এই যে মানুষগুলিকে হত্যা করা হলো, তাঁকে (পিটার হাস) একটা প্রশ্ন করা হলো না কেন সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে? যখন উপনির্বাচনে একটি ঘটনা ঘটেছিল। হিরো আলমকে কেউ মেরেছিল। তখন তাঁরা এটার বিচার দাবি করেছিল। এখন যখন পুলিশ হত্যা করল, এতগুলো সাংবাদিককে মারল, তখন তার বিচারটা তাঁরা দাবি করেনি কেন এ পর্যন্ত?’
মার্কিন নীতির সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আর তাঁরা কথায় কথায় আমাদের যেভাবে স্যংশন দেয়, এমনকি যারা সন্ত্রাস দমন করে তাদেরও স্যাংশন দেওয়া হয়। তাঁরা বলেছিল যারা নির্বচন বানচাল করতে আসবে তাঁদের স্যাংশন দেবে। আজকে তো হাতেনাতে প্রমাণ যে কারা করেছে। এখন স্যাংশন না দিয়ে আবার ডায়লগ করার অনুরোধ করে। তাদের নীতি নিয়েই তো প্রশ্ন আছে। এদের আমরা আর কি প্রশ্ন করব, আপনারা সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন। আমার জনগণ আছে আর আমার দেশ আছে। আমি এই নিয়েই আছি।’
বিএনপির সমালোচনা করে সরকার প্রধান বলেন, ‘যেটুকু অর্জন করেছিল তারা (বিএনপি), আমরাই সুযোগ দিয়েছিলাম, সেটা তারা হারিয়েছে। এখন মানুষের কাছে তারা ঘৃণার পাত্র।’
সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোরও সমালোচনা করেন সরকার প্রধান। তিনি বলেন, ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ মানবাধিকার সংস্থাগুলো চুপ কেন? তাদের মানবিক বোধগুলো গেল কোথায়? তাদের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো কথা শুনিনা বিবৃতি শুনিনা। প্রতিবাদ শুনিনা কিসের জন্য, কি কারণে। রহস্যটা কি? যারা সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্য সোচ্চার আজকে যখন ৪০–৪৫ জন সাংবাদিককে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠালো, পুলিশকে এভাবে মারল, আগুন লাগাল তখন তারা চুপ কেন?’
‘সন্ত্রাসীদের যেভাবে শিক্ষা দিতে হয়, সেটাই দেব’
গত শনিবারের বিএনপির সমাবেশ কর্মসূচির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি–জামায়াত যে সন্ত্রাসী দল এটাই তারা আবার প্রমাণ করল। কানাডার আদালত কিন্তু কয়েকবার এ কথা বলেছে। মাঝে কিছুটা রাজনৈতিক কর্মসূচি করছিল। সরকার কোনো বাধা দেয়নি। তবে একটাই শর্ত ছিল ভাংচুর করবে না। মানুষের আস্থাও তাঁরা পাচ্ছিল। ২৮ তারিখ যে ঘটনা তারা ঘটাল; যেভাবে পুলিশ হত্যা, সাংবাদিকদের ওপর হামলা।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘এরপর জনগণের ধিক্কার ছাড়া আর কিছু জুটবে না। হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স পুড়িয়েছে। ইসরায়েল যেভাবে গাজায় হাসপাতালে হামলা করল, তার সাথে তফাৎ দেখতে পাচ্ছি না। এরপর নিজেরাই পালালো, এখন আবার অবরোধ। কিসের অবরোধ? কার জন্য অবরোধ?’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘২৮ তারিখ উপমহাদেশে নদীর নিচে এত বড় টানেল আমরা করলাম। এটা দক্ষিণ এশিয়ায় আগে হয়নি। চট্টগ্রাম ব্যবসার কেন্দ্র। যখন উদ্বোধন তখন মানুষের ওপর হামলা। মানুষ খুন করছে। একদিকে পুলিশ অন্যদিকে সাংবাদিক। তাদের ওপরেই হামলা করছে। কারা করেছে নাম টাম সব। যা করেছে তা তো প্রকাশ্যে করেছে। গতকাল লালমনটিরহাটে যুবলীগের একজনকে হত্যা করেছে।’
বিএনপির স্বভাব বদলাবে না জানিয়ে সরকার প্রধান বলেন, ‘সাংবাদিকদের ওপর যেভাবে চড়াও হয়েছে, বুঝলাম না কেন। তারা তো তাদের (বিএনপি) পক্ষেই কথা বলছিল। এতো রাগ কেন তাদের ওপর বুঝলাম না। কোনো কোনো টিভিতে আমি তো চার নম্বর পাঁচ নম্বরে থাকি। তারা (বিএনপি) তো যথেষ্ট সুযোগ পাচ্ছিল। তাহলে কেন? এদের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ নেই। যতোই ভালো ব্যবহার করি স্বভাব বদলাবে না।’
বিএনপি নির্বাচন বানচাল করতে চায় জানিয়ে সরকার প্রধান বলেন, ‘নির্বাচনের বিষয়ে আমার ধারণা, এরা নির্বাচন চায় না। অস্বাভাবিক পরিস্থিতি চায়। গত কয়েক বছরে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ, এটা তো অস্বীকার করতে পারবেন না। কেউ কাজ করলেই খেতে পায়। মানুষকে কষ্ট দেওয়াই এদের চরিত্র। সন্ত্রাসীদের কিভাবে শিক্ষা দিতে হবে, সেটাই দেওয়া উচিত। এটাই আমরা দেব।’
‘যে হাতে আগুন দিয়েছে, সে হাত পুড়িয়ে দিতে হবে’
রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে যারা অগ্নিসংযোগ করছে, তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যারা আগুন দিচ্ছে, তারা আগেও এটা করেছিল। জামিন পেয়ে আবারও একই কাজ করছে। আমাদের দেশে মামলা তো সময় নিয়ে ইয়ে করে, এটাই সমস্যা। আমরা আলোচনা করব যারা এবার এটা করছে তাদের কিভাবে দ্রুত সাজা দেওয়া যায়। বিএনপিকে জিজ্ঞেস করা উচিত, তারা যে এগুলো করছে এতে তাদের কত লাভ হচ্ছে?’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘তাদের কোনো নেতাই নাই, মাইকবাজ আছে। শাস্তি এভাবে দিলে হবে না। যে হাত দিয়ে আগুন সে হাত পুড়িয়ে দিতে হবে। দেশবাসী বলব সচেতন থাকুন, যারা এগুলো করছে তাদের ধরিয়ে দিন। যারা আগুন দিচ্ছে তাদের ধরিয়ে দিন এটাই আমার আহ্বান। আগে কিন্তু মানুষই ঠেকিয়েছিল। এবারও তাই করবে।’
‘সোহরাওয়ার্দীকে ধরা হবে’
অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা লেফটেনেন্ট জেনারেল হাসান সারওয়ার্দীকে গ্রেপ্তার করা হবে বলে সাংবাদ সম্মেলণে জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হাসান সোহরাওয়ার্দী কীভাবে বিএনপি কার্যালয়ে বাইডেনের ভূয়া উপদেষ্টার সংস্পর্শে এলেন এ সম্পর্কিত একটি প্রশ্ন করা হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাঁকে ছাড়া হবে না। হচ্ছেও না।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হবে। খোঁজ করা হচ্ছে। ধরা হবে। কেন এটা করলো জিজ্ঞেস করা হবে। আইনের কাছে সবাই সমান। উনিই তো নিয়ে এসেছেন। ধরা হবে। ব্যবস্থা নেবো। নির্দেশ দিয়েছি।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের ভূয়া উপদেষ্টা মিয়ান আরাফী সম্বন্ধে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাজনীতিক দলের দরজা খোলা থাকে যে কেউ আসতে পারে। কিন্তু যেভাবে তাঁকে খাতির করা হলো, কথা বলতে দেওয়া হলো, যেভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে গেল এটাকে তাঁরা ইমেজ বারানোর জন্যই হয়তো ভাড়াটে লোক নিয়ে আসে। জিজ্ঞাসাবাদে তো এটা বেড়িয়ে এল।’
সরকার প্রধান বলেন, ‘সে মার্কিন নাগরিক। তাঁদেরই (আমেরিকা) এটা দেখতে হবে।’


সন্ত্রাসীদের যেভাবে শিক্ষা দিতে হয়, সেটাই দেব: প্রধানমন্ত্রী
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী
খুনিদের সঙ্গে কিসের সংলাপ: প্রধানমন্ত্রী
