মঞ্চে তিনি ‘নূরুলদীন’ কিংবা ‘গ্যালিলিও’, টিভি পর্দায় ‘বড় চাচা’ কিংবা ‘গণি মিয়া’—এমন নানা বৈচিত্র্যময় চরিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা আলী যাকের। তিন বছর আগে ২০২০ সালের এই দিনে তিনি করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এর আগে দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে ভুগছিলেন।
প্রয়াত এই অভিনেতার প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে সম্প্রতি নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় আয়োজন করেছিল ‘স্মৃতিতে স্মরণে আলী যাকের’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠান। এতে নাট্যজন মামুনুর রশীদ, নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, আসাদুজ্জামান নূর ও কলকাতার বিখ্যাত নাট্যকার বিভাস চক্রবর্তীসহ আরও অনেকে স্মৃতিচারণ করেন তাঁকে নিয়ে।
স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে নাট্যচর্চার স্বর্ণালি যুগের বীজ বুনেছিলেন যেসব অভিনেতা, তাঁদের মধ্যে অন্যতম আলী যাকের। মঞ্চে টিকিট কেটে নাটক দেখার প্রচলনের শুরু হয়েছিল এই অভিনেতার হাত ধরেই। ওই অনুষ্ঠানে সেদিন এই তথ্যটি উঠে এসেছিল আসাদুজ্জামান নূরের বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘আলী যাকের ছিলেন বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী। বাংলাদেশে তিনি নবনাট্য আন্দোলনের অগ্রণীদের অন্যতম। ঢাকায় দর্শনীর বিনিময়ে নাটক মঞ্চায়নের তিনি পথিকৃৎ। অভিনয় ও নির্দেশনায় তিনি যোগ করেছেন নতুন মাত্রা। কৃতী আলোকচিত্রী। প্রবন্ধ ও কলাম লিখেছেন। অংশ নিয়েছেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। সংগঠক ও ব্যবসায়ী হিসেবেও আলী যাকের সাফল্যের পরিচয় রেখেছেন।’
আসাদুজ্জামান নূরের এই কথাগুলো থেকেই বোঝা যায়, কতটা কর্মোদ্যমী ছিলেন একজন আলী যাকের। অভিনয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মে জড়িত ছিলেন তিনি। সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। এই ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণেও অবদান রেখেছেন আলী যাকের। নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাসকে তুলে ধরতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি হিসেবে আমৃত্যু কাজ করেছেন তিনি।

লেখালেখিতেও সরব ছিলেন আলী যাকের। সংস্কৃতি ও সমাজের নানা বিষয়ে একাধিক বই লিখেছেন তিনি। পত্রিকাতেও কলাম লিখতেন নিয়মিত। মৌলিক টিভি নাটক রচনার পাশাপাশি অনেক বিদেশি নাটকেরও অনুবাদ করতেন তিনি। কখনও কখনও নিজেই নাটকগুলোর নির্দেশনা দিতেন, অভিনয় করতেন। মঞ্চে তাঁর প্রথম অভিনয় আরণ্যক নাট্যদলের হয়ে মামুনুর রশীদের নির্দেশনায় মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকে।
পরবর্তীতে নাট্যজন আতাউর রহমান ও জিয়া হায়দারের আহ্বানে নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ে যোগ দেন আলী যাকের। এই দল থেকে আতাউর রহমানের নির্দেশনায় ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকে প্রথম অভিনয় করেন। আর এই নাট্যদল থেকে তাঁর প্রথম নির্দেশিত নাটক ছিল ‘বাকি ইতিহাস’। এ প্রযোজনার মাধ্যমেই বাংলাদেশে প্রথম দর্শনীর বিনিময়ে নাট্য প্রদর্শনীর সূচনা হয়।
পরবর্তীতে ‘গ্যালিলিও’, ‘তৈল সংকট’, ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’, ‘অচলায়তন’, ‘কোপেনিকের ক্যাপ্টেন’, ‘ম্যাকবেথ’ ও ‘নূরলদীনের সারাজীবন’সহ অসংখ্য নাটকে অভিনয় কিংবা নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।

আলী যাকের অভিনীত টেলভিশন নাটকের মধ্যে ‘বহুব্রীহি’, ‘আজ রবিবার’, ‘একদিন হঠাৎ’, ‘গণি মিয়ার পাথর’, ‘নীতু তোমাকে ভালোবাসি’ও ‘পাথর সময়’ উল্লেখেযোগ্য। চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘আগামী’, ‘নদীর নাম মধুমতী’, ‘লালসালু’ ও ‘রাবেয়া’।
দেশের শিল্পকলা ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন আলী যাকের।


‘আলী যাকেরের চশমাটি রেখে দিয়েছি’
পুরনোতেই আস্থা, মনোনয়ন পেলেন আসাদুজ্জামান নূর ও মমতাজ
