দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সরিয়ে জিএম কাদের ক্যু করে জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অভিযোগ করেছেন দলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এ কথা জানান।
বিবৃতিতে রওশন বলেন, ‘আমি বেগম রওশন এরশাদ জাতীয় পাটির প্রতিষ্ঠাতা কো–চেয়ারম্যান ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক এবং সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে সংসদ নেতা এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সহিত স্বাক্ষাৎ করেছি এবং বলেছি জিএম কাদের অবৈধভাবে জাতীয় পাটির নেতৃত্ব নেতৃত্ব দখল করায় এবং সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পাটির মনোনয়ন চূড়ান্ত করায় সুকৌশলে আমাকে এবং আমার সন্তান এরশাদপুত্র সাদ এরশাদকে এবং দলের গুরুত্বপুর্ণ নেতাদেরকে সরিয়ে দলের মধ্যে ক্যু করে করে দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সকল বিষয় অবহিত করেছি, দেশবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার অনুরোধ করেছি এবং গোলাম কাদেরের সাথে কোন নির্বাচনী জোট না করার অনুরোধ করেছি। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অধিক গ্রহণযোগ্য করার জন্য জাতীয় পাটি এককভাবে সারা দেশে প্রতিযোগিতা মূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে অনুরোধ করেছি। নির্বাচনে কোন জোট না করার অনুরোধ করছি।’
গত ২৭ নভেম্বর ২৮৭ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। এবার জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের দুটি আসন ঢাকা–১৭ এবং রংপুর–৩ থেকে দলটির মনোনয়ন পেয়েছেন চেয়ারম্যান জিএম কাদের।
এরশাদের মৃত্যুর পর ২০১৯ সালের অক্টোবরে রংপুর–৩ আসনে হওয়া উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন তাঁর ছেলে রাহগির আলমাহি সাদ এরশাদ। ধারণা করা হয়েছিল, এবারও তিনি এই আসনে মনোনয়ন পাবেন। প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদের জন্য ময়মনসিংহ-৪ আসন খালি রাখা হয়। কিন্তু পছন্দের আসনে মনোনয়ন না পেয়ে নির্বাচন করতে অস্বীকৃতি জানান রওশন এরশাদ ও সাদ এরশাদ।
রওশন নির্বাচনে না আসায় ময়মনসিংহ–৪ আসনে মনোয়নয়ন দেওয়া হয়েছে জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক আবু মুসা সরকারকে।
দলীয় মনোনয়ন নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান জিএম কাদেরপন্থী নেতাদের সঙ্গে রওশনপন্থী নেতাদের টানাপোড়েন চলছিল। জাতীয় পার্টির একাংশের নেতাদের অভিযোগ, দলে রওশনপন্থী হিসেবে পরিচিত নেতা–কর্মীদের এবার নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। রংপুর–১ আসন থেকে জাতীয় পার্টির হয়ে বরাবরই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এসেছেন দলের সাবেক মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা। রওশনপন্থী হিসেবে পরিচিত এই নেতা এবার মনোনয়ন পাননি। তাঁর জায়গায় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে এইচ এম শাহরিয়ার আসিফকে।
জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছাড়াও রওশন জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা। তিনি জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের স্ত্রী। দলের একটি অংশে তাঁর বেশ প্রভাব আছে বলে মনে করা হয়।
জাতীয় পার্টিতে গৃহবিবাদ নতুন কিছু নয়। ২০১৯ সালে এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে আসেন তাঁর ছোট ভাই জি এম কাদের। শুরু থেকেই এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছিলেন রওশন। দুজনই নিজেদের দলের চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেন। পরে অবশ্য সমঝোতার মাধ্যমে জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান ও রওশন এরশাদকে বিরোধী দলীয় নেতা করা হয়।
এরপর ২০২২ সালে আবারও দলের এই গৃহবিবাদ প্রকাশ্যে আসে। সে সময় এই দুই পক্ষের দ্বন্দ্বের অন্যতম কারণ ছিল আওয়ামী লীগের সাথে জোটে থাকা-না থাকাকে কেন্দ্র করে। জি এম কাদেরপন্থীদের চাওয়া ছিল মহাজোট থেকে বের হয়ে বিএনপির সাথে বা আলাদা করে নির্বাচনে অংশ নেওয়া। অন্যদিকে রওশনপন্থীদের চাওয়া ছিল মহাজোটেই থেকে যাওয়া।
একপর্যায়ে ওই বছরের আগস্টে থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই রওশন এরশাদ কেন্দ্রীয় সম্মেলন ডাকেন। সে সময় রওশনের ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজন নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করেন চেয়ারম্যান জি এম কাদের।
জিএম কাদেরের চেয়ারম্যান পদে থাকাকে চ্যালেঞ্জ করে একাধিক মামলাও করা হয়। এতে শুরুতে জি এম কাদেরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আদালত। পরে অবশ্য উচ্চ আদালতের রায়ে চেয়ারম্যান পদ ফিরে পান জিএম কাদের।
গত ১৫ নভেম্বর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। তফসিল অনুযায়ী ভোট হবে আগামী ৭ জানুয়ারি।


প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যা নিয়ে আলোচনা করলেন রওশন
যে কারণে নির্বাচনে যাচ্ছেন না রওশন
রওশন এরশাদকে অসহযোগিতার কোনো কারণ নেই: চুন্নু
