
আসন্ন ৯৬তম অস্কারে মনোনয়নপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘অ্যানাটমি অব আ ফল’। সেরা চলচ্চিত্র, সেরা চিত্রনাট্যসহ ৫টি বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছে এটি। ধরেন, এই সিনেমা সম্পর্কে আপনার কোনো আইডিয়া নেই। টিজার-ট্রেলার কিংবা কোন জনরার গল্প—তার কিছুই জানা নেই, তবুও দেখতে বসেছেন; কেমন হতে পারে সেই অভিজ্ঞতা?
প্রথমেই যে বিষয়টি নজর কাড়বে, তা সিনেমাটির চিত্রগ্রহণ ও লোকেশন। চোখে পড়বে তুষারঘেরা এক পাহাড়ি এলাকা। আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে পোষ্য কুকুর নিয়ে হাঁটছে এক কিশোর। এসব মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতেই ভ্রু কুঁচকে উঠবে আপনার! ছেলেটি তখন বাড়ি ফিরছিল। আর ফেরার পথে উঠোনে সে আবিষ্কার করে, লাশ হয়ে পড়ে আছে তার বাবা। এখানে কেন ‘দেখা’র বদলে ‘আবিষ্কার’ বলা হলো? কারণ কোনো এক দুর্ঘটনায় চোখের দৃষ্টিশক্তি হারাতে বসেছে সে। ফলে তাঁর একাকীত্বের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায় ওই কুকুরটি। যা হোক, তার বাবার কীভাবে মৃত্যু হলো, সেই রহস্য উদ্ঘাটন ও অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিতকে কেন্দ্র করেই সিনেমাটি।
মানুষটি কি কারও হাতে খুন হয়েছেন, নাকি কেউ তাকে বারান্দা থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে, নাকি এটি নিছক আত্মহত্যা—সিনেমাজুড়ে এসব ধাঁধায় ফেলে দেন নির্মাতা জাস্টিন ত্রিয়েত।

সিনেমাটি শুরু হয় লেখিকা সান্দ্রা ভয়েতের ও তাঁর স্বামী অধ্যাপক-লেখক স্যামুয়েল মালেস্কির ছাত্রী জো সলিডো নামের দুজন নারীর আলাপনে। ভয়েতেরের সাক্ষাৎকার নিতে তার বাড়িতে আসে সলিডো। তাদের প্রাণবন্ত কথা আর ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজতে থাকা ফিফটি সেন্টের ‘পিআইএমপি’ গানের তালে দর্শকও যেন ধীরে ধীরে মগ্ন হতে থাকেন সিনেম্যাটিক দুনিয়ায়। একপর্যায়ে সলিডো চলে গেলে, ঘরের ভেতর থেকে লেখিকা তার ছেলে সেই কিশোর ড্যানিয়েলের চিৎকার শুনতে পান। বেরিয়ে তিনি স্যামুয়েলের লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। একটু আগেই যিনি বাড়ির তৃতীয় তলায় উচ্চশব্দে গান ছেড়ে কিছু একটা করছিলেন। কিন্তু হঠাৎ কীভাবে এমন দুর্ঘটনা ঘটে গেল, কিছুই বুঝতে পারেন না ভয়েতের। তবে নানা কারণেই সন্দেহের তীর তার দিকে। কারণ, স্যামুয়েল মারা যাওয়ার সময় একমাত্র তিনিই ছিলেন বাড়িতে। অবশেষে তাকে দাঁড়াতে হয় আদালতের কাঠগড়ায়। চলে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের আইনি সংগ্রাম।
অ্যানাটমি অব আ ফল সিনেমাটি মূলত কোর্টরুম ড্রামা জনরার। কিন্তু চিত্রনাট্য এত নিখুঁত যে, প্রথমদিকে তা বোঝার কোনো উপায় নেই। যে কারণে আগে থেকে যাদের কোনো ধারণা থাকে না, তাঁরা হয়তো হঠাৎ করেই আবিষ্কার করবেন—বাহ, এ তো দেখি কোর্টরুম ড্রামা! মার্ডার মিস্ট্রিও বটে!

যেখানে সান্দ্রা ভয়েতেরের ভূমিকায় রয়েছেন জার্মান অভিনেত্রী সান্দ্রা হুলার। পর্দায় বেশ স্বতঃস্ফূর্ত তাঁর অভিনয়। প্রতি মুহূর্তের অনুভূতি যেন খেলা করে তাঁর মুখাবয়বে। এদিকে, স্যামুয়েল চরিত্রে আছেন ফরাসি অভিনেতা স্যামুয়েল থেইস। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি কম হলেও, সেটুকুতেই যথেষ্ট তিনি। গল্পের প্রাণ ড্যানিয়েল চরিত্রে আছে মাইলো ম্যাচাদো-গ্র্যানার। খুবই কিউট, যে কিনা মুহূর্তেই আপনার মন কেড়ে নেবে। আর সান্দ্রার আইনজীবী ভিনসেন্ট রেনজির চরিত্রে রয়েছেন ফরাসি অভিনেতা সোয়ান আরলাউড। শক্তিমান এক উপস্থিতি তাঁর। অন্যদিকে, দারুণ অভিনয় করেছে কুকুরটিও, চলচ্চিত্রে যার নাম স্নুপ, বাস্তবে মেসি। অস্কারে যদি সেরা প্রাণী অভিনয়শিল্পীর পুরস্কার থাকত, নিঃসন্দেহে সে এই পুরস্কার পেত!
পরিচালক সিনেমাটি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে শেষ অবধি কী ঘটবে বা ঘটেছিল, তা বোঝা কঠিন। একসময় মনে হবে খুনটি করেছেন সান্দ্রাই, আবার পরক্ষণেই দেখবেন উল্টো কাহিনি! এমন ভাবনার দোলাচল তৈরির পেছনে চাঞ্চল্যকর কিছু যুক্তি-তর্কের মুহূর্তও রয়েছে।

এদিকে, মানবিক কিছু বিষয়ের দৃষ্টান্তও দেখিয়েছেন ত্রিয়েত। পরিবারে অপ্রত্যাশিত বিপদ নেমে আসার মাঝে তিনি সামাজিক ও পারিবারিক কিছু সংকটের ছবিও দেখিয়েছেন। সিনেমাটি এগিয়েছে দুটি ভাষায়—ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি। কিন্তু সান্দ্রা ও স্যামুয়েলের মনের ভাব বিনিময়ের একমাত্র ভাষা ইংরেজি, কেননা দুজনেই ভিন্ন দেশের মানুষ। একজন ফরাসি, আরেকজন জার্মান। আর সিনেমাটি চিত্রায়িত হয়েছে ফরাসি আল্পসের দুর্গম এক অঞ্চলে। বিচারকার্যও পরিচালনা হয় ফরাসি ভাষায়, যে কারণে সান্দ্রা আরও মুশকিলে পড়েন। যদিও এ ক্ষেত্রে বন্ধুসুলভ আইনজীবী সোয়ান থাকাতে কিছুটা রেহাই পান তিনি। দুজনের রোমান্টিক এক অতীতের ইঙ্গিতও রয়েছে। এ ছাড়া সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি উঠে এসেছে তা হলো, পিতা-মাতার সঙ্গে সন্তানের বন্ধন। এই তিনের মাঝে দূরত্ব তৈরি হলে কতটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, সেই অকল্পনীয় বিষয়টিও ফুটে উঠেছে এই সিনেমায়। জায়গা পেয়েছে এ ধরনের চাঞ্চল্যকর মামলা বা ঘটনার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের অতিরঞ্জিত টক শো-র চিত্রও।
সিনেমাটির সবচেয়ে সুন্দর জায়গা এর সিনেমাটোগ্রাফি। যেখানে মুনশিয়ানা রয়েছে চিত্রগ্রাহক সাইমন বুফিসের। এরপরই আসবে চিত্রনাট্যের প্রসঙ্গ, যৌথভাবে যা লিখেছেন জাস্টিন ত্রিয়েত ও আর্থার হারেরি। এই দুজনের অনবদ্য সৃষ্টিই অ্যানাটমি অব আ ফল। ৭৬তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে ইতিমধ্যে যা স্বর্ণপাম জিতে নিয়েছে। এদিকে, এবারের অস্কারে সেরা ছবির দৌড়ে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় হয়ে এগিয়ে রয়েছে ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ওপেনহাইমার’। কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে যদি সেরা ছবি কিংবা পরিচালক বা চিত্রনাট্যকারের পুরস্কারটি জিতে নেয় অ্যানাটমি অব আ ফল, তাতে বিস্ময়ের অবকাশ নেই!


বার্বি কি শুধুই গোলাপি দুনিয়ার হাতছানি
যে মস্তিষ্ক শিশুর, জীবনটা মনস্টারের
বোমা বানাতে গিয়ে যাঁর মনটাই উড়ে গিয়েছিল
