সিরাজগঞ্জ শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীকে গুলি করার ঘটনা তদন্তে কাজ শুরু করেছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর গঠিত কমিটি। মঙ্গলবার দুপুরে ৩ সদস্যের তদন্ত কলেজে এসে কলেজ অধ্যক্ষ, অভিযুক্ত শিক্ষক ও ভুক্তভোগীসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক প্রশাসন অধ্যাপক ডা. বায়েজিদ খুরশীদের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের তদন্ত দল মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা থেকে মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের ক্যাম্পাসে আসে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন- স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক মহিউদ্দিন মাতুব্বর এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন।
তদন্ত কমিটি প্রথমে কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আমিরুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলে। পরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি গুলিবিদ্ধ আরাফাত আমিন তমালের সঙ্গে দেখা করে তাঁর চিকিৎসার খোঁজ নেয়। এরপর ক্যাম্পাসের প্রশাসনিক ভবনের ৩য় তলায় হলরুমে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে কমিটির সদস্যরা। তদন্ত কমিটি ঐদিন শ্রেণীকক্ষে থাকা ৪৫ শিক্ষার্থীর কয়েকজনের সঙ্গেও কথা বলে।
এসময় শিক্ষার্থীরা অভিুযুক্ত শিক্ষক ডা. রায়হান শরিফের বিএমডিসি সনদ বাতিল, চাকরিচ্যুত করাসহ ৫ দফা দাবি উপস্থাপন করে। তদন্ত কমিটি তাঁদের দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়ে তাঁদের আন্দোলন স্থগিত রাখার আহ্বান জানায়।
তদন্ত শেষে কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডা. বায়েজিদ খুরশীদ গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে তদন্ত কাজ আমরা শুরু করেছি। আনুষ্ঠানিক তদন্ত কাজ শুরুর আগে আমরা আহত শিক্ষার্থীর খোঁজ নিয়েছি, তিনি শঙ্কামুক্ত।’
ডা. বায়েজিদ আরও বলেন, ‘তদন্ত কমিটির নির্বাহী কোনো ক্ষমতা নেই। আমরা তদন্ত করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করব।’
এক প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কমিটি প্রধান বলেন, ‘আগের অভিযোগের বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব অবহেলা করেছে কিনা সেটা বলতে পারব না। তবে তাঁরা লিখিত কোনো প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে দেয়নি। যারা এই দায়িত্বে নেই তাঁদের মৌখিকভাবে জানানোটা সঠিক হয়নি।
শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়ে তদন্ত কমিটি প্রধান বলেন, ‘ক্যাম্পাসে যেন এই ধরনের ঘটনা না ঘটে সেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তদন্ত কমিটি দুপুরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে থাকা শিক্ষক ডা. রায়হান শরিফের সঙ্গে কথা বলে কলেজে আসে। সেখানে কলেজের অন্যান্য শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে বিকেলে ঢাকায় চলে যায়।
এদিকে, আজ সকালে মেডিকেল কলেজে এসে আহত শিক্ষার্থীর খবর নিয়েছেন সিরাজগঞ্জ সদর কামারখন্দ আসনের সংসদ সদস্য ড. জান্নাত আরা হেনরী। এসময় তিনি আহত শিক্ষার্থীর সঙ্গে দেখা করে চিকিৎসা খোঁজ নেন। উপযুক্ত বিচারের আশ্বাস দিয়ে তিনি এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন।
সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমার নির্বাচনী এলাকায় এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সহ্য করা হবে না।’
জানা যায়, অভিযুক্ত শিক্ষক ডা. রায়হান শরিফ ছিলেন বেপরোয়া। তিনি সবসময় পিস্তল নিয়ে চলাফেরা করতেন। কলেজের ক্যান্টিন থেকে শুরু করে আশেপাশের চায়ের দোকান, ফুটপাতের চানাচুর–মুড়ির দোকানে তিনি বন্দুক নিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি দিতেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কলেজের সিনিয়র শিক্ষার্থীরা তাঁকে মাদকসেবী হিসেবে অভিহিত করে জানায়, তিনি রাতবিরাতে কলেজের ছেলেদের হোস্টেলে এসে মাদক সেবন করতেন। পরে তাঁকে হোস্টেলে ঢুকতে দেওয়া হতো না। মেয়ে শিক্ষার্থীদের তিনি নানা ধরনের কুপ্রস্তাব দিতেন। পরীক্ষায় ফেল করে দেওয়া হবে– এই ভয়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করত না। স্থানীয় হওয়ায় তাঁর প্রভাব বেশী ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক বলেছেন, ডা. রায়হান শরিফ ছাত্রজীবনে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সেই দাপটে তিনি উশৃঙ্খল ভাব করতেন কলেজে। শিক্ষার্থীরা বলছে, জামিনে বের হয়ে তিনি যদি আবার হামলা করেন, সেই নিরাপত্তার দায়িত্ব কলেজ কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে।
কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘ডা. রায়হান শরিফকে অনেক বার সতর্ক করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকসুলভ আচরণ করতে বলা হয়েছে, কিন্ত তিনি কথা শুনেননি। কলেজের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সভায় তাঁর চাকরিচ্যুতিকরণ, সনদ বাতিল ও বিভাগীয় মামলা করার সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
অন্যদিকে, আজ সকালে আধাঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবি করেছে শিক্ষার্থীরা। তবে তদন্ত কমিটি ও কলেজ কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে তাঁরা আন্দোলন স্থগিত করেছে। দাবি পূরণ না হলে আবার আন্দোলন কর্মসূচি হাতে নেবে বলে জানিয়েছে আহত তমালের সহপাঠীরা।
অভিযুক্ত শিক্ষকের বাড়ি থেকে তলোয়ার–পিস্তল উদ্ধার
সোমবার রাতে অভিযুক্ত শিক্ষক ডা. রায়হান শরিফের বাড়ি থেকে তালোয়ারসহ আরও একটি বিদেশি পিস্তল ও ৮১ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এ সকল অস্ত্রের উৎস কোথায় তার কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
সিরাজগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি জুলহাস উদ্দিন জানিয়েছেন, ডা. রায়হান শরিফের কাছ থেকে যে সকল অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে সবগুলো তিনি অবৈধভাবে বহন করতেন। এ কারণে পুলিশ বাদী হয়ে তাঁর নামে অস্ত্র আইনে মামলা করেছে।
অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সোমবার রাত থেকে কলেজের ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।



