অবন্তিকার আত্মহত্যার জন্য আমরাই দায়ী

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২৪, ১০:৪২ পিএম

আর কোনো দিন বাবা-মার আদর পাওয়া হবে না। সহপাঠীদের সঙ্গে প্রিয় ক্যাম্পাসে আড্ডা দেওয়া হবে না। দেখা হবে না কোনো বন্ধুর সঙ্গে। এটা ভাবার পর অবন্তিকা বেছে নিয়েছে মৃত্যুর পথ। কিন্তু ভবিষ্যতে সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকার ইচ্ছে ছিলো অবন্তিকার। কিন্তু অজানা এক আতঙ্কে ইচ্ছে থাকার পর অবন্তিকা বেঁচে থাকার সাহস পায়নি। সারাক্ষণ অবন্তিকাকে ভয় তাড়া করছে। অবশেষে অবন্তিকা বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ। এমন চলে যাওয়াকে পুলিশের খাতার ‘আত্মহত্যা’ হিসেবে লিপিবন্ধ হলেও এটি হত্যা। এটি ছিলো একজন মানুষকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। যাতে সে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। 

খবরে প্রকাশ, ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে কুমিল্লা শহরে বাড়িতে আত্মহত্যা করেছেন ফাইরুজ অবন্তিকা নামের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। ফাইরুজ অবন্তিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ১৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। শুক্রবার (১৫ মার্চ) রাত ১০টার দিকে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে ফাইরুজ রশিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেন।

তবে এই মৃত্যুকে কোনোভাবেই আত্মহত্যা বলা ঠিক হবে না। এটি আসলে একটি পরিকল্পিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া। মৃত্যুর আগে অবন্তিকার পোস্ট থেকেই তা অনুমেয়, ‘আমার উপর দিয়ে কী গেলে আমার মতো নিজেকে এতো ভালোবাসে যে মানুষ সে মানুষ এমন কাজ করতে পারে। আমি জানি এটা কোনো সলিউশন না কিন্তু আমাকে বাঁচতে দিতেসে না বিশ্বাস করেন। আমি ফাইটার মানুষ। আমি বাঁচতে চাইছিলাম... এটা সুইসাইড না, এটা মার্ডার। টেকনিক্যালি মার্ডার।’

অবন্তিকার কয়েকজন বন্ধু জানিয়েছেন, তিনি ফেসবুক পোস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সহপাঠীর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানিসহ নানা ধরনের নিপীড়নের অভিযোগ করেন। ওই পোস্টে একজন সহকারী প্রক্টরের বিরুদ্ধে ছেলেটির পক্ষ নিয়ে তাঁর সঙ্গে খারাপ আচরণের অভিযোগও করেছেন তিনি।

আত্মহত্যার হার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সহপাঠী, শিক্ষক, সিনিয়র কিংবা জুনিয়রের অনেকেই নানাভাবে নিপীড়নের শিকার হয়। এই নিপীড়ন থেকে পালিয়ে বেড়াতেই আত্মহননে চলে যায় কেউ কেউ।

পালিয়ে যাওয়াই কি সমাধান

কোনো মানুষ কখনোই তার জীবনকে ছুড়ে ফেলে দিতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সেই জীবনটা তার কাছে মূল্যবান থাকে। তাহলে কীভাবে অবন্তিকাদের কাছে নিজের জীবন মূল্যহীন হয়ে গিয়েছিল। কী জন্য বিশ্ববদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীর কাছে নিজের মহামূল্যবান জীবন মূল্যহীন হয়ে গেল। এতে কি সমাজের কোনো দায় নেই? 

মনোচিকিৎসকদের মতে, ‘একজন মানুষকে তার আত্মহত্যা করার ইচ্ছার হাত থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা নৈতিক ও পেশাগত দায়িত্ব।’ আর আত্মহত্যার জন্য সৃষ্ট পরিস্থিতি যেন কোনো মানুষের না হয়, সেটা নিশ্চিত করা সমাজের দায়িত্ব। এই দায়িত্বটা সমাজ কতটা পালন করে?

কথা বলা বা মন ভালো করার জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য কাজ করতে হবে। কোনো পরিবারের একজন সদস্যের মৃত্যু তার পরিবারের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। কারণ মানুষটির এই না বলে চলে যাওয়াটা সেই মানুষটির একার বিষয় নয়। মৃত মানুষের পরিবার-পরিজন সারাজীবন একটা উত্তরবিহীন প্রশ্ন, অতৃপ্ত মন এবং গভীর শূন্যতা নিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দেয়।

আত্মহত্যার হার বাড়ছে কেন

সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও আত্মহত্যার হার বাড়ছে। মানসিক স্বাস্থ্য ইনিস্টিটিউটের তথ্যমতে, বাংলাদেশে গড়ে প্রতি বছর ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেন। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, আত্মহত্যা দু’ধরনের হয়—পরিকল্পিত এবং আবেগতাড়িত হয়ে বা কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে। সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে চরম বিষণ্ণতা বা ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন থেকে। অধিকাংশ মানুষ খুব একটা পরিকল্পনা করে আত্মহত্যা করেন না। মানসিক স্বাস্থ্যকে বারবার অবহেলা করে বলেই স্বেচ্ছামৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটছে। মানুষ নিজেকে ভালোবাসে, জীবনকে ভালোবাসে এবং সে শত প্রতিকূল পরিবেশেও বেঁচে থাকতে চায়। তাই সেই মানুষ যখন নিজেই ‘মৃত্যুকে বরণ করে’ নেওয়ার জন্য তৈরি হয়, তখন ধরেই নিতে হবে সে মানসিকভাবে অসুস্থ বা ভয়াবহ রকমের ডিপ্রেশনের শিকার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানাচ্ছে, ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবীতে রোগের এক নম্বর কারণ হবে বিষণ্ণতা। আর সে সময় বছরে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ আত্মহত্যাজনিত কারণে মৃত্যুর শিকার হবেন। আধুনিক মানুষের জন্য এ এক ভয়ংকর ভবিষ্যদ্বাণী। নতুন তথ্য বলছে, উন্নয়নশীল দেশে এই হার বেশি। আমরা যত বেশি একক জীবন, প্রতিযোগিতামূলক সমাজ ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্বার্থপরতার দিকে ঝুঁকছি, ততই আমরা অস্থির হয়ে উঠছি। আমাদের পাশের মানুষটির দিকে তাকানোর সময় নেই, মতবিনিময়ের প্রয়োজনীয়তা নেই, সম্প্রীতির হাত বাড়ানোও হয় না। আমরা জানি না পরিবারের বা বন্ধুদের মধ্যে কেউ যদি মানসিক সমস্যায় ভুগেন, তাহলে কীভাবে তার পাশে দাঁড়াতে হবে। আমাদের কাছে মানসিক সমস্যা মানে পাগল হয়ে যাওয়া। অধিকাংশ মানুষ মনে করেন মানসিক চিকিৎসকের কাছে যাওয়া মানে পাগলের ডাক্তারের কাছে যাওয়া।

আরও পড়ুন:

সমাজের চোখে শিক্ষার্থী কী? এক কথায়, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ। একদিন তারা সমাজ গড়বে, রাজনীতি বলুন, অর্থনীতি বলুন, কিংবা চিকিৎসা-সশস্ত্রবাহিনী-প্রশাসন বলুন… পুরো সমাজের নেতৃত্ব দেবে, এই স্বপ্ন দেখে বলেই তো...
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি সংগঠন। সম্প্রতি কোটা আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে এটি গঠিত হয়। এই আন্দোলনে যুক্ত ছাত্রসমাজকে ‘জেন জি’ নামে অভিহিত করা হয়। এই জেন...
আইন‑শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এতদিন কাজ করে যাওয়া পাহারাদার বাহিনী হুট করে ‘নাই’ হয়ে যাওয়ার সুযোগ নিচ্ছে অনেক অপরাধী। এরই মধ্যে দেশের বেশ কিছু কারাগার থেকে দাগী অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও...
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কলাম
সমাজের সর্বত্র নৃশংসতা ভয়ঙ্করভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নিরস্ত্র-নিরপরাধীদের ওপর রাষ্ট্রীয় ও দলীয় সন্ত্রাসের নৃশংসতা একাত্তরের গণহত্যাকে মনে করিয়ে দেয়। হত্যাকাণ্ড আগেও ঘটত, কিন্তু নৃশংস গণহত্যার ঘটনা...
এক মাস পর পণ্য রপ্তানি আবার কমল। গেল মে মাসে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে ৭ শতাংশ। বুধবার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।
এডিসের মারাত্মক ঝুঁকিতে দেশের চার জেলা- ঢাকা, বরিশাল, নরসিংদী ও কক্সবাজার। এখানে ব্রুটো ইনডেক্সে এডিসের লার্ভার ঘনত্ব ৭৬ থেকে ৯৩ পর্যন্ত মিলেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে গবেষণায় মিলেছে...
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী কারামুক্ত হয়েছেন। বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে তিনি গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পান।
ঈদুল আজহা উপলক্ষে মুক্তিপ্রাপ্ত নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমনের চলচ্চিত্র ‘রইদ’ এবার মুক্তি পাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার ৬টি শহরে। আগামী ৫ জুন থেকে দেশটির বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে এ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী শুরু...
লোডিং...

এলাকার খবর