গত ১৬ জুলাই থেকে শুরু। আজ ৮ আগস্ট। এই ২৪ দিনে দেশে অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। অতি সম্প্রতি আন্দোলনের মুখে দেশের সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীই পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। আসছে নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। পরিবর্তন হচ্ছে সামরিক বাহিনী, পুলিশ বাহিনীর উচ্চপদ থেকে শুরু করে প্রশাসনেও। কিন্তু একটা নেই পরিবর্তন। তা হলো আতঙ্কবোধে। ১৬ জুলাই থেকে ছিল আন্দোলনে গেলে দমন‑পীড়ন ও প্রাণ হারানোর ভয়। আর এখন আছে নিজের ঘরে থেকেও লুণ্ঠিত হওয়ার ভয়!
৫ আগস্ট সরকার পতনের পরপরই সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আনন্দ‑উল্লাস করেছিল। কিন্তু হুট করেই শুরু হয়ে যায় ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা। তা এতটাই ছড়িয়ে পড়ে যে, সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হতে বাধ্য হয়। সেই আতঙ্কের অনুভূতি এখনো শেষ হয়নি। ইদানীং শুরু হয়েছে সংঘবদ্ধ ডাকাতির আশঙ্কা। এরই মধ্যে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের ডাকাত দলের দেখা মিলেছে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা কাউকে কাউকে গ্রেপ্তারও করেছে। সব মিলিয়ে বিভিন্ন এলাকায় রাত জেগে জানমাল পাহারা দিতে হচ্ছে সাধারণ নাগরিকদের। ইতোমধ্যে সারা রাত রাস্তা পাহারা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
সব মিলিয়ে সারা দেশের মানুষই আছে আতঙ্কে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেও বলা যায় যে, গত রাত বিনিদ্র কেটেছে এই বান্দারাও। সে এমন এক আতঙ্ক, যা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। এক প্রিয়জনের অভিজ্ঞতা জানলাম। তিনি সারা রাত বারান্দায় বসে থেকে ঘুমন্ত পরিবারের সদস্যদের পাহারা দিয়েছেন। তিনি ঘোষিত কোনো দল, মত বা পথের আনুষ্ঠানিক সদস্যও নন। তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো খেয়ে‑পরে সুস্থ থাকার নিশ্চয়তা। কিন্তু এখন সেই চাওয়াতেই হুমকি আসছে মারাত্মকভাবে। তাতেই প্রতি রাতের আতঙ্কবোধটি ধীরে ধীরে সামগ্রিক নিরাপত্তাহীনতায় রূপ নিচ্ছে।
এই আতঙ্কের শুরুটা হয়েছিল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বলপ্রয়োগ ও দমন‑পীড়ন চালানোর মাধ্যমে। শিক্ষার্থীরা যে আন্দোলন করছিলেন, তা যৌক্তিক ছিল। কিন্তু এর মোকাবিলা তৎকালীন সরকার করেছিল ভুল উপায়ে। আন্দোলন দমন করতে যাওয়াটাই ছিল প্রধানতম ভুল। একটি গণতান্ত্রিক দেশে যেকোনো মানুষ, যেকোনো সময়, যেকোনো দাবিতে আন্দোলন করতেই পারেন। এটিকে বলা হয় মৌলিক নাগরিক অধিকার। কিন্তু তাতে বাদ সেধেছিল তৎকালীন সরকার, নিয়েছিল বলপ্রয়োগে দমনের পন্থা। ফলে শিক্ষার্থীরা যেমন হতাহত হয়েছে, তেমনি প্রাণ গেছে বহু সাধারণ মানুষের। অবস্থা এমন হয়েছিল যে, আন্দোলনের মাঝ দিয়ে রাস্তা পার হতে গেলেও মনে ছিল গুলি খাওয়ার ভয় ও আতঙ্ক। আর আন্দোলনে গেলে তো কথাই নেই! সেই আতঙ্ক পুরোপুরি কেটে যাওয়ার আগেই এবার চলে এসেছে নতুন আতঙ্কে নিদ্রাহীন রাত্রি কাটানোর কাল।
কেন এমন হচ্ছে? কেন নতুন রূপে ফিরে ফিরে আসছে আতঙ্ক?
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ‘সরকারের পতনের পর রাজধানীসহ দেশজুড়ে ভেঙে পড়েছে আইন‑শৃঙ্খলা ব্যবস্থা। বিভিন্ন জায়গায় ঘটছে সহিংসতা, লুটপাট ও আগুন সন্ত্রাসের ঘটনা। এর মধ্যে রাজধানীতে বাড়ছে ডাকাতির আতঙ্ক। গতকাল বুধবার রাতে উত্তরা, মোহাম্মদপুর, মিরপুরসহ নানা জায়গা থেকে এ নিয়ে খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে রাতভর আতঙ্ক ছিল নগরবাসীর মধ্যে। শিগগিরই পুলিশ কাজে না ফিরলে পরিস্থিতির অবনতির শঙ্কাও করছেন অনেকে।’ অর্থাৎ, আইন‑শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এতদিন কাজ করে যাওয়া পাহারাদার বাহিনী হুট করে ‘নাই’ হয়ে যাওয়ার সুযোগ নিচ্ছে অনেক অপরাধী। এরই মধ্যে দেশের বেশ কিছু কারাগার থেকে দাগী অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে এবং সেই বিষয়টিও কিন্তু কোনো শুভ ইঙ্গিত বহন করে না।

হ্যাঁ, এটি ঠিক যে আন্দোলনের ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ আছে ঢের। আছে অবিশ্বাস ও অনাস্থাও। কিন্তু এটিও মনে রাখতে হবে যে, সরকারি নির্দেশ ছাড়া পুলিশ সেই কাজটি করেনি। গুলি চালাতে হলেও সরকারি নির্দেশনা লাগে, হুকুম লাগে। আর আদেশ পালনে বাধ্য বাহিনীর সদস্যদের গণহারে সেই হুকুম তামিলের অপরাধে দণ্ডিত করলে আদতে লাভ খুব একটা হবে না। এরই মধ্যে পুলিশের শীর্ষপদগুলোয় বদল এসেছে, নিশ্চয়ই পুনর্গঠনও হবে। এখন প্রয়োজন সামাজিকভাবে সহনশীলতার চর্চা। মানতে হবেই যে, পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও এই সমাজেরই একটি অংশ এবং পুলিশ মানেই সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত ও অসৎ নন। তেমনটা হলে আরও আগেই ভেঙে পড়ত পুলিশিং ব্যবস্থা। সুতরাং পুলিশ বাহিনীকে স্বীয় দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের সুযোগ দিতেই হবে। নইলে পাহারাদারের অভাবে ভুগতে কিন্তু হবে সাধারণ জনগণকেই।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে ৭ আগস্ট বুধবার রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতির চেষ্টা নিয়ে পোস্ট দেখা গেছে। সেসব পোস্টে ধরা পড়া ডাকাতদের সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করার খবরও পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমও এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে। এসবে জানা গেছে, ডাকাতি আতঙ্কে এখন নিরাপত্তা নিশ্চিতে অনেক পাড়া-মহল্লা পাহারা দিচ্ছেন স্থানীয়রা। এটি অবশ্যই একটি ভালো দিক। সমাজের একজন মানুষ আরেকজনের মঙ্গলার্থে এগিয়ে আসছে, এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে!
জানা গেছে, নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ নিতে পারে শিগগিরই। সেক্ষেত্রে নতুন সরকারের প্রধান কাজই হওয়া উচিত আইন‑শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা। তা না হলে যে আমাদের নাগরিকদের অবস্থা হয়ে যাবে, সেই শৈশব‑কৈশোরের মতো। ওই কালে হরর বা সাসপেন্স ঘরানার কিছু দেখলেই আতঙ্কে আমরা অনেকেই হয়তো চোখ বুজে ফেলতাম। কাঁথা বা পাতলা চাদরে মাথা মুড়ে শুয়ে থাকার অভিজ্ঞতাও নিশ্চয়ই কারও কারও ছিল। অবোধ মনের সেই একই অযৌক্তিক প্রবোধ পাওয়ার কাজ এই পরিণত বয়সে এসে করতে বাধ্য হলে নিশ্চয়ই ভালো লাগবে না কারও!
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


দম্ভের পতন, এবার স্বস্তি ও একটু শান্তি দরকার
জাতির জীবনে যুক্ত হলো শোকাবহ জুলাই
আসুন, একটু কাঁদি
