ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি এমন এক সময়ে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হলেন, যখন ইতিহাসের ভয়াবহতম সংকটকাল পার করছে মধ্যপ্রাচ্য। এই প্রভাবশালী নেতার মৃত্যুতে এ অঞ্চল কি আরও সংকটাপন্ন হবে—এমন প্রশ্ন ডালপালা মেলছে ভূ–রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে।
বলে রাখা প্রয়োজন, গত সাত মাস ধরে ফিলিস্তিনের গাজায় নৃশংস হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দাবি অনুযায়ী, ফিলিস্তিনের ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠী হামাসকে নির্মূলের উদ্দেশ্যে গাজায় অভিযান চালানো হচ্ছে। কিন্তু এ অভিযানে হামাস যোদ্ধাদের চেয়ে বহুগুণ বেশি নিহত হয়েছে সাধারণ ফিলিস্তিনি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, নিহতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ৩৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, ইসরায়েল–হামাস যুদ্ধের প্রসঙ্গে ইরান কি কোনো কারণে প্রাসঙ্গিক? হ্যাঁ, প্রাসঙ্গিক। কারণ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের পক্ষে যুদ্ধ করছে হিজবুল্লাহ। আর লেবাননের এই যোদ্ধা গোষ্ঠীকে সমর্থন দেয় ইরান। এ কারণে গাজা যুদ্ধের শুরু থেকেই তেহরানকে দোষারোপ করে আসছে তেলআবিব।
গত মাসে ইসরায়েল–ইরান দ্বন্দ্ব আরও প্রকাশ্যে আসে, যখন ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। যদিও ইরান বলেছে, সিরিয়ায় তাদের দূতাবাসে ইসরায়েলি হামলায় কয়েকজন ইরানি সেনাকর্মকতার নিহতের প্রতিবাদে তারা এ হামলা চালিয়েছে। কিন্তু ইসরায়েল এ যুক্তি মানতে নারাজ। তাই তারাও ইরানের ইসফাহান প্রদেশে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এতে দুই দেশের বৈরিতা আরও প্রকট হয়।
এমন পরিস্থিতিতে ইরানের প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই জল্পনা–কল্পনার ঢেউ তুলেছে। এখন পর্যন্ত ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোতে রাইসির নিহত হওয়াকে ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবেই বর্ণনা করা হয়েছে। ইসরায়েল কিংবা অন্য কোনও শত্রু পক্ষের দিকে সন্দেহের তির ছোড়েনি তেহরান। বিশ্লেষকরা বলছেন, তেহরান সম্ভবত রয়েসয়ে কথা বলতে চাইছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আরও ঘনীভূত হোক, তা নিশ্চয়ই তারা চায় না।
এদিকে ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র আমেরিকা এখনও রাইসির মৃত্যুর ব্যাপারে কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই আমেরিকা–ইরানের সম্পর্কে ক্রমশ অবনতি হয়েছে। ২০১৮ সালে ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি প্রত্যাহার করেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপর থেকে ওয়াশিংটন–তেহরান সম্পর্কের আর উন্নতি হয়নি।
৬৩ বছর বয়সী রাইসি ইরানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন ২০২১ সালে। এরপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তিনি প্রযুক্তি ও সমরশক্তিতে ইরানকে উন্নত করতে থাকেন।
এর মধ্যে গাজা যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দৃশ্য পাল্টে দেয়। এই যুদ্ধকে ঘিরে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের সঙ্গেও সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয় আমেরিকার। উত্তেজনা বাড়তে থাকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে। এমন পরিস্থিতিতে আমেরিকা আর চায় না, মধ্যপাচ্যে সংঘাত বাড়ুক।
কোনও কোনও বিশ্লেষক বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা কমাতে বাইডেন প্রশাসন ইরানের সঙ্গে পরোক্ষভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সেই আলোচনায় এখন নিশ্চিতভাবেই ছেদ পড়ল রাইসির মৃত্যুতে। এখন ইরানের অন্তবর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নাম শোনা যাচ্ছে মোহাম্মদ মোখবারের। তাঁর সঙ্গে কি আমেরিকা রাইসির মতোই আলোচনা চালিয়ে যেতে পারবে? এমন প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই এখন সামনে এসেছে।
প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা প্রয়োজন, গতকাল রোববার ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি একটি বাঁধ উদ্বোধন করতে আজারবাইজান সীমান্তবর্তী এলাকায় যান। সেখানে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভও ছিলেন। সেখান থেকে তিনটি হেলিকপ্টারের বহর নিয়ে পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের রাজধানী তাবরিজে ফিরছিলেন ইব্রাহিম রাইসি ও তাঁর সঙ্গে থাকা পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আব্দোল্লাহিয়ানসহ অন্য কর্মকর্তারা। পথে পূর্ব আজারবাইজানের জোলফা এলাকার কাছে প্রেসিডেন্টকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়। অন্য দুটি হেলিকপ্টার নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছেছে। প্রেসিডেন্ট রাইসি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং হেলিকপ্টারে থাকা সকল যাত্রী দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন বলে ইরানের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
ইরানের বার্তা সংস্থাগুলোও রাইসির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সংস্থাগুলো তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ইরানের প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বহনকারী হেলিকপ্টারের সবাই নিহত হয়েছেন।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা, সিএনএন ও মেহর নিউজ



