দুই বুড়োর মল্লযুদ্ধ। একজনের বয়স ৮১, অপরজনের ৭৮। ধুর, ওদের যা বয়স তাতে কী আর এটা মল্লযুদ্ধ থাকে! স্রেফ কাজিয়া। অতীতই যাদের সম্বল। ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই। যারা ইতিমধ্যে আমেরিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত। এমন দুইজনের মধ্যে একজনকে আমেরিকানরা বেছে নেবে। যিনি ২০২৫-২৮ সাল পর্যন্ত শুধু নিজের দেশেই নয় সারা বিশ্বে ছড়ি ঘোরাবেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে বিতর্কের নামে যা হলো তাতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মাতব্বরের মুখ কতটা পুড়ল এ নিয়েই হিসেব-নিকেশ চলছে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে একজন বর্তমান (জো বাইডেন) ও আরেকজন সাবেকের (ডোনাল্ড ট্রাম্প) এই বিতর্ক আগে কখনো দেখেনি আমেরিকা। সে সুযোগই হয়নি। ১৯৬০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই টিভি বিতর্কে সব সময় নতুন মুখ থেকেছে। এবারই তার ব্যতিক্রম হলো। সংসার ছেড়ে সন্ন্যাস নেওয়ার সময়ে তাঁরা বিশ্ব সংসারের দায়িত্ব প্রত্যাশী। এরচেয়ে উদ্বেগের কিছু আছে? এছাড়াও অনেক দিক দিয়েই বৃহস্পতিবার রাতের বিতর্ক ব্যতিক্রমী। বিশেষ করে মার্কিন রাজনীতির দেউলিয়াপনার ব্যাপারে।
বাইডেন ও ট্রাম্প রাজি হয়েছেন দু’বার বিতর্কে নামতে। এর প্রথমটির আয়োজন করে সিএনএন। আটলান্টায়। পরেরটির আয়োজক এবিসি টেলিভিশন। অন্যান্যবার তিন দফায় বিতর্ক চললেও এবার কমে এসেছে। কিন্তু প্রথম দফা নিয়ে কোনো ইতিবাচক কথা নেই। কোথাও। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে আমেরিকা বিশ্বজুড়ে একচেটিয়া রাজত্ব করে যাচ্ছে। চীন সেখানে কিঞ্চিৎ ভাগ বসানোর চেষ্টা করায় তাকে হাতে-ভাতে সর্বত্র মারার ব্যবস্থা চলছে। গত ৩০-৩৫ বছর ধরে আমেরিকা যা বলে তাই হয়। প্রতিবাদ তো দূরে থাক, কেউ রা কাড়তে পারে না। এই সময়কালে ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, লিবিয়া ধ্বংস হয়ে গেছে। হাজার হাজার শিশু-নারী-পুরুষ প্রাণ দিয়েছে ফিলিস্তিনে। আরও কত দেবে ঠিক নেই। এসবের পেছনে আছে আমেরিকার সিদ্ধান্ত। কখনো একক, কখনো গুটি কয়েক বন্ধু মিলে।
এ তো গেল যুদ্ধের, নরহত্যার ঘটনা। এর বাইরে অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা, অভিবাসনসহ আরও কত শত বিষয় আছে। এর সবগুলোই নিয়ন্ত্রণ করে আমেরিকা ও তার বন্ধুরা। এছাড়া আমেরিকার ভেতরে জিনিসপত্রের চড়া দাম, চাকরির বাজারে খরা, লাতিন আমেরিকা থেকে অভিবাসী জনস্রোত, নিরাময়হীন রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব–আর না জানি কী আছে। দেশ ও দেশের বাইরে এতসব বিষয়ে যাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয় তিনিই হলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। তাহলে তাঁকে কেমন হতে হবে বুঝতেই পারছেন।
কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতের বিতর্কে কী দেখা গেল, বাইডেনের গলা দিয়ে স্বরই বেরোচ্ছে না। যা-ও বা বেরোচ্ছে তা অতি ক্ষীণ। শরীরি ভাষায়ও নিস্তেজ। অন্যদিকে ট্রাম্পের অর্গলহীন মিথ্যার স্রোতে ভেসে গেছে রাজনীতির যত উপাচার। এটা ট্রাম্পের কাছে অপ্রত্যাশিত না। ২০১৭-২০ সাল পর্যন্ত আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থাকার সময় বেচারা ট্রাম্পকে ৩০ হাজার ৫৭৩ বার মিথ্যা বলতে হয়েছে। এ হিসাব সে দেশের স্বনামধন্য পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্টের। এ হেন ট্রাম্পকে পরপর তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনিত করেছেন রিপাবলিকান পার্টির নেতা-কর্মীরা। ভাবতে অবাক লাগে ১৭০ বছরের পুরোনো এই দল যেখানে আব্রাহাম লিংকন, থিওডোর রুজভেল্ট, আইজেনহাওয়ারের মতো প্রেসিডেন্ট উপহার দিয়েছে তারাই গত ১২ বছর ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাইরে কাউকে খুঁজে পায়নি? যেখানে রাজনীতির সাথে সরাসরি পারিবারিক উত্তরাধিকারের যোগ নেই সেখানেও রাজনৈতিক দেউলিয়ত্ব কোথায় পৌঁছাতে পারে, এটা তার বড় উদাহরন। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা এ নিয়ে গবেষণার বড় সুযোগ পাবেন।
ট্রাম্পের বিষয়টা তো গেল। কিন্তু বাইডেনের কী হবে? প্রথম পরীক্ষায় এমন ডাহা ফেল করার পর কী করে মুখ দেখাবেন। বৃহস্পতিবারের বিতর্কের পর ট্রাম্প যেখানে ৬৭ শতাংশ নম্বর পেয়েছেন, সেখানে বাইডেনের জুটেছে ৩৩। পার্থক্যই বলে দিচ্ছে ৫ নভেম্বরের ভোটের ফল কী হতে পারে।
আগামী কিছু দিনে এই পার্থক্য বাইডেন মুছে দিতে পারবেন, এমন আশা করাও কষ্টসাধ্য। ইতিমধ্যে ডেমোক্র্যাট দলের মধ্যে কথা উঠেছে বাইডেনকে বদলানোর। এ নিয়ে জোরেশোরে মাঠে নেমে পড়েছেন অনেক ডেমোক্র্যাট। এই তালিকায় বার্নি স্যান্ডার্স, মিশেল ওবামা, ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম, মিশিগানের গভর্নর গ্রেচেন হুইটমার, মিনেসোটার সিনেটর অ্যামি ক্লোবুচার, নিউ জার্সির সিনেটর কোরি বুকারসহ আরও অনেকের নাম বিবেচিত হচ্ছে। বাইডেনের মতো তাঁর সঙ্গী ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস গত চার বছরে কিছুই করতে পারেননি। ইউক্রেন যুদ্ধ আর ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধে মদদ দেওয়া ছাড়া দুজনের খাতা শূন্য। দেশের ভেতরে তাঁরা শুধু দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে গেছেন। ফলে বাইডেনের মতো তাঁর নাম নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা নেই।
জুলাইয়ে দলের চূড়ান্ত কাউন্সিলের আগে ৮১ বছরের অশক্ত, তোতলানো বাইডেনকে রাখবেন না হটাবেন সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ডেমোক্র্যাটদের। সময় বড় কম। এমন সমস্যায় মনে হয় না আমেরিকার দুই বড় দল কখনো পড়েছে।
এতসবের পরেও দুই বৃদ্ধের বিতর্কের পর অনেকগুলো প্রশ্ন সামনে এসেছে। এক, আধিপত্যবাদী আমেরিকার শাসনভার ২০২৫-এ দুজনের মধ্যে এমন একজনের হাতে যেতে চলেছে যিনি বয়সের ভারে নুব্জ। দুই, বয়সের কারণে ভবিষ্যৎ নিয়ে যাদের কোনো চিন্তা নেই। তিন, আমেরিকার বড় দুই দলে নতুন প্রজন্মের নেতার অভাব। চার, প্রতিদ্বন্দ্বী দুজনই মিথ্যেবাদী। সিএনএন-এর হিসেবে ট্রাম্প ৩০টি ও বাইডেন ৯টি মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। দেড় ঘণ্টার এই বিতর্ক দেখেছেন পাঁচ কোটির বেশি দর্শক। ভবিষ্যতের প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে তাদের কাছে এবং সারা বিশ্বের কাছে কী বার্তা গেল? পাঁচ, ইসরায়েলের ফিলিস্তিনে গণহত্যা চালানোর অধিকারের ব্যাপারে দুজনই একমত। এর বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠা মার্কিন শিক্ষিত তরুণদের প্রতিবাদের কোনো মূল্য নেই তাঁদের কাছে।
দুই বৃদ্ধের এই কাজিয়া দেখে কর্নেল ওয়েস্ট নামে একজন তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, আমেরিকা কী আত্মঘাতী হওয়ার জন্য উন্মাদ হয়ে গেছে? আর রবার্ট গ্রিফিনের বক্তব্য, বাইডেন ও ট্রাম্পের বিতর্কের পর সারা দুনিয়া আমাদের নিয়ে হাসাহাসি করছে। সত্যিই তো বিশ্বের অন্যান্য দেশকে নিয়ে হাসাহাসি, দাবড়ানোর অধিকার ও দায়িত্ব যাদের তাদের নিয়ে একই কাজ কেউ করলে গ্রিফিনরা তো দুঃখ পাবেনই। এ রকম হাজার মন্তব্যে ভরে গেছে সমাজমাধ্যম। তাহলে বুঝে দেখুন, আমেরিকার দুই বড় দল ও তাদের প্রার্থীরা দেশের মানুষের কাছে নিজেদের কোথায় নিয়ে গেছেন!
এই দুই বুড়োর ক্যাচালে মার্কিনিদের আশা দেখাচ্ছেন বিখ্যাত কেনেডি পরিবারের সদস্য রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়ার। ২০২৪-এর নির্বাচনে ট্রাম্প ও বাইডেনের বিকল্প তৃতীয় হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়াতে চান রবার্ট। পেশায় আইনজীবী রবার্ট এজন্য অনেক আগেই ডেমোক্র্যাট দলের সঙ্গ ত্যাগ করেছেন। রাজ্যে রাজ্যে ঘুরে সমর্থন জোগাড়ে ব্যস্ত তিনি। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে প্রয়োজনীয় সমর্থন তিনি জোগাড় করতে পারবেন।
কেনেডি জুনিয়ারের জন্য সমস্যা হলো ইতিহাস। আমেরিকায় বড় দুই দলের বাইরে সেখানে কারও জেতা প্রায় অসম্ভব। তবে কেনেডির জন্য ভরসার বিষয় হলো বিতর্কের পর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বাইডেন যেমন হাবুডুবু খাচ্ছেন, ট্রাম্পও তেমনি। এই সুযোগটা রবার্ট এফ কেনেডি নিতে পারেন কিনা বা মার্কিনিরা তাঁকে দেয় কিনা সেটা দেখার। আর এই লড়াই যদি বাইডেন ও ট্রাম্পের মধ্যে সীমিত থাকে তাহলে আমেরিকার পাশাপাশি সারা বিশ্বের জন্য এক অশনিসংকেত হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



