নিক্কেই এশিয়ার বিশ্লেষণ

হাসিনার প্রতি তীব্র ক্ষোভেই স্পষ্ট মানুষের মনে ভারতবিরোধীতা কতটা প্রকট

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৪, ০৪:০৭ পিএম

নজিরবিহীন গণআন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর বিক্ষুব্ধ জনতার গণভবন আক্রমণ করা মোটেও আশ্চর্য হওয়ার মতো কোনো ঘটনা নয়। কয়েক বছর ধরেই সরকারে গভীর পচন লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। বাংলাদেশের অলৌকিক অর্থনৈতিক উত্থানের কারণে অনেক মানুষই চরম দারিদ্র অবস্থা থেকে বের হতে পেরেছিল। তবে তা টেকসই হয়নি। এ ছাড়া সকল নির্বাচনে কারচুপি, স্বাধীনতা হরণ, সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করাসহ নানা কারণে সরকারের প্রতি মানুষের হতাশা বাড়ছিল।

একটি অজনপ্রিয় স্বৈরশাসককে ক্ষমতায় রাখার জন্য দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি, অর্থনীতি, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা হাত ধরাধরি করে চলছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন বর্জন করেছিল প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। ওই নির্বাচনে  আওয়ামী লীগ বিপুল জয় পেলেও সাধারণ মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেনি।

এই অসন্তুষ্টির মধ্যেই গত জুলাইয়ের ১ তারিখ থেকে শুরু হয় সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন। সেই আন্দোলনটি শেষ পর্যন্ত সরকার পাতনের আন্দোলনে রূপ নেবে, তা ঘুনাক্ষরেও কেউ কল্পনা করেনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সত্যি হয়েছে এবং শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটেছে।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর সেনাপ্রধান নতুন একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের উদ্যোগ নেন। এরপর তিনি রাষ্ট্রপতি ও গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নিয়েছেন নোবেলজীয় ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি সর্বজনগ্রাহ্য নির্দলীয় ব্যক্তি এবং তাঁর সততার জন্য ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। গরীবের ব্যাংকার হিসেবে পরিচিত ক্ষুদ্রঋণ ধারণার এই প্রবক্তাকে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসাবশত শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন হয়রানি করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের করে হেনস্তা করেছেন।

গত ১৫ বছর শেখ হাসিনাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে ভারত। ছবি: এক্স থেকে নেওয়াএমন একজন ব্যক্তি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হওয়ার পর অনেকেই আশাবাদী হয়ে উঠেছেন এবং স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন। বেশির ভাগ মানুষের ধারনা, ড. ইউনূস প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সংস্কার করে দেশে গণতন্ত্র পুণঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। একই সঙ্গে স্বৈরশাসকের উত্থান রোধ করার পাশাপাশি তিনি অর্থনীতিকেও পুনরুদ্ধার করতে পারবেন বলে তাদের বিশ্বাস। যদিও এটি একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। তবে তাঁর উপেদষ্টা পরিষদে বিচিত্র অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয় ঘটায় ছাত্র–জনতাসহ বেশির মানুষ আশাবাদী।

অন্তর্বর্তী সরকারকে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা ব্যাপক। সেসব প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে ৮৪ বছর বয়সী ইউনূসকে সংবিধান সংশোধন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় বড় পরিবর্তন আনতে হবে। এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে, ইউনূস সরকার সম্ভবত এক থেকে দুই বছর দায়িত্ব পালন করবে।

সন্দেহ নেই ড. ইউনূস বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবেন। আবার সেনাবাহিনী ও ছাত্র নেতাদেরও তাঁকে সামলে চলতে হবে। কারণ তারা তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য আবারও জনগণকে রাস্তায় নামাতে পারে।
ড. ইউনূসের এখন প্রধান কাজ হবে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং সংখ্যালঘু হিন্দুসহ আরও যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের রক্ষা করা।

এদিকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারেরা দেশের এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাচ্ছে এবং হত্যা–সন্ত্রাস প্রতিরোধের আহ্বান জানাচ্ছে।

বংলাদেশের সরকার কাঠামোয় আকস্মিক এই পরিবর্তনে সন্দেহাতীতভাবে সবচেয়ে বেশি ঝাঁকুনি খেয়েছে প্রতিবেশি দেশ ভারত। গত ১৫ বছরের শাসনামলে শেখ হাসিনার সবচেয়ে শক্তিশালী সমর্থক ছিল ভারত। গণঅভ্যুত্থানের পর প্রাণ বাঁচাতে শেখ হাসিনা সেই ভারতে গিয়েই আশ্রয় নিয়েছেন।

একটি অজনপ্রিয় স্বৈরাচারী নেতাকে দিনের পর দিন অন্ধভাবে সমর্থন দিয়ে ভারত এখন ভালোই বেকায়দায় পড়েছে। শেখ হাসিনার প্রতি তীব্র ক্ষোভ দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়, এ দেশের মানুষের মনে ভারতবিরোধীতা কতটা প্রকট। ফলে, দিল্লিকে এখন আরও সাবধানে পা ফেলতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও জনগণের ইচ্ছা–অনিচ্ছার প্রতি।

অনেক ভারতীয় বিশ্লেষক হাসিনার পতনের জন্য বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপকে দায়ী করেছেন। কেউ কেউ স্পষ্টভাবেই বলেছেন, ভূ–রাজনৈতিক কারণে যুক্তরাষ্ট্র এই অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে বোঝা যায়, ভারতের এসব প্রোপাগান্ডার সঙ্গে সত্যের তেমন সংযোগ নেই।

শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষায় পারদর্শী ছিলেন। ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েও চীনের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখতে পেরেছিলেন। এমনকি পশ্চিমা দেশগুলোকেও দীর্ঘ সময় সামলে রাখতে পেরেছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে চীনের বৈরিতা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ একটি ভূ–রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

এতদিন পশ্চিমা দেশগুলো ঢাকার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে হাসিনা সরকারের গণতান্ত্রিক ত্রুটি, দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকে নজর দিয়েছিল। পশ্চিমাদের এমন নীতি হাসিনার অপশাসনকে দীর্ঘ হতে সহায়তা করেছে বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের মতে, পশ্চিমাদের নীরবতা হাসিনাকে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে উৎসাহিত করেছিল।

প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিচ্ছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: এক্স থেকে নেওয়াযাইহোক, বাংলাদেশের জনগণ শেষ পর্যন্ত কর্তৃত্ববাদী সরকারকে উৎখাত করেছে। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে। এই সরকারের মেয়াদ ৯০ দিনের বেশি হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে ড. ইউনূস রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার চালিয়ে যাবেন। দাতা গোষ্ঠীগুলোও তাঁকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে কার্পণ্য করবে না বলেই আন্দাজ করা যায়।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। বাংলাদেশের পোশাকের প্রধান ক্রেতা আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলো। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করা জরুরি।

এসব দিক বিবেচনায় রেখে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারকে নতুন আঙ্গিকে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। পশ্চিমারা যেহেতু ড. ইউনূসকে সমর্থন জানিয়েছে, ধারনা করা যায়, তাদের সহযোগিতায় তিনি পোশাক খাতকে শক্তিশালী করতে পারবেন। এর পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আঞ্চলিক সম্পর্কগুলোও পুনঃনির্মাণে তিনি মনোযোগী হবেন। চীন ও জাপানের মতো বড় দাতা দেশগুলোর সঙ্গেও নতুন করে সম্পর্ক উন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে তাঁকে।

বাংলাদেশ এখন বিপুল রিজার্ভ ঘাটতির মধ্যে রয়েছে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন সরকারকে এখন বিদেশী আর্থিক সহায়তার দিকে হাত বাড়াতেই হবে। সেক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কটা কেমন হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

নিক্কেই এশিয়া থেকে নেওয়া
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মারুফ ইসলাম

হিমালয়ের বরফে ঢাকা শান্ত পাহাড়ের ওপর এখন যুদ্ধের ঘন কালো মেঘ। ভারতের উত্তর সীমান্ত লক্ষ্য করে চীন কি তবে বড় কোনো যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে? সম্প্রতি স্যাটেলাইট চিত্রে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর...
একটি মাত্র সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, আর তাতেই কেঁপে উঠল ভারতের রাজনীতি। টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের মুখে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হলো দিল্লির ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদি সরকার। পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন ভারতের...
দীর্ঘ দুই বছর পর ফের বাংলাদেশিদের পর্যটন বা ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করেছে ভারত। রোববার থেকেই শুরু হয়েছে আবেদন প্রক্রিয়া। কিন্তু এবার আর আগের নিয়মে ভিসা পাওয়া যাবে না। বদলে গেছে অ্যাপয়েন্টমেন্টের...
নদীর বুকে গড়ে উঠবে চোখধাঁধানো আধুনিক স্যাটেলাইট শহর, পাঁচতারকা হোটেল-রেস্তোরাঁ, বিশাল সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট আর মাইলের পর মাইল বিস্তৃত শক্তিশালী বাঁধ। উত্তরবঙ্গের ভাগ্য পুরোপুরি বদলে দিতে এই রূপরেখার...
রাজধানী থেকে গাজীপুর-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য  আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ভারতের দিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতবিনিময়ের ঘটনায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করছে ঢাকা। বুধবার রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এ ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।  
সাতক্ষীরা আদালত চত্বরে পুলিশের হেফাজত থেকে মো. আজমাইন নামের এক আসামি পালিয়ে গেছে। বুধবার দুপুর দেড়টার দিকে এ ঘটনা হয়। আজমাইন আশাশুনি উপজেলার নাকতাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও মাদক মামলার আসামি। 
দীর্ঘদিন ধরে দেশে বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। এরই মধ্যে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদহার এবং ব্যবসায়িক...
লোডিং...

এলাকার খবর