গুদামে সার আছে। সরকারি নথিতেও আছে পর্যাপ্ত মজুত ও বরাদ্দের হিসাব। কিন্তু আমন মৌসুমে কৃষক যখন সার কিনতে যাচ্ছেন, তখনই শুরু হচ্ছে ভোগান্তি। কোথাও দীর্ঘ লাইন, কোথাও বাড়তি দাম। এমনকি সার না পেয়ে ঘটছে সড়ক অবরোধ, ডিলারের গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও। তাহলে প্রশ্ন—সার নিয়ে আসলে হচ্ছেটা কী?
সার সংকট কতটা গভীর?
বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন অনেকটাই আমদাননির্ভর সারের ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্রীয় সার কারখানাগুলোর উৎপাদনও গ্যাস সংকট, যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা কাঁচামালের সমস্যায় ব্যাহত হয়। ফলে আমন মৌসুমে সরবরাহ ব্যবস্থায় সামান্য ব্যাঘাতের প্রভাব পড়তে পারে মাঠপর্যায়ে।
কিন্তু এবার প্রশ্ন হলো—সার কি সত্যিই কম, নাকি পর্যাপ্ত সারও ঠিকভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না?
কৃষকদের কেউ বলছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী একসঙ্গে সার দেওয়া হচ্ছে না। আবার ডিলারদের কেউ দাবি করছেন, চাহিদার তুলনায় তারাও কম বরাদ্দ পাচ্ছেন।
অন্যদিকে সরকারের তথ্য বলছে, জাতীয় পর্যায়ে সারের মজুত ও সরবরাহ পরিকল্পনাওয়ারী ঘাটতি নেই। ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে প্রায় ১২ লাখ ৪১ হাজার ৯০০ টন সার মজুত ছিল।
কুষ্টিয়ায় বেশি দামে সার
কুষ্টিয়ার মিরপুরের এক কৃষক দুই বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করছেন। এক বস্তা ইউরিয়া কিনতে তাঁকে সরকারি দামের চেয়ে ৩৭০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি দামের চেয়ে কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি দিলেই কোথাও কোথাও সার মিলছে।
দেশের অন্য এলাকাতেও বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি দামে সার না পেয়ে প্রয়োজন মেটাতে বাধ্য হয়ে বেশি দামে কিনছেন তারা।
তবে ডিলারদের দাবি, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম। যতটুকু সার পাচ্ছেন, নিয়ম মেনেই বিক্রি করছেন তারা।
কুড়িগ্রামে সার নিয়ে শোরগোল
কুষ্টিয়ার পর একই ধরনের অভিযোগ কুড়িগ্রামেও। ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পাওয়ার অভিযোগ কৃষকদের। কোথাও হয়েছে হট্টগোল, কোথাও সড়ক অবরোধ। এমনকি ডিলারের গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
৭ সেপ্টেম্বর রৌমারীতে সার বিতরণে দেরিকে কেন্দ্র করে কৃষকেরা ডিলারের গুদামের বেড়া ভেঙে শতাধিক বস্তা সার নিয়ে যান বলে অভিযোগ ওঠে। একই সময়ে ভূরুঙ্গামারীতে সার না পাওয়ার অভিযোগে সড়ক অবরোধ ও এক কৃষি কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করার ঘটনাও ঘটে।
১৬ সেপ্টেম্বর রাজীবপুরেও সার বিতরণ নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। কৃষকদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও তারা সার পাচ্ছিলেন না। পরে প্রশাসন সেখানে সার বিতরণ করে এবং ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেয়।
কুড়িগ্রাম কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে ইউরিয়া ৪ হাজার ৬৪৪ টন, ডিএপি ১ হাজার ৯২১ টন, টিএসপি ৮০২ টন এবং এমওপি ১ হাজার ৩২৬ টন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে কৃষকদের অভিযোগের পর আরও ৫০০ টন ইউরিয়া বরাদ্দ দেওয়া হয়।
সরকারি তথ্যে পর্যাপ্ত মজুত
৯ সেপ্টেম্বরের সরকারি হিসাবে দেশে ইউরিয়া ছিল ৪ লাখ ১৮ হাজার টন, টিএসপি ৩ লাখ ৪৩ হাজার, ডিএপি ৩ লাখ ২ হাজার এবং এমওপি ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯০০ টন। সব মিলিয়ে মজুত প্রায় ১২ লাখ ৪১ হাজার ৯০০ টন।
এর পাশাপাশি ১ লাখ ১০ হাজার টন সার আমদানির প্রস্তাবও অনুমোদন হয়েছে। অক্টোবর মাসের জন্য ৬৪ জেলার চাহিদার বিপরীতে সার বরাদ্দ নিশ্চিত করার কথাও জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
তাহলে প্রশ্ন—মজুত ও বরাদ্দের হিসাব যদি এমন হয়, কৃষকের হাতে সার পৌঁছাচ্ছে না কেন?
সমস্যা কি বিতরণ ব্যবস্থায়?
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সারের সামগ্রিক সংকট নেই; কিছু এলাকায় সমস্যা তৈরি হয়েছে বিতরণ পর্যায়ে। এ কারণে সার সরবরাহ, মজুত, পরিবহন ও বিক্রয় তদারকিতে কন্ট্রোল রুমও চালু করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
মাঠপর্যায়ে আবার সরকারি ও ডিলারদের গুদামে সার থাকার পরও কৃষকের না পাওয়ার অভিযোগ উঠছে। রাজশাহীতে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে এক ডিলারের গুদাম থেকে ৮১৭ বস্তা এবং অন্য জায়গায় ৩৩০ বস্তা সার জব্দ করেছে প্রশাসন।
অর্থাৎ শুধু জাতীয় মজুতের হিসাব দেখলেই পুরো চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। দেখতে হবে—সেই সার কখন, কোথায় এবং কী দামে কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে।
কৃষকের হাতে সার নেই
সময়মতো সার না পেলে আমন চাষে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার বেশি দামে সার কিনলে বাড়ে উৎপাদন খরচ।
তাই সারের মজুতের পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক বরাদ্দ, ডিলার পর্যায়ের মজুত এবং কৃষকের কাছে বিক্রির তথ্যও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা জরুরি।
কারণ সরকারি নথিতে সার থাকলেই হবে না—সার থাকতে হবে কৃষকের হাতে, ঠিক সময়ে, ঠিক দামে।
আর তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—গুদাম থেকে মাঠ পর্যন্ত সার বিতরণের কোন ধাপে সমস্যা তৈরি হচ্ছে?
কারণ আমন মৌসুমে সময় চলে গেলে, শুধু হিসাবের খাতায় থাকা সার কৃষকের কোনো কাজে আসবে না।



