শেখ হাসিনাকে নিয়ে নানামুখী পরীক্ষায় ভারত

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৪, ১০:৪২ এএম

কৌশলগত ধৈর্য—এই শব্দটি ২০১৫ সালে প্রথম ব্যবহার করেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। প্রশ্ন হচ্ছে, শেখ হাসিনা ও ভারত ইস্যুতে ওবামার এই কথার প্রাসঙ্গিকতা কী? ছাত্র আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই আন্দোলনের শক্তি উপলব্ধি করার নয়াদিল্লির শুধু কূটনৈতিক অক্ষমতাই ছিল না, বাংলাদেশের আন্দোলনকারীদের মেজাজ মাপতেও ব্যর্থ হয়েছে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এর পরিপ্রেক্ষিতে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তাতে ভারতকে এখন কৌশলগতভাবে ধৈর্যের বহুবিধ পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যন অনলাইন আউটলুক ইন্ডিয়াতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। 

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের সাউথ ব্লকে বর্তমানে একটি কথা খুব বেশি শোনা যায়- ‘স্ট্র্যাটেজিক প্যাশেন্স’ বা কৌশলগত ধৈর্য। ভারতের দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশীদের মধ্যে চলমান অস্থিরতা ব্যাখ্যা করতে এটি একটা যোগ্য বাক্যাংশ। ২০১৪ সালে আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনিকে সর্বাত্মক সমর্থন দিয়েছিল ভারত। এরপর আফগানিস্তানে ওই সরকারের পতন হয়। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় জনতার বিদ্রোহ, মালদ্বীপে ‘ইন্ডিয়া আউট আন্দোলন, নেপালে ঘন ঘন নেতৃত্বের পরিবর্তন দেশগুলোকে হয় ভারত না হয় চীনের মুখাপেক্ষী করে ফেলেছে। এবার সরকার পতনের ঘটনা ঘটল বাংলাদেশেও।  ভারতের সবচেয়ে কাছের বন্ধু এবং মিত্র শেখ হাসিনাকে পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছে। 

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন। ছবি: ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনবিশ্লেষকরা বলছেন, যে উত্তাল পরিস্থিতি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে অথবা ছাত্রদের আন্দোলনের যে শক্তি, তা আগেভাগে অনুমান করতে পারেনি নয়াদিল্লি। রাজপথের ভাব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাও। ভারত আত্মতুষ্টিতে হয়তো ভুগছিল এবং বিশ্বাস করেছিল যে, শেখ হাসিনা শক্তি খাটিয়ে অতীতের মতো সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন। শেখ হাসিনা ক্রমশ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিলেন। এর যেকোনো লক্ষণ দেখা যায়নি, বিষয়টি এমন নয়। 

সাবেক রাষ্ট্রদূত অনীল ওয়াধা বলেন, গত দুই বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্রমশ শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রণ এবং আওয়ামী লীগের দুর্বলতা বাকি বিশ্বের মতো ভারতও দেখেছে। তা সত্ত্বেও চীনকে মোকাবিলা এবং ইসলামপন্থিদের দূরে সরিয়ে রাখার জন্য তারা তাঁকে (শেখ হাসিনা) সমর্থন দেয়ার পথ বেছে নেয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভূমিকার কারণে ভারতের সঙ্গে হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সবসময়ই চমৎকার সম্পর্ক বিদ্যমান। গান্ধী পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের গভীরতা সবার জানা। তিনি ঘনিষ্ঠ বন্ধন তৈরি করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও। বাংলাদেশি কথিত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে এবং ভারতে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ নিয়ে নির্বাচনী প্রচারের সময় মোদি আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করা সত্ত্বেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মন্তব্য বা প্রতিবাদ প্রকাশ্যে জানাননি হাসিনা। যখন আসামে নাগরিকপঞ্জী (এনআরসি) আপডেট করা হলো এবং বলা হলো অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে- তখনও তিনি ভারত সরকারের ওপর আস্থা রাখাকেই বেছে নেন। বাংলাদেশের তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর নিশ্চিত করেন যে, এনআরসি তাদের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। এতে বাংলাদেশ বা ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না। 

২০০৯ সালে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসেন শেখ হাসিনা। তারপর তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী উলফার যেসব নেতা বাংলাদেশে ছিলেন তাদের ভারতের হাতে তুলে দেন। এর মধ্যদিয়ে ভারতের নিরাপত্তার প্রতি তার একাগ্রতার কারণে ভারতের সরকার এবং বিরোধীদের কাছে যথেষ্ট প্রশংসা পান তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিকভাবে শেখ হাসিনার ‘রাজনৈতিক মৃত্যু’ হলো ভারতে মোদি সরকারের জন্য একটি বড় আঘাত। ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার পেছনে ভারত পুরোটা সময়, শক্তি এবং সম্পদ ব্যয় করার পর ভারত এখন দিশাহারা। নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস এখন দায়িত্বে। এতে নয়াদিল্লি কিছুটা আশ্বস্ত হতে পারে। আন্তর্জাতিক মর্যাদা আছে ড. ইউনূসের। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপিয়ানদের সঙ্গে আছে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তিনি এরই মধ্যে যথার্থ বার্তা দিয়েছেন। সংখ্যালঘুদের সুরক্ষিত রাখা ও আইনশৃঙ্খলা ফেরানোর নিশ্চয়তা দিয়েছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের আতঙ্কিতদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তিনি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে গিয়েছেন। পরিস্থিতি এখনো ঘোলাটে থাকায় ড. ইউনূস এসব কাজ করতে সক্ষম হবেন কি না তা নিয়ে নয়াদিল্লি এখনো ভয়ে আছে।  

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: রয়টার্সক্ষমতাচ্যুত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করছে অনেকে। যুক্তরাষ্ট্র ও শেখ হাসিনার মধ্যে কখনোই সম্পর্ক বন্ধুর ছিল না। এর প্রেক্ষাপট স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়। গত কয়েকটি বছর গণতান্ত্রিকভাবে আওয়ামী লীগ সরকার পিছিয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। এ বছর জানুয়ারিতে বিতর্কিত নির্বাচনের আগে বিরোধীদের দাবি করা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে সমর্থন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ নিয়ে বিপরীত অবস্থানে থাকে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। নয়াদিল্লি শেখ হাসিনার জন্য লড়াই অব্যাহত রাখে। তবে এই বিরোধ ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে ক্ষতি করতে পারেনি। নির্বাচনের পর হাসিনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, নয়াদিল্লির অনুরোধে তারা সুর নরম করেছে। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়ে এত উদ্বিগ্ন নয় ভারত, কিন্তু যখনই হোক নির্বাচনের ফলের দিকে দৃষ্টি রাখবে দেশটি। 

অনীল ওয়াধা বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন বিএনপি ও তার মিত্রদেরকে পাকিস্তানের আইএসআইয়ের মিত্র হিসেবে দেখে ভারত। বাংলাদেশে এখন একটি ভয়ঙ্কর কূটনেতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি নয়াদিল্লি। সম্পর্কটি নিকট ভবিষ্যতে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারে। উপরন্তু জামায়াতে ইসলামী ভারতের জন্য উদ্বেগের। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে অদম্য সমর্থন দেয় ভারত। এতে যে তিক্ততা ও ক্ষোভ রয়েছে তাতে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত খুব সহজ হবে না।

এ অঞ্চলের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন সাবেক কূটনীতিক রাজীব ভাটিয়া। তিনি বলেন, এটা করতে হবে ধীরে ধীরে স্টেপ বাই স্টেপ। পার্লামেন্টে বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর যে বক্তব্য দিয়েছেন তা নিয়ে ঢাকায় অসন্তোষ আছে। প্রকৃতপক্ষে জয়শঙ্কর তাঁর বক্তব্যে পুলিশের হাতে নিহত বিপুল সংখ্যক প্রতিবাদকারীর কথা উল্লেখ করেননি। ফলে শেখ হাসিনার কূটনৈতিক পতন মোদি সরকারের জন্য বড় আঘাত। 

এমন পরিস্থিতিতে ড. ইউনূস প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উচ্চ পর্যায়ের ফোনকল করেছেন। তিনি মোদিকে নিশ্চয়তা দিয়েছেন যে, তাঁর সরকার বাংলাদেশে বসবাসকারী হিন্দু ও অন্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেবে। এতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করতে প্রস্তুত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। ১৭ই আগস্ট ভারতের আয়োজনে গ্লোবাল সাউথ সামিটেও যোগ দিয়েছেন ড. ইউনূস। তবে ভারতে শেখ হাসিনার উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বাংলাদেশেও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একের পর এক হত্যা মামলা হচ্ছে। ফলে শেখ হাসিনাকে এখন ফেরত চাইতে পারে ঢাকা। যদি এমন হয়, তাহলে নতুন এক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে নয়াদিল্লি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অঞ্চলে ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজনকে যদি হস্তান্তর করা হয় তাহলে বাকি প্রতিবেশীদের কাছে একটি ভয়বহ বার্তা যাবে। এমন অবস্থায় যত তাড়াতাড়ি শেখ হাসিনা ভারতের বাইরে চলে যাবেন ততোই দেশটির জন্য তা ভালো হবে। অন্যদিকে অতীতের সম্পর্ক ভেঙে ঢাকায় ক্ষমতার সঙ্গে নতুন করে কাজ শুরু করা ভারতের জন্য এক চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে নয়াদিল্লি একটি বার্তা পাঠাবে। তা হবে, তারা বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে আছে। সরকারের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক হবে। হাসিনা আমলে যা ছিল, তা কাজে আসবে না। এটা হবে জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক। সেটাই এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে চূড়ান্তভাবে সম্পর্ককে নির্ধারণ করবে।    

বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের রুটগুলোতে আগুন জ্বলছে। হরমুজ প্রণালীর পর এবার অবরুদ্ধ হতে চলেছে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালী। বিশ্ববাণিজ্যের প্রধান এই রক্তনালী বাঁচাতে এবার মধ্যপ্রাচ্যে এক বিশাল নৌ...
৪০০ বছর ধরে যে তাজমহলকে গোটা পৃথিবী চিনেছে প্রেমের প্রতীক হিসেবে, সেই তাজমহলকে নিয়ে ইদানীং এত বিতর্ক কেন উঠছে? সুপ্রিম কোর্ট যেখানে এই দাবি খারিজ করে দিয়েছেন, ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগও অবস্থান...
একটি মাত্র সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, আর তাতেই কেঁপে উঠল ভারতের রাজনীতি। টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের মুখে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হলো দিল্লির ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদি সরকার। পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন ভারতের...
দীর্ঘ দুই বছর পর ফের বাংলাদেশিদের পর্যটন বা ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করেছে ভারত। রোববার থেকেই শুরু হয়েছে আবেদন প্রক্রিয়া। কিন্তু এবার আর আগের নিয়মে ভিসা পাওয়া যাবে না। বদলে গেছে অ্যাপয়েন্টমেন্টের...
রাজধানী থেকে গাজীপুর-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য  আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ভারতের দিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতবিনিময়ের ঘটনায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করছে ঢাকা। বুধবার রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এ ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।  
সাতক্ষীরা আদালত চত্বরে পুলিশের হেফাজত থেকে মো. আজমাইন নামের এক আসামি পালিয়ে গেছে। বুধবার দুপুর দেড়টার দিকে এ ঘটনা হয়। আজমাইন আশাশুনি উপজেলার নাকতাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও মাদক মামলার আসামি। 
দীর্ঘদিন ধরে দেশে বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। এরই মধ্যে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদহার এবং ব্যবসায়িক...
লোডিং...

এলাকার খবর