মধ্যপ্রাচ্যের জলপথে যুদ্ধের দামামা বাজলে, তার সরাসরি আঁচ লাগে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে কারখানার চাকায়। ঠিক এমনটাই ঘটতে চলেছে। হরমুজ প্রণালির পর এবার বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রুট—ইয়েমেনের বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং কৌশলগত পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতি বিদ্রোহীদের হাতে। প্রশ্ন হলো—হুতিদের এই বিজয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত ও অর্থনীতিতে ঠিক কী ধরনের বড় ধাক্কা আসতে চলেছে?
লোহিত সাগরে আসলে কী ঘটেছে?
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, ইয়েমেনের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ, মোখা বন্দর এবং ধুবাব নগরের নিয়ন্ত্রণ এখন হুতি বিদ্রোহীদের দখলে। সৌদি আরবের পূর্বদিকের লোহিত সাগর থেকে আরব সাগরে যাওয়ার একমাত্র ও দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথ হলো এই বাব আল-মান্দেব প্রণালি। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ইউরোপে তেল পাঠানোর বিকল্প এই রুটটিকেই ব্যবহার করছিল সৌদি আরব। কিন্তু হুতিরা সাফ জানিয়ে দিয়েছে—সবার জন্য এই রুট উন্মুক্ত থাকলেও, সৌদি আরবের জন্য এটি পুরোপুরি বন্ধ।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ভয়াবহ অস্থিরতা
ইরান যুদ্ধের জেরে এমনিতেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ প্রায় বন্ধ। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সিএনবিসি নিউজের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল ব্যারেলপ্রতি ১০৪ দশমিক ২১ ডলারে এবং মার্কিন ডব্লিউটিআই ৯৯ দশমিক শূন্য আট ডলারে লেনদেন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা বা আইইএ পূর্বাভাস দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের এই অচলাবস্থা ২০২৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
এবার আসা যাক মূল কথায়—এই সংকটের সরাসরি বা নেতিবাচক প্রভাব কীভাবে আমাদের দেশে এসে পড়বে? আসুন একে একে দেখে নেওয়া যাক।
জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি খরচ: বাংলাদেশ তার জ্বালানি তেল এবং এলএনজির একটি বড় অংশ আমদানি করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে থাকায় এবং লোহিত সাগরের রুট অস্থিতিশীল হওয়ায় সরকারকে অত্যন্ত চড়া দামে জ্বালানি কিনতে হবে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হবে।
শিপিং খরচ বৃদ্ধি: ইউরোপ বা পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান জলপথ হলো লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল। এই রুটে নিরাপত্তা সংকট থাকায় জাহাজগুলোকে অনেক ঘুরে অর্থাৎ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ হয়ে আসতে হচ্ছে। ফলে শিপিং খরচ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে এবং পণ্য পৌঁছাতে অতিরিক্ত ১০ থেকে ২০ দিন সময় বেশি লাগছে।
কারখানায় উৎপাদন সংকট: সময়মতো কাঁচামাল বা এলএনজি আমদানি না হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা এবং তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এতে স্থানীয় উদ্যোক্তারা সময়মতো ক্রেতাদের পণ্য বুঝিয়ে দিতে বড় ধরনের বিপাকে পড়বেন।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি: জ্বালানির দাম বাড়লে এবং পরিবহন খরচ বেশি পড়লে দেশের বাজারে তার প্রভাব পড়বেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যার সরাসরি কোপ পড়বে সাধারণ মানুষের পকেটে।
বিশ্বজুড়ে পরিস্থিতি কী?
শুধু বাংলাদেশ নয়, এই সংকটের উত্তাপ টের পাচ্ছে পরাশক্তিগুলোও। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জ্বালানি অনিশ্চয়তার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে গেছে—সেখানে ডিজেলের দাম গ্যালনপ্রতি ছাড়িয়ে গেছে প্রায় ৬ দশমিক শূন্য ছয় ডলারে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি, হরমুজ আর বাব আল-মান্দেব প্রণালির এই রক্তক্ষয়ী ও জটিল দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক অর্থনীতি কোন দিকে মোড় নেয় এবং বাংলাদেশ এই ধাক্কা কীভাবে সামাল দেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।



