শরীরে নানা স্বাস্থ্যগত সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে থাকে ৪০ বছর বয়সের পর থেকেই। তাই প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে নিজের প্রতি আরও যত্নবান হতে হবে। সুস্থ থাকতে মেনে চলতে হবে বেশ কিছু নিয়ম।
১. ৪০ বছর বয়স যখনই ছোঁবেন, অবশ্যই একজন ডাক্তারের সঙ্গে ফিজিক্যাল ফিটনেসের জন্য ফলোআপ রাখবেন বছরে অন্তত ১ বার।
২. নারী কিংবা পুরুষ, প্রত্যেকেই উচ্চতা অনুযায়ী আইডিয়াল ওজন বজায় রাখার চেষ্টা করুন। প্রতিদিন ৩০ মিনিট থেকে ৬০ মিনিট ব্যায়াম করলে হার্টরেট ও ব্লাড সার্কুলেশন ভালো থাকবে।
৩. রক্তের শর্করা ও চর্বির মাত্রা দেখে নিন। রক্তচাপ মাপুন কিছুদিন পর পর। সুগার ও উচ্চরক্ত চাপের সমস্যা দেখা দিলে অবশ্যই ডাক্তারের নির্দেশনা অনুযায়ী মেডিকেশন শুরু করুন অনতিবিলম্বে। কারণ ডায়াবেটিস ও হাইপার বা হাইপারটেনশন প্রত্যেকেই সাইলেন্ট কিলার।
৪. খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনুন। তেল-চর্বিযুক্ত খাবার, জাঙ্ক ফুড, গরু-খাসীর মাংস, কলিজা, মগজ, নিহারী, কেক-পেস্ট্রি, কোমল পানীয়, টেস্টিং সল্ট এড়িয়ে চলুন।
৫. প্রতিদিন কুসুমসহ ডিম খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। তবে অমলেট বা পোচ খাওয়ার চাইতে সিদ্ধ খাওয়া বেশি উপকারী। কিন্তু তা হতে হবে ডিম সিদ্ধ হতে চুলায় বসানোর পর থেকে ৫ মিনিটের মধ্যে নামানো।এতে ডিম যে পরিমাণ সিদ্ধ হয়,সেটি সব চাইতে বেশি স্বাস্থ্যকর। আর গরম গরম ডিম ছিলে মাঝ বরাবর ফাটিয়ে নিয়ে যদি লবণের পরিবর্তে সামান্য লেবুর রস ছিটিয়ে নেন,তবে তো কথাই নেই। কুসুমে থাকা আয়রন, লেবুর ভিটামিন-সি এর সঙ্গে মিশে শরীরের রক্তস্বল্পতা দূর করতে সাহায্য করবে।বিশেষ করে নারীদের জন্য এই অভ্যাস করা বাঞ্ছনীয়।
৬. খাদ্যাভ্যাসে তাজা ও রঙিন শাক-সবজি, ফলমূল, লাল আটা, লাল চাল, যবের আটা বেশি প্রাধান্য দিন।
৭. কম মিষ্টি ফল বাছাই করুন। প্রতিদিন অবশ্যই একটি টক ফল খাওয়ার অভ্যাস গড়ুন। বেশি খাদ্য আঁশ থাকে এমন ফল বাছাই করুন। যেমন- আমড়া, শসা, বরই, আনারস, পেয়ারা, বাঙ্গি, তরমুজ, গ্রীন এপেল, ড্রাগন, সফেদা প্রভৃতি মৌসুমী ফল।
৮. সালাদ, টকদই প্রতিদিন রাখুন খাদ্যতালিকায়। এখন বীট ও টমেটোর সিজন। তাই শসা, টমেটো , গাজর, বীট রুট, লেটুস দিয়ে সালাদ খান। কিংবা টকদই মিশিয়েও খেতে পারেন এসব ফল-সবজি দিয়ে সালাদ। খেতে পারেন ‘ডিটক্স ওয়াটার’। কাঁচের জগে বীট রুট, গাজর, শসা, আপেল এর পাতলা স্লাইস, লেবুর রস ও মধু দিয়ে পানির সঙ্গে মিশিয়ে রাখুন ৪ ঘণ্টা। এরপর শুধু সে পানি পান করুন। এই পানি বডিকে ডিটক্সিফাই করে টক্সিন গুলোকে ইউরিনের মাধ্যমে বের করে করে দিয়ে সুস্থ রাখবে আপনাকে।
৯. স্ন্যাকস টাইমে কাঠবাদাম, আখরোট, কালোজিরা ডাস্ট, ড্রাই ফ্রুটস রাখুন প্লেটে। ঘোল বা মাঠা খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। ডায়াবেটিস না থাকলে খেতে পারেন খেজুর, কিসমিস বা কিসমিস ভিজানো পানি। ৪০ এর পর ছেলেদের ফার্টিলিটি ভালো রাখার জন্য সারারাত ভিজিয়ে রাখা কিসমিসের পানি খুব ভাল উপকারে আসে।
১০. লবণ খাবার প্রবণতা কমিয়ে দিন, সঙ্গে সল্টেড খাবারও। ডাবের পানি, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফ্রুট, ক্যানবেরী, টমেটোর জুস বা স্মুদি খেতে পারেন পুদিনা পাতা যোগ করে।
১১. প্রতিদিন ১ কাপ থেকে ১ গ্লাস পর্যন্ত লো ফ্যাট দুধ খাওয়ার অভ্যাস করুন। দুধ চায়ের পরিবর্তে পান করুন গ্রিন টি, পুদিনা বা তুলসী কিংবা লেমন টি।
১২. সুগার ফ্রি খাবার খাওয়ার অভ্যাস করুন প্রয়োজনে। এতে চেহারায় তারুণ্য বজায় থাকবে।
১৩. প্রচুর পানি পান করুন। এতে শরীরে পানির ভারসাম্য ঠিক থাকবে। খেতে পারেন ফলের জুস। এতে রক্তের ইলেক্ট্রলাইট ব্যালেন্স থাকবে।
১৪. চল্লিশ বছর বয়সের পর থেকে হাড়ের ঘনত্ব কমতে থাকে, ফলে হাই ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডি সমৃদ্ধ খাবার নিশ্চিত করুন। আর অবশ্যই প্রতিদিন ১০ মিনিট থেকে ১৫ মিনিট রোদে বসুন বা হাঁটুন, সকাল ১১টা থেকে বেলা ১টার মধ্যে।
১৫. উচ্চ আঁশ সমৃদ্ধ খাবার খান। রক্তের কোলেস্টেরল ও কোষ্ঠকাঠিন্য রোধে খেতে পারেন চিয়া সিড পানি বা ইসুবগুল ভেজানো পানি।
১৬. মানসিক দুশ্চিন্তা ও স্ট্রেস কমান। রাত জাগার অভ্যাস ছাড়ুন। ৭-৮ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে এই ৪০ বা তার বেশি বছর বয়সে অত্যন্ত প্রয়োজন আপনার জন্য। মনে রাখবেন এই ৪০ বছর+ বয়সটি আপনার লাইফের আরেকটি টার্নিং পয়েন্ট আপনার জন্য। কেননা এর মধ্য দিয়ে আপনি জীবনের আরেকটি অধ্যায়ে ঢুকছেন। সুতরাং সব দিক থেকে নিজেকে ঠিক ও ফিট রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এই বয়সে।
লেখক: ক্লিনিক্যাল নিউটিশনিষ্ট অ্যান্ড ডায়েটিশিয়ান, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হসপিটাল



