যে কোনো সময়েই যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়ার মতো তেল তাঁর হাতে আছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে এই মুহূর্তে তাঁর দেশের অপরিশোধিত তেল মূলত চীনে রপ্তানি করা হলেও সেখানে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির জটিলতা নেই, তাই সহজে জাহাজের গতিপথ চীন থেকে ঘুরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের দিকে করেও দিতে পারবেন। তেলের প্রলোভন দিয়ে চাপ কাটাতে পারলে খুশিও না হওয়ার কোনো কারণ নেই তাঁর।
যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত দেনদরবারে গেলে তাই তেল বিক্রির প্রতিশ্রুতি দিয়েই হয়তো উদ্ধার পেতে চাইবেন যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে প্রচণ্ড চাপের মুখে থাকা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। কিন্তু শুধু তেল দিয়েই কি পার পাবেন?
গত মাস দুয়েকে ক্যারিবিয়ান সাগরে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দাবি করেছে, ভেনেজুয়েলা থেকে তাদের দেশে মাদক চোরাচালান বন্ধ করাই এই সামরিক উপস্থিতির উদ্দেশ্য। কিন্তু বিশ্লেষকদের ধারণা, ভেনেজুয়েলা প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে উৎখাত করাই মূল উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের। এর মধ্যেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, তিনি মাদুরোর সঙ্গে আলাপে বসতে রাজি আছেন!
এর উল্টো দিকে যদিও গত সোমবার ভেনেজুয়েলার সশস্ত্র সংগঠন কার্তেল দে লস সোলেসকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ বলে ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মাদক, অস্ত্র ও অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত এই সংগঠনটি ভেনেজুয়েলার সামরিকবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাই নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ আছে, এমনকি মাদুরো নিজেও এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ তোলে পশ্চিমের দেশগুলো। সেই সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার অর্থ কী দাঁড়ায়? সংশ্লিষ্টদের ‘সূত্র’ জানিয়ে রয়টার্সের বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে লেখা, আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে আরও অপারেশনের প্রস্তুতির মধ্যে এই নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা মানে মাদুরোর ওপর চাপ তৈরি করা।
মাদুরোর দেনদরবারের অস্ত্র? তেল
পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপিইসির (ওপেক) সদস্য ভেনেজুয়েলার তেলের উৎপাদন এই বছরে দাঁড়িয়েছে দিনপ্রতি প্রায় ১১ লাখ ব্যারেলে। নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে দেশটি তেল উৎপাদনে নিজেদের যে রেকর্ড গড়েছিল, বর্তমানে তার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদন করে ভেনেজুয়েলা। পশ্চিমের নিষেধাজ্ঞার কারণে রপ্তানির সুযোগও কম, গত জুন থেকে অক্টোবরে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশই গেছে চীনে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে লেখা, বিশ্লেষকদের মতে, এই তেলের কার্গোর একটা অংশ চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া আর যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলায় তেল উৎপাদনের লাইসেন্স দেওয়ার প্রতিশ্রুতিই হতে পারে সম্ভাব্য আলোচনায় মাদুরোর সেরা টোপ।
জ্বালানি বিশ্লেষক থমাস ও’ডনেল বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে আরও বেশি তেল পাঠানো আর ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের স্বার্থ রক্ষা করা…এগুলো মাদুরো সহজেই প্রস্তাব করতে পারেন।’ তবে বর্তমানে তেলের বাজারের স্থিতিশীলতা আর দামের পড়তির কারণে যুক্তরাষ্ট্র সে প্রস্তাবে গলে যাবে কি না, এ নিয়ে সংশয় জানিয়ে ও’ডনেল বলেছেন, মাদুরো সেই প্রস্তাব দিলেও ‘সেটা সম্ভবত যথেষ্ট হবে না, যেহেতু ওয়াশিংটনই এখন সুবিধাজনক অবস্থানে।’
ভেনেজুয়েলার তেল মন্ত্রী দেলসি রদ্রিগেস গত সোমবার বলেছেন, ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের বিশাল মজুতের কারণেই ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। ‘ওরা ভেনেজুয়েলার তেল আর গ্যাসের মজুত চায়। মুফতে, কোনো অর্থ খরচ না করে’ – বলেছেন রদ্রিগেস। এর আগে রদ্রিগেস বলেছিলেন, টেক্সাস, লুইজিয়ানার মতো মার্কিন উপসাগরীয় উপকূলের রিফাইনারিগুলো ভেনেজুয়েলার ভারী অপরিশোধিত তেল চায়। যুক্তরাষ্ট্র মূলত পাতলা তেল উৎপাদন করে।
যুক্তরাষ্ট্রে ভেনেজুয়েলা তেল রপ্তানি করে তাদের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের কোম্পানি পিডিভিএসএ-র অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি শেভরনকে প্রদত্ত বিশেষ লাইসেন্সের মাধ্যমে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে লেখা, এ বছরের প্রথম কোয়ার্টারের (জানুয়ারি-মার্চ) তুলনায় তৃতীয় কোয়ার্টারে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি অর্ধেকে নেমে গেছে।
ভেনেজুয়েলার যেখানে সুবিধা
২০১৯ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ-র বেশিরভাগ তেল রপ্তানির চুক্তিই এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে। তড়িঘড়ি করে পিডিভিএসএ তখন ‘স্পট মার্কেটে’ চড়া ডিসকাউন্ট দিয়ে তেল বিক্রি করতে বাধ্য হয়।
এই মুহূর্তে ফিউচার মার্কেটে পিডিভিএসএ-র কোনো চুক্তি নেই। ফলে চীনের স্বতন্ত্র্য রিফাইনারিতে যে তেল সরবরাহ তারা করে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা হলে সেই জাহাজের কার্গোগুলোকে সহজেই যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দিতে পারবে ভেনেজুয়েলা।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০২৫-এর দ্বিতীয়ার্ধে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশই গেছে চীনে। গত বছরের পুরোটাতে এই হার ছিল ৬৩ শতাংশ। অর্থাৎ, ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানির গন্তব্যের পোর্টফোলিওকে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ আছে।
শুধু তেল নয়, লাইসেন্সও
তেল রপ্তানির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর ভেনেজুয়েলায় তেল উৎপাদনের লাইসেন্স নিয়েও দেনদরবার করতে পারেন মাদুরো। সেটা হলে ভেনেজুয়েলার তেল যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে যাওয়ার রাস্তা সহজ হবে।
বিশ্বের সর্ববৃহৎ অপরিশোধিত তেলের মজুত ভেনেজুয়েলার হলেও মাদুরো প্রশাসন তাদের তেলকূপগুলো নিয়ে বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তিতে যেতে পারেনি। মাদুরোর প্রস্তাবিত মডেলে শুধু গুটিকয়েক ছোট কোম্পানিই চুক্তি করেছে, যা দেশটির তেলের উৎপাদনে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি।
ভেনেজুয়েলার সাবেক নেতা উগো শাভেসের সময়ে যেভাবে বিদেশি কোম্পানির হাতে থাকা তেলের ক্ষেত্রগুলোকে সরকারের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেই অভিজ্ঞতার কারণে পশ্চিমা অনেক বড় জ্বালানি কোম্পানিই ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগে আগ্রহী হয়নি। তাছাড়া ভেনেজুয়েলার জ্বালানি উৎপাদন শিল্পের যন্ত্রপাতি ও প্রক্রিয়া যেমন পুরোনো হয়ে গেছে, তাতে সেখানে বিনিয়োগ করতে গেলে অনেক বড় অঙ্কের মূলধন নিয়েই নামতে হবে।
ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগের অনুমতি দিতে রাজি নয়, শুধু কয়েকটি কোম্পানিকে সাময়িক ব্যবসায়ের লাইসেন্স দিয়ে আসছে তারা।



