মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইরান। দেশটির ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) অনুমতি না পেয়ে এই পথ অতিক্রম করতে পারছে না কোনো জাহাজ। বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’ও হরমুজ পার হওয়ার অনুমতি পায়নি।
ঢাকায় কূটনৈতিক সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতিতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি তেহরান। ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত নিজেও এ কথা বলেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এ কারণেই বাংলাদেশি জাহাজ হরমুজ পার হওয়ার অনুমতি পাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে ইরানে আক্রমণ করে এবং এতে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এ ছাড়া হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানসহ উচ্চপর্যায়ের বেশ কয়েকজন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে ইরান।
জবাবে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরান সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন স্বার্থ লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
বিবিসি বাংলা বলছে, খামেনির মৃত্যুর পর যথাযথ শোক না জানানো এবং দূতাবাসে শোকবইয়ে কোনো কর্মকর্তা গিয়ে স্বাক্ষর না করার ঘটনা ইরানে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদী একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের বিবৃতিতে তেহরান সন্তুষ্ট নয়। তিনি জানান, বাংলাদেশ যে বিবৃতি দিয়েছে, তাতে অবস্থান স্পষ্ট করা হয়নি। এ সময় তিনি স্পেনের মতো ইউরোপীয় দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে জনগণের যুদ্ধবিরোধী মিছিলের উদাহরণ দেন। সে আলোকে তিনি বাংলাদেশের কাছ থেকেও সুস্পষ্ট অবস্থান আশা করেন।
রাষ্ট্রদূত অবশ্য জানান যে, বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী ছয়টি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে তেহরান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গত ৫ এপ্রিল ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদীর সঙ্গে বৈঠক করে ‘বাংলার জয়যাত্রা’সহ আরেকটি বাংলাদেশগামী অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে সহায়তা চান। রাষ্ট্রদূত জানান, এ বিষয়ে যথাযথ পর্যায়ে ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
কিন্তু এরপরও দুই দফায় চেষ্টা করে হরমুজ পার হতে পারেনি বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজটি। ফলে রোববার তুরস্কে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আবারও বিষয়টি উত্থাপন করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
বিবিসি বাংলা বলছে, মূলত যুদ্ধকেন্দ্রিক বাংলাদেশের অবস্থানটিই ইরানকে ক্ষুব্ধ করেছে, যা এখন সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলছেন, পররাষ্ট্রনীতির একটা নৈতিক ভিত্তি থাকতে হয়। কোনো দেশ আক্রান্ত হলে বাংলাদেশ তা সমর্থন করে না। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের কোনো বিষয়ে অবস্থান প্রকাশের ক্ষেত্রে এ দুটো বিষয় মনে রাখা জরুরি। এর ব্যত্যয় হলেই অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সব রাষ্ট্রেরই সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক সম্মানকে গুরুত্ব দিতে হয়। এবার সেভাবে হয়নি বলেই হয়তো প্রশ্নটি উঠেছে।’
‘বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজটি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে গত ২৬ জানুয়ারি। ২৬ ফেব্রুয়ারি কাতারের একটি বন্দর থেকে প্রায় ৩৯ হাজার মেট্রিক টন স্টিল কয়েল নিয়ে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরে গিয়েছিল জাহাজটি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর পর ওই বন্দরে জাহাজটির ২০০ মিটারের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। পণ্য খালাস শেষে জাহাজটির গন্তব্য ভারতের মুম্বাই বন্দর ঠিক হলেও আরব আমিরাতের কোস্টগার্ড নিরাপত্তার কারণে বাধা দিলে জাহাজটি গভীর জলসীমায় অবস্থান নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের যুদ্ধবিরতি শুরু হলে ৮ এপ্রিল হরমুজ প্রণালি পার হতে সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল জাহাজটি। কিন্তু ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতি না পাওয়ায় জাহাজটি পার হতে পারেনি।
পরে ইরান আবার হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলে জাহাজটি পুনরায় রওনা হয়। কিন্তু হরমুজ প্রণালির ২০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে যাওয়ার পর ইরানের নৌবাহিনী জাহাজটিকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। এ পরিস্থিতিতে গত শুক্রবার রাত দেড়টার দিকে জাহাজটি আবার আগের অবস্থানের দিকে ফিরে যায়।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘সরকার যেভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে, তাতে আমরা আশা করি দ্রুতই জাহাজটি ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতি পাবে।’



