বাংলাদেশের ঝিনাইদহ–৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম ভারতের কলকাতায় হত্যার শিকার হয়েছেন বলে উভয় দেশের কর্তৃপক্ষ বলছে। দুই দেশেরই গোয়েন্দা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, আজীমকে কলকাতায় হত্যা করা হয়েছে। আর হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছে বাংলাদেশে। এ হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন থেকে শুরু করে মূল পরিকল্পনাকারী—সবাই বাংলাদেশের। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে এম আজীম হত্যার বিচার কোন দেশে হবে—বাংলাদেশ নাকি ভারতে?
যেকোনো অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটনের স্থান গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত করছে। আজীম হত্যার শিকার হয়েছেন বলা হলেও তাঁর মরদেহের সন্ধান এখনো মেলেনি। সর্বশেষ কলকাতার সঞ্জীব গার্ডেনের সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে মাংস সদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে, যা আজীমের দেহাবশেষ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে উভয় দেশের তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছ থেকে যে তথ্য এসেছে, তাতে আজীম কলকাতায় হত্যার শিকার হয়েছেন। এবং তাঁর হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী আক্তারুজ্জামান শাহীন একজন বাংলাদেশি আমেরিকান। আবার এ হত্যায় জড়িত সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। এ কারণে হত্যার মোটিভ যদি থাকে বাংলাদেশে, তবে হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র ও মরদেহ গায়েবে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং হত্যার যাবতীয় আলামত কলকাতায়। আবার সম্ভাব্য আসামিদের সবাই বাংলাদেশের নাগরিক।
এ অবস্থায় আজীম হত্যার বিচার কোন দেশে হবে—সে প্রশ্ন উঠেছে। এ প্রশ্নের উত্তরে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ভুক্তভোগী, আসামি, ঘটনাস্থল এবং হত্যাকাণ্ডের মোটিভ বিবেচনায় দুই দেশেরই এই হত্যা মামলার বিচার করার এখতিয়ার রয়েছে। কারণ, দুই দেশেরই ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, সাধারণত অপরাধ সংঘটনের স্থানে মামলার বিচার হয়। তবে এমপি আজীম হত্যাকাণ্ডের ঘটনার যে ধরন, তাতে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মামলার বিচার দুই দেশেই সম্ভব বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যেকোনো ধরনের অপরাধ সম্পর্কিত বিষয়ে পারস্পরিক সহায়তার লক্ষ্যে একটি চুক্তি রয়েছে। এই চুক্তির অধীনে দুই দেশই চাইলে এই হত্যা মামলার বিচার করতে পারে। বাংলাদেশে ২০১২ সালে ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্স ইন ক্রিমিনাল ম্যাটারস অ্যাক্ট’ নামে একটি আইন পাস হয়। এর অধীনে একটি নীতিমালাও রয়েছে। এ ছাড়া ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এই আইনের অধীনে আন্তর্জাতিক কনভেনশনও আছে, যাতে উভয় দেশ সই করেছে। শুধু তাই নয়, এই কনভেনশনের অধীনে ২০১৩ সালে দুই দেশ একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।
ফলে ভারতের কোনো নাগরিক যদি বাংলাদেশে অপরাধ করে বা অপরাধের শিকার হয়, সেক্ষেত্রে ভারতেও এর বিচার হতে পারে। সেক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের শারীরিক বা দালিলিক প্রমাণ, অভিযোগপত্র বা কোনো সাক্ষ্য এমনকি মৌখিক সাক্ষ্য দেওয়ার প্রয়োজন হলেও ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনুরোধ করতে পারবে। ঠিক বিপরীতভাবে যদি বাংলাদেশের নাগরিক ভারতে কোনো অপরাধ করে বা অপরাধের শিকার হয়, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ মামলা করতে পারবে। এক্ষেত্রে যেসব দালিলিক বা বস্তুগত প্রমাণ আছে, তা তাদের কাছে চাইতে পারবে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে দুই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ফলে এমপি আজীম হত্যা সম্পর্কিত বিভিন্ন বস্তুগত প্রমাণ বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে সংগ্রহ করতে পারবে। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার প্রয়োজন হলে ভারত থেকে আসতে পারবেন সাক্ষীরা। মামলার সাক্ষী হিসেবে আলামত জব্দকারী কর্মকর্তা, তদন্ত কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সবাই অথবা বিচারের স্বার্থে যাদের সাক্ষ্য প্রয়োজন, তাঁরা বাংলাদেশের আদালতে সাক্ষ্য দিতে পারবেন। এমনকি বাংলাদেশের এভিড্যান্স অ্যাক্ট পরিমার্জন করে ডিজিটাল সাক্ষ্যের সুযডোগ রাখায়, ভার্চ্যুয়াল সাক্ষ্যও নেওয়া যাবে।
প্রসঙ্গত, আজীম হত্যাকাণ্ডে ঢাকা ও কলকাতা দুই স্থানেই মামলা হয়েছে। গত ১২ মে এমপি আজীম কলকাতায় যান। ১৬ মের পর থেকে পরিবারের সাথে তাঁর আর যোগাযোগ হয়নি। ১৮ মে এমপি আজীম নিখোঁজ মর্মে তাঁর পরিবারের সদস্যরা থানায় অবহিত করেন। গত ২২ মে কলকাতা পুলিশ আজীম খুন হয়েছেন বলে জানায়। একই দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান জানান, এমপি আজীমকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এর পর নানা সময়ে দুই দেশের আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তরফ থেকে নানা তথ্য পাওয়া যায়। এখনো আজীমের মরদেহের নিশ্চিত সন্ধান মেলেনি। তাঁর মরদেহ কী করা হয়েছে, তা নিয়েও নানা ধরনের তথ্য আসছে। তদন্তে উভয় দেশের গোয়েন্দারা কাজ করছেন। কলকাতায় এবং ঢাকায় পৃথক মামলা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে আরেকটি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী আক্তারুজ্জামান শাহীন। তিনি বাংলাদেশি আমেরিকান। মুশকিল হচ্ছে বাংলাদেশের সাথে আমেরিকার বন্দী প্রত্যার্পণ চুক্তি নেই। এমন চুক্তি আছে ভারতের সাথে আমেরিকার। ফলে মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে আক্তারুজ্জামান শাহীন শেষ পর্যন্ত অভিযুক্ত হলে এবং তিনি আমেরিকায় চলে গিয়ে থাকলে এ হত্যার বিচার বাংলাদেশে হলে, তাঁকে ফিরিয়ে আনার জোর দাবি বাংলাদেশ করতে পারবে না। তবে ভারতে বিচার হলে, তারা তাঁকে ফেরত চাইতে পারবে এবং চুক্তি অনুযায়ী আমেরিকাকে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মামলা যেহেতু দুই দেশে হয়েছে, যেকোনো এক দেশে বিচার হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে উভয় দেশ আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদ ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে বলেন, আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে বা বাংলাদেশের পতাকাবাহী কোনো জাহাজ বা উড়োজাহাজের মধ্যে অপরাধ সংঘটন হলে তার বিচার বাংলাদেশের আদালতে হবে। প্রায় সব দেশ ও অঞ্চলের ক্ষেত্রেই বিধানটি এমন। এ ক্ষেত্রে আমেরিকার অঙ্গরাজ্য টেক্সাস ব্যতিক্রম। তাদের আইন অনুযায়ী, তাদের সাথে কোনো সম্পর্ক না থাকলেও সেখানে যদি মামলা হয়, তাহলে তার বিচার তারা করতে পারবে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়। সে ক্ষেত্রে ভারতেই বিচার হওয়ার কথা।
আজীম হত্যার ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া দরকার উল্লেখ করে ইমতিয়াজ মাহমুদ বলেন, যদি হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে এবং এখন পর্যন্ত পত্রিকান্তরে যা জানা যাচ্ছে, তাতে মূল পরিকল্পনা বাংলাদেশে হয়েছে। হত্যা বা অপরাধের পরিকল্পনা নিজেই একটি অপরাধ। তাই এর বিচার বাংলাদেশে হতে পারে। এমনকি হত্যাকাণ্ডের বিচার ভারতে এবং হত্যার পরিকল্পনাসহ অন্য অভিযোগগুলোর বিচার বাংলাদেশে—অর্থাৎ দুই দেশ মিলেও বিচার হতে পারে।
আরও পড়ুন:
- সেপটিক ট্যাংকে মাংসপিণ্ডের সঙ্গে মিলল হাড় ও চুল
- ভারতে গিয়ে ৪ দিন ধরে ‘খোঁজ নেই’ এমপি আনারের
- নিখোঁজ এমপি আনার, ৬ দিনেও সুস্পষ্ট তথ্য নেই সরকারের কাছে
- এমপি আনোয়ারুল আজীমের মরদেহ পাওয়া গেল কলকাতায়
- নিখোঁজ হাওয়া থেকে মরদেহ উদ্ধার, এমপি আজীমকে নিয়ে যা ঘটল
- কলকাতায় এমপি আজীমের মরদেহ উদ্ধার: যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি
- এমপি আজীমকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
- জব্দ হওয়া লাল গাড়িটি ভাড়া করেছিলেন এমপি আজীমই