মৃত্যুই এখন জনপ্রিয় খবর

কোনো সুখবর নয়, কোনো অর্জন বা কীর্তির খবরও নয়, এই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় খবর মৃত্যু। সে মৃত্যু সুদূর গাজায় হোক, হোক তুরস্ক বা ইউক্রেনে। যেকোনো স্থানে, যেকোনোভাবে মৃত্যুই এখন সবচেয়ে বেশি পাঠ্য ও দ্রষ্টব্য তথ্য।

অভিনেত্রী হুমায়রা হিমু মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। হত্যা, আত্মহত্যা, প্ররোচিত আত্মহত্যা ইত্যাদি নিয়ে চলছে জল্পনা। এখনো এর মীমাংসা হয়নি। তদন্ত চলছে। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া কথিত প্রেমিককে নেওয়া হয়েছে পুলিশ হেফাজতে। এই মৃত্যুর খবর গোগ্রাসে গিলেছে মানুষ, এখনো গিলছে। আজকের ইন্টারনেট এবং সেই সূত্রে ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে এই সত্য লুকানোর আর কোনো রাস্তা নেই।

বলা হতেই পারে যে, হিমু ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী। ফলে তাঁর মৃত্যু, তা যদি অস্বাভাবিক হয়, তা মানুষকে টানবে বেশি। এতে বিস্ময়ের কী আছে? না নেই। কিন্তু তার ঠিক আগে আগে গত ২৮ অক্টোবর পুলিশ সদস্যের মৃত্যুও একইভাবে পাঠকদের টেনেছিল। ঠিক যেমনটা প্রতিদিন গাজায় নিহতের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা আকৃষ্ট করছে মানুষকে। মানুষ সব ভুলে শুধু মৃত্যুর খবর পড়ছে।

ঘটনাস্থল যত দূরে হয়, ততই মৃতের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দূর দেশে ভূমিকম্পে তিনজনের মৃত্যু কোনো খবর নয়, ৩০০ খবর বটে। ফলে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে খবর সংগ্রাহকদেরও একটা হুড়োহুড়ি থাকে। কারণ, আজকের যুগে খবর বা তথ্য তো শেষ পর্যন্ত পণ্যই। আর পণ্যের প্রসার যত বেশি হবে, ততই লাভ। ফলে ভুলভাল সংখ্যা, ভয়াবহতার অতিশোয়াক্তি হয় হরহামেশাই।

কথা হলো সুখবরের ন্যাওটা মানুষ কেন বরাবরই ধ্বংস ও ক্ষয়ের খবরের দিকে এত করে আকৃষ্ট হয়? কেন নির্মাণের চেয়ে লোপে বেশি নজর তার? একটু ভাবলেই উত্তরটি পাওয়া যাবে।

সেই শুরু থেকেই মানুষ তো বেড়ে উঠেছে অন্য সব প্রাণীর মতোই প্রজাতি রক্ষার দায় নিয়ে। এ কারণে জন্ম ও মৃত্যু তার কাছে সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ।  বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে, যেখানে সামাজিক সংশ্লেষ এখনো ততটা রোবোটিক নয়, সেখানে জন্ম এখনো অন্তত ছোট পরিসরে হলেও উৎসবের উপলক্ষ্য হয়ে আসে। কিন্তু ব্যস্ততার হারের সাথে এ উদ্‌যাপনে রকমফের হয়। জন্ম এখন মানুষের কাছে কম-বেশি আরেকটি মৃত্যু ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু মৃত্যু? না সে এখনো আগের আবেদন অনেকটাই ধরে রেখেছে।

মৃত্যু মানে, প্রজাতির একটি অংশের লোপ। এর সংখ্যা যত বাড়ে, তত শঙ্কা বাড়ে। নিজের অজান্তেই মানুষ এর সাথে সম্পৃক্ত হয়। এ কারণে তুরস্কের ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়ালে ঢাকায় বসে মানুষ হিসাব করতে বসে তার ভূমি কতটা ভূমিকম্পপ্রবণ। তার চোখে তখন ছাদের ফাটল অনেক বড় করে দেখা দেয়। বড় স্থাপনার ত্রুটি নিয়ে কথা বলতে শুরু করে বিশেষজ্ঞ থেকে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত। এ আর কিছুই নয়, প্রবৃত্তি।

হ্যাঁ, প্রবৃত্তিই মানুষকে অনেক বেশি মৃত্যু-সংশ্লিষ্ট করে রেখেছে। মানুষ নিজের নশ্বরতার কথা মনে করে তখন। হুমায়রা হিমুর মৃত্যু তাই শুধু জনপ্রিয়তার বিবেচনাতেই নয় শুধু, পর্দায় দেখা হাসিমুখটির পেছনে নাচতে থাকা মৃত্যুর ছায়ার কারণেও মানুষের মনে ঢুকে পড়ে। মানুষ আবিষ্কার করতে থাকে নিজের ও পার্শ্ববর্তীজনের মুখে মৃত্যুর ছায়া। মানুষের এই বেদনাকামীতা তাকে আরও একবার হুমড়ি খেয়ে পড়তে বাধ্য করে মৃত্যুর সংবাদে।

সেই পুলিশ সদস্যের মৃত্যু কিংবা সেই রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যুও একই কারণে মানুষকে নাড়িয়ে দেয়। তাকে বাধ্য করে এ সম্পর্কিত সংবাদটি পড়তে। মানুষ সেই সংবাদেই শুধু তৃপ্ত হয় না। সে খুঁজতে থাকে, মৃত আলোচিত ব্যক্তিটি জীবদ্দশায় কতটা সাধারণ ছিল? তাঁর পরিবার-পরিজন কে কোথায় আছে। স্বাভাবিক বা অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি কী করছিলেন? ঠিক এ কারণেই দুর্ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মৃত্যুর খবর মানুষকে আকৃষ্ট করে বেশি। মানুষ নিজের ভঙ্গুরতার সাথে আরেকজনের প্রামাণ্য লোপের সম্বন্ধ খুঁজতে ব্যস্ত হয়।

যতই পীড়াদায়ক হোক না কেন, এটাই সত্য। দুর্ভোগ, লয়, ক্ষয় ও লোপের মতো আকর্ষণীয় খবর যেন আর নেই। কারণ, যত অমরত্বের, যত সমৃদ্ধির স্বপ্নই মানুষ দেখুক না কেন, সে তো মূলত বিরহকামী। সে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে একটু কাঁদতে চায়। কারণ বহু বছরের বহু বেদনা জমে আছে তার বুকের ভেতর। সে যেন শুধু একটি দুঃসংবাদ খুঁজেছে, যে হতে পারবে তার প্রকৃত সারথি। যে তাকে সঙ্গ দেবে, বলবে শুধুই তুমিই নও, দেখো আর কত শত লোক মরছে প্রতিদিন। কিন্তু এই যে আকর্ষণ, এটা কি সব দেশে একই রকম থাকে? না।

যে দেশে স্বপ্ন যত সুদূর, জীবন যত কঠিন, মৃত্যুর খবরের আকর্ষণও তত বেশি। মানুষ নিজের বাস্তবতার সাথে সদ্যমৃত ব্যক্তিটির বাস্তবতাকে মিলিয়ে দেখতে চায়। এও এক ভাগ্যশাস্ত্র বটে। খেয়াল করলে হয়তো এই প্রবণতার সাথে অর্থনীতি, মানুষের জীবনযাপনের ব্যয়, তার জীবনযুদ্ধের প্রকটতা, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শাসনের সম্পর্ক সহজেই বের করে আনা সম্ভব। সাধারণ বিবেচনা বলে, মানুষের জীবন যত কঠিন হতে থাকে, সে তত বেশি অলৌকিকে ভরসা করে। দুর্নীতি ও অন্যায়ের সাথে বাড়তে থাকে সামষ্টিক অর্জন নিয়ে অবিশ্বাস। ফলে অর্জনকে আর অর্জন হিসেবে সে গ্রহণ করতে পারে না। সে শুধু প্রশ্ন করে। সে আর উদ্‌যাপন করতে পারে না ব্যক্তিক বা সামষ্টিক কোনো অর্জন বা সুখবরকে। এ সম্পর্কিত তথ্য দেখে সে পাশ কেটে চলে যায়। 

সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে মানুষ যত অভিযোগ মুখর হয়ে ওঠে ততই সে মৃত্যু, ধ্বংস ইত্যাদি সম্পর্কিত খবরে আকৃষ্ট হয়। নিজের দুর্দশার সাথে প্রচারিত তথ্যকে মিলিয়ে বলতে চায়–এই তো দেখেছ কী কাণ্ড? আমি তো এমন পরিণতির কথাই বলছি সবসময়। সে যেন এক সতর্কবার্তা তুলে ধরতে চায় সব সময়, সবার কাছে। এ কারণে মৃত্যু বা ধ্বংসের খবরকেই সে তার ধ্বজা হিসেবে বেছে নেয়, আর তা আরও আরও প্রচার করে ছড়িয়ে দিতে চায় সর্বত্র। এর প্রভাবে সংবাদ সংগ্রাহক থেকে প্রচারক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান তার সমস্ত নিবেদন ঢেলে দেয় এ সম্পর্কিত খবরে। ফলে গোটা তথ্যপ্রবাহই হয়ে ওঠে দুঃসংবাদময়, যা একটু একটু করে মানুষকে মেরে ফেলতে থাকে।

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন