২৪ এপ্রিল, ২০২৪। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে নির্বিচার রাজবন্দী হত্যাকান্ডের ৭৪তম বার্ষিকী। ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল খাপড়া ওয়ার্ডে গুলি চালিয়ে সাতজন কমিউনিস্ট বন্দীকে হত্যা করা হয় এবং বাকি চৌত্রিশ জন বন্দী আহত হন। প্রতি বছর এ দিনটি দেশের প্রগতিশীল দল, সংগঠন ও মানুষেরা ‘খাপড়া ওয়ার্ড শহীদ দিবস’ হিসেবে পালন করে।
১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে ১৯০ বছরের লড়াই সংগ্রামের অবসানের মধ্য দিয়ে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে যথাক্রমে পাকিস্তান ও ভারত স্বাধীন হয়। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণ পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাথে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এক হাজার মাইল ব্যবধানের দুটি ভূখণ্ড মিলে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। একমাত্র যোগসূত্র ছিল ধর্ম। এ ধরনের কৃত্রিম রাস্ট্রের সীমাবদ্ধতা প্রথম থেকেই ফুটে উঠে। কমিউনিস্ট পার্টি ও মুসলিম লীগের হাশিমপন্থী নেতা-কর্মীদের শুরু থেকেই সন্দেহ ও শত্রুতার চোখে দেখে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী।
দীর্ঘ লড়াইয়ে পোড়খাওয়া কমিউনিস্টরা বুঝতে পারে তাদের কষ্টের দিন শেষ হয়নি। সামনে রয়েছে ভয়ঙ্কর দুঃসময়। প্রলম্বিত হবে নিপীড়নকাল। তাই স্বাধীনতাত্তোর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পাকিস্তানে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আন্দোলন জারি রাখার প্রয়োজনীয়তা থেকে পাকিস্তানের স্বাধীনতার মাত্র তেইশ দিন পর ১৯৪৭ সালের ৬-৭ সেপ্টেম্বর গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠিত হয় কমিউনিস্ট পার্টি প্রভাবিত ছাত্র ফেডারেশনের সাবেক ও বর্তমান নেতা কর্মী ও বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম গ্রুপের যুব নেতা-কর্মীদের উদ্যোগে।
দেশভাগ হওয়ায় আস্তে আস্তে সব ভাগ হয়ে যায়। রাজনৈতিক দল, সংগঠনও ভাগ হয়ে যায়। ১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি-৬ মার্চ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীন ভারতবর্ষে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় কংগ্রেসে গৃহীত রাজনৈতিক লাইন হচ্ছে— ১) ভারতের স্বাধীনতা প্রকৃত স্বাধীনতা নয়; ঝুটা স্বাধীনতা, ২) সাম্রাজ্যবাদের প্রতি জাতীয় বুর্জোয়াশ্রেণি বশ্যতা স্বীকার করেছে, ৩) গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কাজ সম্পন্ন করার জন্য জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করতে হবে এবং একই সাথে সমাজতন্ত্র গড়ে তুলতে হবে (Intertwining of two Revolutions), ৪) এই বিপ্লবের নেতৃত্বে থাকবে শ্রমিক শ্রেণি।
দ্বিতীয় কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক পি সি যোশীর পরিবর্তে কমরেড বি টি রণদীভেকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে। দ্বিতীয় কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অনুসারে পাকিস্তানের উভয় অংশের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা কংগ্রেস স্থলে বিশেষ সম্মেলনে মিলিত হয়ে পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। পাকিস্তানের কমিউনিস্টদের সভা থেকে পাকিস্তানের জন্য একটি পৃথক রাজনৈতিক দলিল ও গঠনতন্ত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়, যা ছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি কর্তৃক গৃহীত দলিলের প্রতিচ্ছবি। মুসলিম লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পন্থা গ্রহণ করে।
কংগ্রেসে কমরেড সাজ্জাদ জহিরকে সাধারণ সম্পাদক করে ৯ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। একই অধিবেশনে কমরেড খোকা রায়কে সম্পাদক করে পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক কমিটি গঠিত হয়। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হচ্ছেন মণি সিংহ, নেপাল নাগ, বারীন দত্ত (আব্দুস সালাম), মনসুর হাবিবুল্লাহ, কৃষ্ণবিনোদ রায়, ফণী গুহ, নিরঞ্জন গুপ্ত, আলতাব আলী, সুবীর দত্ত চৌধুরী, বিভূতি গুহ, প্রমথ ভৌমিক, অবণী বাগচী, মুকুল সেন, মারুফ হোসেন, পূর্ণেন্দু দস্তিদার, ইয়াকুব মিঞা, আব্দুল কাদের চৌধুরী, অমূল্য লাহিড়ী।
১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারত বিভক্তির প্রাক্কালে পূর্ব বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিল প্রায় বারো হাজার এবং এর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত। গণসংগঠনসমূহের নেতা-কর্মীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত। দেশ বিভাগের পর লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের সাথে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ও গণসংগঠনের সদস্যরাও সীমান্তের ওপারে ভারতে চলে যান। ফলে পার্টির সদস্য, সমর্থকের সংখ্যা কয়েক শতে নেমে আসে। পার্টি ও গণসংগঠনসমূহের ভিত্তি নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে ছাত্রদের সংগঠন ছাত্র ফেডারেশন, নারীদের সংগঠন মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি, কৃষক সমিতি এবং শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়।
দ্বিতীয় কংগ্রেসের সিদ্ধান্তানুযায়ী কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক কমিটি ঝুটা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের ঘোষণা দেয়। ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক কমিটির সম্পাদকমণ্ডলী আসন্ন ধান কাটার মওসুমে পুনরায় টঙ্ক, নানকার ও তে-ভাগা সংগ্রাম শুরুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ লড়াইয়ে ১৯৪৮ সালের ২৪ এপ্রিল খুলনার শোভনার ধানিবুনিয়ায় সতীশ বাইন, মাদার বাছাড়, রমাকান্ত বাইন তিন কৃষক নেতাকে হত্যা করে পুলিশ। ১৯৪৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোণার লেঙ্গুরা বাজারে পুলিশের গুলিতে ১৯ জন কৃষক নিহত হয়। ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট সিলেটের সানেশ্বর গ্রামে নানকার কৃষকের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে পাঁচ কৃষক নিহত হয়। ১৯৫০ সালের ৫ জানুয়ারি নাচোলের চন্ডীপুরে আধিয়ার পুলিশ সংঘর্ষে পাঁচ পুলিশ নিহত হয়। ১৯৫০ সালে ২৬ মার্চ সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার মহিষখোলার মোহনপুর গ্রামে পুলিশ গুলি করে কৃষকনেতা রবি দামকে হত্যা করে।
অপরদিকে পাকিস্তানি সামন্তবাদী শাসক ও উঠতি পাঞ্জাবী পূঁজিপতিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জাতির সংস্কৃতি ও বাংলা ভাষার ওপর আঘাতের ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গতি পায়। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে মোহম্মদ আলী জিন্নার উর্দুকে রাস্ট্রভাষা করার ঘোষণা ছাত্রদের প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়েই এর যাত্রা। কমিউনিস্টদের সশস্ত্র অভ্যুত্থান, অন্যদিকে বাংলাভাষাকে অন্যতম রাস্ট্রভাষা করার দাবিতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উন্মেষের মুখে পাকিস্তানি শাসক শ্রেণি প্রচণ্ড দমননীতি গ্রহণ করে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষক কর্মীদের হত্যা করা হয়। কমিউনিস্ট পার্টিসহ বিভিন্ন বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক দলের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে কারাবন্দী করা হয়। পাকিস্তান সরকার ১৯৪০ সালের ‘সিকিউরিটি প্রিজনার্স রুলস’ সংশোধন করে ‘ইস্ট বেঙ্গল স্পেশাল পাওয়ার অর্ডিনান্স’ জারি করে রাজবন্দীদের মর্যাদা জেলা শাসকের ইচ্ছানুযায়ী দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় শ্রেণিতে নামিয়ে আনে।
১৯৪৯-৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জেলে আটক রাজবন্দীরা কমিউনিস্ট পার্টির ‘জেল বিপ্লব’ থিসিস ‘স্ট্রম দ্য গেইট’ অনুযায়ী জেলখানাকে সংগ্রামের ফ্রন্ট হিসেবে গ্রহণ করে। এ বিপ্লবের মূল কথা ছিল, যেহেতু পাকিস্তান সৃষ্টি একটি প্রতিবিপ্লবী কার্যক্রমের ফল, এর দ্বারা জনগণের বিন্দুমাত্র উপকার তো হয়ইনি, বরং এর ফলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কবজা আরও শক্তিশালী হয়েছে। জনগণ তাই এর জোয়াল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। কাজেই এটাকে বিপ্লবী পরিস্থিতি বলা চলে এবং এ পরিস্থিতিতে জেল ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে কি বাইরে কি ভেতরে জনতার সক্রিয় সহযোগিতা পাওয়া যাবে।
এর ভিত্তিতে জেলের অভ্যন্তরে বারবার অনশনসহ বিভিন্ন সাংঘর্ষিক আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।
১৯৪৯ সালের ১১ মার্চ থেকে শুরু করে ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট, রংপুরসহ অন্যান্য কারাগারে বারবার অনশন ধর্মঘট হয়। রাজবন্দীরা ঢাকা কারাগারে চারবারে সর্বমোট ১২৭ দিন, রাজশাহী কারাগারে চারবারে সর্বমোট ১৮৫ দিন, সিলেট কারাগারে ২২ দিন, রংপুর কারাগারে ১৫ দিন অনশন ধর্মঘট পালন করে।
অনশন ধর্মঘট ভঙ্গ করার জন্য কারা কর্তৃপক্ষ কমিউনিস্ট রাজবন্দীদের ওপর নির্যাতন পরিচালনা করে। ১৯৪৯ সালের ৯ ডিসেম্বর কারারক্ষীরা হত্যা করে কমরেড শিবেন রায়কে, একই কায়দায় ময়মনসিংহ জেলে হত্যা করা হয় ঢাকা জেলা পার্টির সম্পাদক কমরেড ফণী গুহকে। ১৯৫০ সালে খুলনা জেলে কারারক্ষীরা পিটিয়ে হত্যা করে কমরেড বিষ্ণু বৈরাগীকে। সুশীল দাস বরিশাল জেলে, লুৎফর রহমান, মোজাম মোল্লা যশোর জেলে, হরিসত মন্ডল খুলনা জেলে কারারক্ষীদের অত্যাচারে নিহত হন। সর্ব মোট চল্লিশ জন রাজবন্দীকে জেলাখানায় হত্যা করা হয়।
রাজশাহী কারাগরের সাধারণ কয়েদিরা তাদের ওপর জেল কর্তৃপক্ষের নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট বন্দীদের সহযোগিতায় দাবিদাওয়া সংবলিত একটি স্মারকলিপি দেন কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু জেল কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় ১৯৫০ সালের ৫ এপ্রিল থেকে সাধারণ বন্দীরা অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। সাধারণ বন্দীদের সমর্থনে ৭ এপ্রিল থেকে রাজবন্দীরা অনশন শুরু করেন। খাপড়া ওয়ার্ড ছাড়াও অন্যান্য ওয়ার্ডের রাজবন্দীরা এ অনশনে যোগ দেন।
রাজশাহী কারাগারে এ ব্যাপক অনশনের পরিপ্রেক্ষিতে আইজি প্রিজন আমির হোসেন ঢাকা থেকে রাজশাহী জেলে যান। অনশনের পঞ্চম দিন তিনি বন্দীদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হন। অনশন প্রত্যাহার করেন বন্দীরা। মানুষ দিয়ে ঘানি টানানো বন্ধ হয়। সাধারণ বন্দীরা নিজেদের খরচে ধূমপান করার অধিকার পান।
আইজি প্রিজন আমির হোসেন সাধারণ বন্দীদের আন্দোলনের জন্য দায়ী করেন রাজবন্দীদের। আলোচনাকালে তিনি রাজবন্দী নেতৃবৃন্দকে বলেন, ‘আপনারা ইহার জন্য দায়ী। ইহার ফল আপনাদের ভোগ করিতে হইবে।’ রাজশাহী ত্যাগ করার আগে আমির হোসেন সাহেব জেল সুপার মি. বিলকে রাজবন্দীদের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ছড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে যান। আইজি প্রিজন আমির হোসেনের নির্দেশে সুপার মি. বিল খাপড়া ওয়ার্ড থেকে বন্দী বিভিন্ন ওয়ার্ডে ট্রান্সফারের আদেশ জারি করেন। কিন্তু পার্টির জেল কমিটি সভা করে সিদ্ধান্ত নেয়, ‘কমরেডদের যেতে দেওয়া হবে না।’
২০ এপ্রিল বিকেলে জেল কমিটির নেতা আন্দামান ফেরত রেল শ্রমিকনেতা কমরেড বিজন সেনকে কর্তৃপক্ষ নিয়ে যায়। প্রতিবাদে খাপড়া ওয়ার্ডের বন্দীরা লকআপে যেতে অস্বীকার করলে কর্তৃপক্ষ আপস করতে বাধ্য হয়। পরদিন সকালে কমরেড বিজন সেনকে খাপড়া ওয়ার্ডে ফিরিয়ে আনা হয়।
এ ঘটনার পর জেল কর্তৃপক্ষ আরও দুবার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বন্দীদের প্রতিরোধে তা ব্যর্থ হয়। জেল কমিটির নেতারা মি. বিলকে জানিয়ে দেন ২৪ এপ্রিল ফাইল রেকর্ডের সময় জানানো হবে। ২৩ এপ্রিল সারা রাত খাপড়া ওয়ার্ড বন্দীদের সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয় জেল কমিটির সম্পাদক কমরেড হানিফ শেখের সভাপতিত্বে। ৪১ জন রাজবন্দীর সবাই সভায় উপস্থিত ছিলেন। সভায় আলোচনার সময় কয়েকজন ভিন্নমত পোষণ করলেও সর্বসম্মতক্রমে সিদ্ধান্ত হয় ‘জেল সুপার বিলকে ওয়ার্ডে আটকে রাখা হবে।’
২৪ এপ্রিল সকালে জেল সুপারিনটেনডেন্ট ডাব্লিউ এফ বিলের আগমণ। পেছনে জেলার আব্দুল মান্নান, জেল ডাক্তার, দুজন ডেপুটি জেলার, আরও কয়েকজন কর্মকর্তা। মি. বিল খাপড়া ওয়ার্ডে ঢুকে আব্দুল হকের সামনে এসে ধমকে বলেন, ‘বি রেডি হক, সাম অব আর টু বি সেগরিগেটেড নাউ।’ আব্দুল হক বলেন, ‘জাস্ট সিট ডাউন প্লিজ, উই হ্যাভ টকস্ উইথ ইউ অ্যবাউট দিস ম্যাটার।’ আব্দুল হকের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জেল সুপার বিল ওয়ার্ডের একমাত্র দরজা বন্ধের নির্দেশ দিয়ে সবেগে ওই দরজা দিয়ে বের হতে চাইলেন। আগে থেকে দরজায় দাঁড়ানো ছিলেন পাবনার বাবর আলী, ইশ্বরদীর দেলোয়ার হোসেন ও পটুয়াখালীর রশীদউদ্দীন আবু। তারা ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করতে চাইলে বিল হাতের হান্টার দিয়ে বাবর আলীর হাতে সজোরে আঘাত করে তার কব্জি ভেঙে দেন এবং পদাঘাত করে দরজা খুলে বেরিয়ে যান। বিল বেরিয়েই বাঁশিতে হুইসাল দিলেন। জেলের ভেতর পাগলা ঘণ্টা বেজে উঠল।
আগে থেকে প্রস্তুত রাখা চল্লিশজন সেপাই ডবল মার্চ করে এসে হাজির হয়। তাদের পেছনে ছিল বড় বড় বাঁশ-লাঠি হাতে অবাঙালি কয়েদিদের একটি দল। খাপড়া ওয়ার্ডে ছিল দরজা সমান ২৪টি জানালা। রাইফেল বাহিনী প্রতিটি জানালায় অবস্থান নেয়। হঠাৎ গুলিবর্ষণ শুরু করে।
গুলিতে প্রথম শহীদ হন ইশ্বরদীর রেল শ্রমিকনেতা কমরেড দেলওয়ার, যিনি খাপড়া ওয়ার্ডের একমাত্র দরজা আগলে ছিলেন। দ্বিতীয় শহীদ হন খুলনার ছাত্রনেতা কমরেড আনোয়ার হোসেন। গুলিতে তাঁর মুখের বাঁ দিকটা উড়ে যায়। এর পর গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন জেল পার্টির সম্পাদক কুষ্টিয়ার মোহিনী মিলের শ্রমিকনেতা হানিফ শেখ। একে একে শহীদ হন রংপুরের কমরেড সুধীন ধর, রাজশাহীর আন্দামান ফেরত কমরেড বিজন সেন, ময়মনসিংহের ছাত্রনেতা সুখেন ভট্টাচার্য। পরদিন জেল হাসপাতালে মৃত্যুকোলে ঢলে পড়েন তে-ভাগা আন্দোলনের বিখ্যাত কৃষকনেতা সাঁওতাল কমরেড কম্পরাম সিং।
মারত্মক আহত হন আব্দুল হক, নূরুন্নবী চৌধুরী, মনসুর হাবিবুল্লাহ, শ্যামাপদ সেন, ভুজেন পালিত। পরে নূরুন্নবী চৌধুরীর বাম পা কেটে ফেলতে হয়েছিল। খাপড়া ওয়ার্ডে থাকা ৪১ জন বন্দীর ৭ জন নিহত এবং সকলেই কম-বেশি আহত হয়েছিলেন। গুলিবর্ষণ শেষে অবাঙালি লাঠি বাহিনী খাপড়া ওয়ার্ডে ঢুকে একবার নয়, তিন দফা বেধড়ক লাঠি চার্জ করে। বিল নিজে আব্দুল হককে লাঠিপেটা করেন। এতে বন্দীরা সবাই ভীষণ আহত হন, যে আঘাতের দাগ তাঁরা সারাজীবন বহন করেছেন।
ঘটনার দিন খাপড়া ওয়ার্ডে ছিলেন কম্পরাম সিং, সুধীন ধর, বিজন সেন, হানিফ শেখ, সুখেন্দু ভট্টাচার্য, দিলওয়ার হোসেন এবং আনোয়ার হোসেন। আর আহত হয়েছিলেন কমপক্ষে ৩৪ জন। তাঁরা হচ্ছেন, সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহ, আবদুশ শহীদ, আশু ভরদ্বাজ, সত্যেন সরকার, নুরুন্নবী চৌধুরী, প্রিয়ব্রত দাস (মনজু), অনন্ত দেব, ডাঃ গনেন্দ্রনাথ সরকার, নাসিরউদ্দিন আহমেদ, আবদুল হক, আমিনুল ইসলাম বাদশা, শচীন্দ্র চক্রবর্তী, সাইমন মন্ডল, কালীপদ সরকার, অনিমেষ ভট্টাচার্য, বাবর আলী, প্রসাদ রায়, গারিসউল্লাহ সরদার, ভুজেন পালিত, ফটিক রায়, সীতাংশু মৈত্র, সদানন্দ ঘোষ দস্তিদার, ডোমারাম সিংহ, সত্যরঞ্জন ভট্টাচার্য, লালু পান্ডে, মধাব দত্ত, খবীর শেখ, আভরন সিংহ, সুধীর স্যান্নাল, শ্যামাপদ সেন, পরিতোষ দাসগুপ্ত, হীরেন সেন এবং রশিদউদ্দিন আবু ।
খাপড়া ওয়ার্ডের লড়াকু যোদ্ধারা ছিলেন পার্টির নির্দেশের প্রতি অনুগত। তাঁরা কারাগারের বাইরে সমর্পিত ছিলেন মেহনতি জনগণের মুক্তি আন্দোলনে। জেলের ভেতরেও তারা সোচ্চার ছিলেন অধিকার ও আত্মমর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে। খাপড়া ওয়ার্ড শহীদরা নিঃশঙ্ক চিত্তে অসম লড়াই করে জীবন দিয়ে তাঁরা সমুন্নত রেখেছেন তাঁদের বিপ্লবী জীবনাদর্শকে।



