প্রচণ্ড গরমে এমনিতে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ। এর মাঝে আবার খবরের চাপ। তা নিয়ে নানা গুঞ্জন, গবেষণা। ফলে দম ফেলার ফুরসতও পাননি অনেকে। ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি গত রোববার হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হলেন। তাঁর সাথে ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আব্দুল্লাহিয়ান। কেউই রক্ষা পাননি। এটা হয়তো নিতান্ত একটি দুর্ঘটনা। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে গাজায় ইসরায়েলের অভিযানকে ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে কেউই এটাকে সাধারণ ঘটনা বলে ধরে নিতে পারেনি। যদিও ইরান এ ঘটনার জন্য এখন পর্যন্ত কাউকে দোষারোপ করেনি।
গত সোমবার বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের আমেরিকায় ঢোকার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সে দেশের সরকার। এ বিষয়ে দেওয়া এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, আজিজ আহমেদ তাঁর ভাইকে বাংলাদেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি এড়াতে সহযোগিতা করেছেন। এটা করতে গিয়ে তিনি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন। এ ছাড়া অন্যায্যভাবে সামরিক খাতে ‘কন্ট্রাক্ট’ পাওয়া নিশ্চিত করার জন্য জেনারেল (অব.) আজিজ তাঁর ভাইয়ের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। তিনি নিজের স্বার্থের জন্য সরকারি নিয়োগের বিনিময়ে ঘুষ নিয়েছেন। তবে আজিজ অবশ্য সব দোষ অস্বীকার করেছেন।
বুধবার ছিল বুদ্ধ পূর্ণিমা, সরকারি ছুটি। ওই দিন সকাল সকাল খবর এল ঝিনাহদহ-৪ আসনের আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম কলকাতায় খুন হয়েছেন। যদিও আগে থেকেই তাঁর নিখোঁজ হওয়ার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হচ্ছিল। ওই দিন প্রথমে তাঁর লাশ উদ্ধারের কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত তা খুঁজে পাওয়া যায়নি। বলা হচ্ছে, খুন করার পর লাশ টুকরো টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়া হয়েছে, যাতে কখনোই তা খুঁজে না পাওয়া যায়। ঠিক যেন সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগির খুন হওয়ার ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। সোনা চোরাচালান নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে তিনি খুন হন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের পুলিশ ও গোয়েন্দারা এ ঘটনাটি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। সত্য বেরিয়ে আসুক, এটাই কাম্য।
এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার পুলিশের সাবেক প্রধান (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ৮৩টি দলিল জব্দ করার এবং ৩৩টি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার একটি আদালত এই নির্দেশ দেন। এর আগে বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিপুল বিত্তের কাহিনি তুলে ধরে দৈনিক কালের কণ্ঠ। পরে নিজের ফেসবুক পেজে এক ভিডিও বার্তায় এসব অভিযোগের জবাব দেন পুলিশের সাবেক প্রধান। কিন্তু রাষ্ট্রকে তিনি এতটুকুও আশ্বস্ত করতে পারেননি যে, স্থারব-অস্থাবর সম্পদ তিনি সরাবেন না। যে কারণে রাষ্ট্র এই সাবেক কর্মকর্তার সব সম্পদ আটকে দিয়েছে।
জেনারেল (অব.) আজিজের বিরুদ্ধে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা ও পুলিশের সাবেক প্রধান বেনজীর আহমেদের সম্পদ জব্দের ঘটনা কোনো ছোটখাটো বিষয় নয়। তাঁরা ছাড়াও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা এই বেড়াজালে আটকে গেছেন। আর এই দুজন একসময় এ দেশের সেনাবাহিনী ও পুলিশবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশে এই দুই বাহিনীর গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আসলেই কয়েক দিনের ব্যবধানে ঘটনা দুটি ঘটলেও কোথায় যেন একটা মিল আছে। আর সে মিল হলো, দায়িত্বশীল পদে থেকে এমন কিছু না করা, যাতে চাকরিজীবন শেষ হলে ফাঁসে আটকাতে হয়। রাজনীতির জগতে একটা কথা খুব প্রচলিত—রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় থাকা আর না থাকার মধ্যে আসমান-জমিন পার্থক্য। একই পার্থক্য পদে থাকা ও অবসরে যাওয়া সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেও। আজিজ ও বেনজীর দুজনই সেটা বুঝতে পারছেন আশা করি।
পান থেকে চুন খসলেই রাজনীতিকদের কাঠগড়ায় তোলা আমাদের চিরায়ত অভ্যাস। আমরা ধরেই নিই, রাজনীতিকেরা সব ধরনের অপরাধ করতেই পারেন। ফলে অভিযোগের তপ্ত কড়াইয়ে তাঁরা ভাজাভাজা হয়ে যান কোনো কিছু প্রমাণের আগেই। সেদিক দিয়ে সরকারি কর্মকর্তারা অনেক সৌভাগ্যবান। কর্মরত অবস্থায় তাঁদের টিকিটি ছোঁয়া খুবই কঠিন, প্রায় অসম্ভব। আর যিনি যত উঁচুতে, তাঁকে ধরা তত কঠিন। কিন্তু অবসর জীবনের কথা ভেবে কাজ না করলে পরে পস্তাতে হতে পারে।
আজিজ বা বেনজীরের চেয়ে অনেক বেশি দুর্ভাগা বলতেই হয় সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীমকে। বলা হচ্ছে, তিনি সোনা চোরাচালান সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত। বিমানবন্দর থেকে নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে সোনা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল আজীম বা তাঁর লোকজনের। অভিযোগ এ পর্যন্তই। কিন্তু তাতেই তাঁর নিষ্প্রাণ দেহের সামান্য অবশেষ এখনো খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি। পাওয়া যে যাবে—এমনটা আশা করাও এই মুহূর্তে কঠিন। এই পরিস্থিতিতে একবার ভাবুন তো, আজীমের কন্যা ও অন্যান্যদের মানসিক অবস্থার কথা।
এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার ১৪ দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মিয়ানমার নিয়ে পূর্ব তিমুরের আদলে একটি খ্রিষ্টান রাষ্ট্র তৈরির চক্রান্ত চলছে। এই চক্রান্তের অংশ বঙ্গোপসাগরে ঘাঁটি বানানো। প্রধানমন্ত্রীর এই অভিযোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গত বেশ কয়েক মাস ধরে আমাদের সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের ঘটনাবলি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন গোষ্ঠীর তৎপরতা প্রধানমন্ত্রীর এই অভিযোগকে মান্যতা দেয়। একই সাথে মনে করিয়ে দেয়, সবকিছুই যেন কেমন কাকতালীয়ভাবে একই সময়ে ঘটে চলেছে। তাই সাবধান হওয়াটা খুবই জরুরি।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]
আরও পড়ুন:
- ভারতে গিয়ে ৪ দিন ধরে ‘খোঁজ নেই’ এমপি আনারের
- নিখোঁজ এমপি আনার, ৬ দিনেও সুস্পষ্ট তথ্য নেই সরকারের কাছে
- এমপি আনোয়ারুল আজীমের মরদেহ পাওয়া গেল কলকাতায়
- নিখোঁজ হাওয়া থেকে মরদেহ উদ্ধার, এমপি আজীমকে নিয়ে যা ঘটল
- কলকাতায় এমপি আজীমের মরদেহ উদ্ধার: যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি
- এমপি আজীমকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী


মার্কিন নিষেধাজ্ঞা: যা বললেন সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ
সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীরের সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ
কুৎসার কিসসা আভি ভি বাকি হ্যায়: বেনজির
ব্যবসায়িক ক্ষোভ থেকেই এমপি আজীম হত্যা: ডিবি 
