গণভোট: কী, কেন, কীভাবে? ঐকমত্য এলেও দ্বিমত আছে যেখানে

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৫, ১২:৩০ এএম

জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ গত রোববার জানালেন, জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটের ব্যাপারে সব দল একমত হয়েছে। অর্থাৎ, ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে জনগণ রায় দেবে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপারে তাদের সম্মতি আছে কি নেই।

কিন্তু গণভোট হওয়ার ব্যাপারে একমত হলেও, গণভোটটা কীভাবে হবে, সে নিয়ে দলগুলোর মধ্যে মতের পার্থক্য থেকেই যাচ্ছে। কোনো দল চাইছে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের দিনেই একসঙ্গে আলাদা ব্যালটে গণভোট হোক, কারও চাওয়া গণভোট আগে হোক। কেউ চায় জুলাই সনদে যে বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আছে সেগুলো সেভাবেই থাকুক, কারও চাওয়া এসব আপত্তি অগ্রাহ্য করেই ঘোষিত হোক জুলাই সনদ।

আগামী ১৫ অক্টোবর ঐক্যমত্য কমিশনের মেয়াদ শেষ, তার আগেই এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত এসে যাওয়ার কথা। এ ক’দিনে তাই আরও অনেক বিষয়ই সামনে আসবে। তার আগে, গণভোট কী, কীভাবে হয়; বাংলাদেশে গণভোটের ইতিহাসে একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।

গণভোট– এর আগে কতবার?

একটা প্রশ্ন থাকবে, উত্তরে দুটি বিকল্প — ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’। যেকোনও একটিতে দাগিয়ে ব্যালটটি পূরণ করতে হবে। হয়ে গেল ভোট! জাতীয় কোনো ইস্যুতে জনগণের মতামত জানাতে এ ধরনের গণভোটের উদাহরণ অনেক দেশেই আছে। বাংলাদেশের ইতিহাসেও এর আগে তিনবার হয়েছে গণভোট।

আগের তিন গণভোট

দুটি প্রশাসনিক আর একটি সাংবিধানিক — এই হলো বাংলাদেশের তিন গণভোটের ধরন। তিনটি গণভোটই হয়েছে ১৯৭৭ থেকে ১৯৯১, এই ১৫ বছরের মধ্যে।

প্রশাসনিক দুই গণভোট হয়েছে দুই সামরিক শাসকের আমলে। ১৯৭৭ সালের ৩০ মে গণভোট ছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঘোষিত নীতি ও কর্মসূচিতে জনগণ আস্থা রাখেন কি না, সেই প্রশ্নে। এতে ভোট পড়েছিল প্রায় ৮৮ শতাংশ, তার মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল ৯৮ দশমিক ৮০ শতাংশ।

১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ আয়োজিত গণভোটের উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থার চিত্র প্রদর্শন। সেখানে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৭২ শতাংশ; ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল ৯৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।

সাংবিধানিক গণভোটটি হয়েছে ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। মূলত রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা থেকে প্রধানমন্ত্রী শাসিত ব্যবস্থায় যাওয়ার ব্যাপারে জনরায় জানাতে আয়োজিত ওই গণভোটে প্রশ্ন ছিল, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান (দ্বাদশ সংশোধনী) বিল, ১৯৯১-এ রাষ্ট্রপতির সম্মতি দেওয়া উচিত কি না?’ ৮৪ শতাংশ ভোটার এতে অংশ নেন, যার মধ্যে ৮৮ দশমিক ৫ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন।

অবশ্য এই গণভোটের আগেই সংসদে সংবিধান সংশোধন বিল (দ্বাদশ সংশোধনী) পাশ হয়ে গেছে; তখন রাষ্ট্রপতির অনুমোদন বাকি ছিল।

এবার গণভোটে দলগুলোর দ্বিমত যেখানে

আপাতত ঐক্যমত্য এতটুকুই যে, গণভোট আয়োজনে সম্মত হয়েছে দলগুলো। কিন্তু এই আয়োজন ঘিরে প্রশ্ন অনেকই রয়েছে।

প্রথমত, আয়োজনের দিন-তারিখ নিয়ে মতবিরোধ। বিএনপি বলছে, ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন যেদিন হবে, সেদিনই আলাদা ব্যালটে গণভোটও হোক। অর্থাৎ একজন ভোটার ভোটকেন্দ্রে গিয়ে জাতীয় নির্বাচনের ভোট দেবেন এক ব্যালটে, আরেক ব্যালটে দেবেন গণভোটের রায় — এতে খরচ ও আয়োজনের ঝক্কি কমবে বলে তাদের যুক্তি। তাছাড়া জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের দাবি মূলত জাতীয় নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা তৈরি করার কুপ্রচেষ্টার অংশ বলে দলটি মনে করে। এনসিপি শেষমেশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছে। কিন্তু জামায়াত এখন পর্যন্ত দাবি করেছে, গণভোট হতে হবে জাতীয় নির্বাচনের আগে।

দ্বিতীয়ত, দলগুলোর মধ্যে বড় দ্বিমত রয়েছে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ প্রশ্নে। পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন, প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে না থাকা, রাষ্ট্রপতিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া, প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত কমিটির মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশনে নিয়োগসহ নয়টি সিদ্ধান্তে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। সবচেয়ে বড় ও নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকা দল হওয়ায় তাদের পক্ষ থেকে আপত্তি বেশি আসার কথা মনে করেন অনেকে। কিন্তু যে ইস্যুগুলোতে নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে — তা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে।

জামায়াত ও এনসিপির দাবি, নোট অব ডিসেন্ট দেওয়ার সময় জুলাই সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি হিসেবে গণভোট আলোচনায় ছিল না; এখন যেহেতু গণভোটের সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাই কোন দল কী নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, তা আর বিবেচ্য নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তাদের যুক্তি। তবে বিএনপির যুক্তি — গণভোট হবে সনদের ওপর; সেই সনদে লেখা থাকবে কোন দলের কোন বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। জনগণ তা জেনে আগামী সংসদকে সনদ বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেবে। যে দল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, তাদের এখতিয়ার থাকবে নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী সংস্কার আনার।

আরও যা-যা প্রশ্ন উঠছে

গণভোটের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন আছে। শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে পুরো জুলাই সনদের ব্যাপারে রায় জানতে চাওয়া সমীচীন কী না, এ নিয়ে সংশয় আছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক সম্প্রতি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘গণভোট অনেক ধরনের হয়। জুলাই সনদ যদি পাঁচ পাতার হয় এবং সেটাতে কতগুলো ধারা থাকে — পাঁচ পাতার মধ্যে চার পাতার সঙ্গে আপনি একমত, আরেক পাতার সঙ্গে একমত নন, সেক্ষেত্রে পড়ে আপনি হ্যাঁ-না সিদ্ধান্ত কীভাবে নেবেন?’

এর বাইরে আছে গণভোটের সাংবিধানিক জটিলতা। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে গণভোটের বিধান বাতিল করা হয়। তবে গত বছর পঞ্চদশ সংশোধনীকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দায়ের করা রিট পিটিশনের প্রেক্ষিতে ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট একটি রায় দেয়, সেখানে ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনরায় বহাল রাখার কথা বলা হয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. রুহুল কুদ্দুস সম্প্রতি একটি কলামে লিখেছেন — যদি হাইকোর্টের এই রায়কে তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর ধরে নেওয়া হয়, তাহলে ১৪২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত সেই গণভোট অনুষ্ঠান আইনসিদ্ধ হতে পারে। প্রশ্ন হল, হাইকোর্টের রায়ের পর ১৪২ অনুচ্ছেদ কি সরাসরি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে, নাকি আদালতের রায়ের আলোকে সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন পড়বে?

তবে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, গণভোটের জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, রেফারেন্ডামের (গণভোট) যে অনুচ্ছেদ ১৪২ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার উড়িয়ে দিয়েছিল, সেটা হাইকোর্টের রায়ের মাধ্যমে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন সংবিধানে গণভোট সংক্রান্ত অন্য কোনো বিধান থাকায় বাধা নেই। সুতরাং একটি অর্ডিন্যান্স জারি করে নির্বাচন কমিশনকে একই দিনে সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি আলাদা ব্যালটে রেফারেন্ডাম (গণভোট) আয়োজনের এখতিয়ার দেওয়া যেতে পারে — এই মত তিনি দিয়েছেন।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশটির তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। আর এই ক্ষোভ থেকেই জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি।...
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর থেকেই সংরক্ষিত নারী আসন ছিল আলোচনায়। বিশেষ করে বিএনপি জোট থেকে কারা সংসদে যাচ্ছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ছিল নানা...
ইরান যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি পড়ছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে, যেখানে আমদানিনির্ভরতার কারণে সংকটের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালীর অনিশ্চয়তায় তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশের...
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন কি বিদায় নিচ্ছেন? তিনি বিদায় নিলে নতুন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন?...
রাজধানী সদরঘাটের শ্যামবাজার ঘাটে সুন্দরবন-১২ লঞ্চের ধাক্কায় একটি ট্রলার ডুবে গেছে। এতে দুজন নিখোঁজ হয়েছেন। আজ রোববার সকালে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
রাজধানীর রমনা থানাধীন কাকরাইল মোড় প্রধান বিচারপতির বাসভবন সংলগ্ন এলাকায় দ্রুতগামী একটি কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় মো. সিরাজুল ইসলাম (৭৫) নামের এক বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন।
রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। 
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় মাদক কারবারে জড়িত এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর তাঁকে ছাড়িয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের দাবি, ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর স্বজন ও স্থানীয়দের একাংশ ‘মব’ বা মারমুখী...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর