নতুন বছরের শুরু হতে এক সপ্তাহও পেরোয়নি, এর মধ্যেই পাকিস্তানের বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জহির আহমেদ বাবর সিধুর সঙ্গে বাংলাদেশের এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের বৈঠকের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঘোষণা দেয়, তাদের নিজস্ব উৎপাদিত জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিক্রির একটি চুক্তি খুব শিগগিরই হতে পারে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণমাধ্যম শাখা ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে জানায়, হাসান মাহমুদ খান যুদ্ধক্ষেত্রে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর দক্ষতার প্রশংসা করেন এবং বাংলাদেশের আকাশে নজরদারির সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ‘পুরোনো হয়ে যাওয়া বিমানবহরকে শক্তিশালী করা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার ব্যবস্থাকে’ উন্নত করতে সহায়তা চান।
৬ জানুয়ারি প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সুপার মুশশাক প্রশিক্ষণ বিমান দ্রুত সরবরাহের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি ‘জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান সংগ্রহের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।’
সুপার মুশশাক একটি হালকা ওজনের, দুই থেকে তিন আসনের, এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট বিমান, যার ল্যান্ডিং গিয়ার স্থির এবং তিন চাকার। এই বিমানটি মূলত প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়। পাকিস্তানের বাইরে বর্তমানে আজারবাইজান, তুরস্ক, ইরান, ইরাকসহ ১০টির বেশি দেশ পাইলট প্রশিক্ষণের জন্য তাদের বহরে এই বিমান রেখেছে।
এর ঠিক এক দিন পর বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, পাকিস্তান ও সৌদি আরব প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সৌদি ঋণকে জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান নিয়ে চুক্তিতে রূপান্তর করার বিষয়ে আলোচনা করছে, যা দুই পুরোনো মিত্র দেশের সামরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করবে। প্রসঙ্গত, গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও সৌদি আরব পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
এর আগে ডিসেম্বরের শেষ দিকে খবর আসে, লিবিয়ার একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী, যারা নিজেদের ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (এলএনএ)’ বলে দাবি করে, তাদের বাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তান ৪০০ কোটি ডলারের একটি চুক্তি করেছে, যেখানে এক ডজনের বেশি জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিক্রির কথাও হয়েছে।
যদিও পাকিস্তান সেনাবাহিনী এখনো লিবিয়া বা সৌদি আরবের সঙ্গে কোনো চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি, এদিকে বাংলাদেশও এখন পর্যন্ত চুক্তি না করে শুধু ‘আগ্রহ’ প্রকাশ করেছে, তবে বিশ্লেষকদের মতে ২০২৫ সালের ঘটনাপ্রবাহ জেএফ–১৭-এর ব্যাপারে আগ্রহ অনেক বাড়িয়েছে।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিমানটির তুলনামূলক কম দাম (প্রতি ইউনিট আনুমানিক ২ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৩ কোটি ডলার) গত ১০ বছরে বহু দেশকে এই বিমানটির ব্যাপারে আগ্রহী করেছে। নাইজেরিয়া, মিয়ানমার ও আজারবাইজান ইতিমধ্যে তাদের বহরে এই বিমান যুক্ত করেছে। এছাড়া সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আকাশপথে যুদ্ধের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সক্ষমতার সুনামও বাড়িয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
গত মে মাসে ভারত ও পাকিস্তান আকাশপথে চার দিনের তীব্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ভারত-শাসিত কাশ্মীরে বন্দুকধারীদের গুলিতে ২৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার পর দুই দেশ একে অপরের ভূখণ্ড, নিজেদের নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের অংশ এবং সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। ২৬ নাগরিক হত্যাকাণ্ডের ওই ঘটনার জন্য ভারত পাকিস্তানকে দায়ী করে, তবে পাকিস্তান এই ঘটনার সঙ্গে নিজেদের কোনো সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে।
তা এরপরের আকাশপথের যুদ্ধ নিয়ে পাকিস্তান দাবি করে, ওই যুদ্ধে তারা ভারতের একাধিক যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। শুরুতে ভারত এই দাবি অস্বীকার করলেও পরে ভারতীয় কর্মকর্তারা স্বীকার করেন যে কিছু বিমান হারিয়েছে, তবে কতগুলো বিমান ভূপাতিত হয়েছে তা স্পষ্ট করেননি।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সাবেক এয়ার কমোডর আদিল সুলতান বলেন, ‘পাকিস্তান বিমানবাহিনী অনেক বেশি দামি পশ্চিমা ও রুশ প্রযুক্তির বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে, যা এই বিমানকে অনেক দেশের বিমানবাহিনীর কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।’
ভারতীয় বিমানবাহিনী ঐতিহ্যগতভাবে রাশিয়ার মিরাজ-২০০০ ও সু-৩০ যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভরশীল। তবে ২০২৫ সালের সংঘাতে তারা ফ্রান্সের রাফাল যুদ্ধবিমানও ব্যবহার করেছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান সম্প্রতি আমদানি করা চীনা জে–১০সি ‘ভিগোরাস ড্রাগন’, জেএফ–১৭ থান্ডার এবং যুক্তরাষ্ট্রের এফ–১৬ ফাইটিং ফ্যালকন যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভর করে। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ৪২টি পাকিস্তানি বিমান একসঙ্গে ভারতের ৭২টি যুদ্ধবিমানের মোকাবিলা করে।
তা এই জেএফ–১৭ থান্ডার আসলে কী, এটি কী করতে পারে, আর কেন এত দেশ এতে আগ্রহ দেখাচ্ছে?
জেএফ–১৭ থান্ডার কী?
জেএফ–১৭ থান্ডার একটি হালকা ওজনের, সব আবহাওয়ায় ব্যবহারযোগ্য, মাল্টি-রোল (আকাশ থেকে আকাশ ও ভূমিতে আঘাত হানার ক্ষমতাসম্পন্ন) যুদ্ধবিমান। এটি যৌথভাবে তৈরি করেছে পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স (পিএসি) এবং চীনের চেংদু এয়ারক্রাফট করপোরেশন (সিএসি)।
১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে পাকিস্তান ও চীন এই বিমান উন্নয়নের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। ২০০০ সালের শুরুর দিকে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের কামরায় অবস্থিত পিএসিতে এই যুদ্ধবিমান তৈরির কাজ শুরু হয়, এই অঞ্চলটির পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরে।
এই প্রকল্পে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা পাকিস্তান বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এক এয়ার কমোডর বলেন, উৎপাদনের ৫৮ শতাংশ হয় পাকিস্তানে এবং ৪২ শতাংশ হয় চীনে। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তিনি আল জাজিরার প্রতিবেদনে নাম প্রকাশ করতে চাননি। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা বিমানের সামনের অংশ (ফ্রন্ট ফুসেলাজ) ও উল্লম্ব লেজ (ভার্টিক্যাল টেইল) তৈরি করি। চীন তৈরি করে মাঝের ও পেছনের অংশ (মিডিল অ্যান্ড রিয়ার ফুসেলাজ)। বিমানে রাশিয়ার ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয় এবং ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান মার্টিন–বেকারের আসন বসানো হয়। তবে পুরো বিমানটির চূড়ান্ত সংযোজন (অ্যাসেম্বলিং) পাকিস্তানেই করা হয়।’
তিনি জানান, ২০০৭ সালের মার্চে প্রথমবারের মতো এই বিমান জনসমক্ষে প্রদর্শন করা হয়। ২০০৯ সালে এর প্রথম সংস্করণ ব্লক–১ বিমানবাহিনীতে যুক্ত হয়। সবচেয়ে আধুনিক ব্লক–৩ সংস্করণটি ২০২০ সালে কার্যক্রমে আসে।
তিনি বলেন, ‘মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের পুরোনো যুদ্ধবিমান বহরকে বদলে দেওয়া। পরবর্তী এক দশকের মধ্যে এই বিমানই আমাদের বিমানবাহিনীর মূল শক্তি হয়ে ওঠে। এখন আমাদের বহরে ১৫০টির বেশি এই যুদ্ধবিমান রয়েছে।’
জেএফ–১৭ আসার আগে পাকিস্তান প্রধানত ফ্রান্সের ডাসো নির্মিত মিরাজ–৩ ও মিরাজ–৫ এবং চীনের জে–৭ যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
ব্লক–৩ সংস্করণের মাধ্যমে জেএফ–১৭ তথাকথিত ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের কাতারে উঠে এসেছে। এই বিমান আকাশ থেকে আকাশে এবং আকাশ থেকে ভূমিতে আক্রমণ চালাতে পারে। এতে রয়েছে উন্নত অ্যাভিওনিক্স, অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে (এআইএসএ) রাডার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম এবং চোখের দৃষ্টিসীমার বাইরে আঘাত হানার ক্ষেপণাস্ত্র (বিভিআর) ছোড়ার সক্ষমতা।
এর অ্যাভিওনিক্স ও ইলেকট্রনিক সক্ষমতা চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান—যেমন এফ–১৬ ও সু–২৭—থেকে উন্নত। চতুর্থ প্রজন্মের বিমানগুলো তৈরি করা হয়েছিল মূলত গতি ও আকাশে সম্মুখসমরের (ডগফাইট) জন্য। এআইএসএ রাডার একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্য শনাক্ত করতে পারে এবং অনেক দূর থেকে বেশি স্পষ্টভাবে নজরদারি করতে সাহায্য করে। তবে পঞ্চম প্রজন্মের বিমানের মতো এতে স্টেলথ বা রাডারে অদৃশ্য থাকার ক্ষমতা নেই।
পাকিস্তান বিমানবাহিনী বলছে, মাঝারি ও নিচু উচ্চতায় এই বিমান অত্যন্ত কৌশলী। ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া, দ্রুত দিক বদল করা ও টিকে থাকার ক্ষমতাগুলো মিলিয়ে এটি ‘যেকোনো বিমানবাহিনীর জন্য শক্তিশালী একটি প্ল্যাটফর্ম’ বলে জানাচ্ছে পাকিস্তান বিমানবাহিনী।
কারা জেএফ–১৭ কিনেছে?
জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান কেনা প্রথম দেশ হলো মিয়ানমার। ২০১৫ সালে দেশটি ব্লক–২ সংস্করণের অন্তত ১৬টি বিমান অর্ডার দেয়। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত সাতটি বিমান সরবরাহ করা হয়েছে।
নাইজেরিয়া দ্বিতীয় ক্রেতা হিসেবে ২০২১ সালে তাদের বিমানবাহিনীতে তিনটি জেএফ–১৭ যুক্ত করে।
এরপর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আজারবাইজান প্রাথমিকভাবে ১৬টি যুদ্ধবিমান কেনার অর্ডার দেয়, যার মূল্য ছিল ১৫০ কোটি ডলারের বেশি। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে আজারবাইজান তাদের বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে পাঁচটি জেএফ–১৭ প্রদর্শন করে। এর মাধ্যমে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে এই যুদ্ধবিমানের তৃতীয় বিদেশি ব্যবহারকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ওই একই মাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনী জানায়, তারা একটি ‘বন্ধু দেশের’ সঙ্গে জেএফ–১৭ সংগ্রহের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে। তবে ওই দেশের নাম প্রকাশ করা হয়নি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এটিকে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি’ হিসেবে উল্লেখ করে।
গত এক দশকে ইরাক, শ্রীলঙ্কা ও সৌদি আরবসহ আরও কয়েকটি দেশ জেএফ–১৭ কেনার বিষয়টি বিবেচনা করলেও সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীর (পিএএফ) যুদ্ধবিমান বহরের বড় অংশ জুড়েই আছে জেএফ–১৭। তবে এই বিমান চীনের বিমানবাহিনী ব্যবহার করে না। চীনা বিমানবাহিনী মূলত জে–১০, জে–২০ এবং এখনো উন্নয়নাধীন তাদের সর্বাধুনিক জে–৩৫ যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভরশীল।
যেহেতু জেএফ–১৭-এর পুরো সংযোজন কাজ পাকিস্তানের কামরা অঞ্চলে করা হয়, তাই বিক্রয় ও বিক্রয়োত্তর সেবাসহ এই যুদ্ধবিমানের প্রধান বিক্রেতা হলো পাকিস্তান।
অন্যান্য যুদ্ধবিমানের সঙ্গে তুলনায় জেএফ–১৭ এগিয়ে না পিছিয়ে?
বর্তমানে বিশ্বে ব্যবহৃত সবচেয়ে উন্নত যুদ্ধবিমানগুলো হলো পঞ্চম প্রজন্মের বিমান। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এফ–২২ ও এফ–৩৫, চীনের জে–২০ ও জে–৩৫ এবং রাশিয়ার সু–৫৭। এই বিমানগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো স্টেলথ বা প্রতিপক্ষের রাডারকে ফাঁকি দেওয়ার প্রযুক্তি — যা আগের কোনো প্রজন্মের বিমানে ছিল না।
এর বিপরীতে, জেএফ–১৭-এর ব্লক–৩ সংস্করণটি ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের অন্তর্ভুক্ত। এই শ্রেণির অন্য বিমানগুলোর সুইডেনের গ্রিপেন, ফ্রান্সের রাফাল, ইউরোফাইটার টাইফুন, ভারতের তেজাস এবং চীনের জে–১০ উল্লেখযোগ্য।
যদিও ৪.৫ প্রজন্মের বিমানগুলো স্টেলথ নয়, তবে এগুলোর গায়ে বিশেষ ধরনের প্রলেপ থাকে, যা রাডারে ধরা পড়ার মাত্রা কমিয়ে দেয়। ফলে এগুলো শনাক্ত করা একেবারে অসম্ভব না হলেও একেবারে সহজও নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান শত্রুর রাডার এলাকায় প্রবেশ করলে সেটি রাডারে ধরা পড়তে পারে। তবে বিমানটি যদি তার ইলেকট্রনিক জ্যামিং সক্ষমতা ব্যবহার করে, সেক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের রাডারের সংকেত ব্যাহত হতে পারে। এ ছাড়া ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানগুলো দূর থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনে ফিরে আসার ক্ষমতাও রাখে।
অন্যদিকে, পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান শারীরিক নকশা ও ভেতরে বহন করা অস্ত্রের ধরনের কারণে প্রতিপক্ষের রাডারে প্রায় সম্পূর্ণ অদৃশ্য অবস্থায় থাকে।
যদিও জেএফ–১৭-এর আনুষ্ঠানিক দাম প্রকাশ করা হয়নি, তবে ধারণা করা হয় প্রতিটি বিমানের দাম ২ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৩ কোটি ডলারের মধ্যে। তুলনার স্বার্থে বলা যায়, একটি রাফাল যুদ্ধবিমানের দাম ৯ কোটি ডলারের বেশি। আর গ্রিপেনের দাম ১০ কোটি ডলারেরও বেশি।
ইসলামাবাদভিত্তিক এক আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক, যিনি জেএফ–১৭ প্রকল্পের অগ্রগতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, তিনি বলেন, এই যুদ্ধবিমানের মূল আকর্ষণ এর সাশ্রয়ী মূল্য, রক্ষণাবেক্ষণে কম খরচ এবং যুদ্ধক্ষেত্রের রেকর্ড। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘জেএফ–১৭-এর প্রতি আগ্রহের কারণ শুধু এর চোখে পড়ার মতো পারফরম্যান্স নয়, বরং এই বিমানের পুরো প্যাকেজ। এর মধ্যে রয়েছে কম দাম, বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র সংযুক্ত করার সুবিধা, প্রশিক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং সাধারণত পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় কম রাজনৈতিক শর্ত।’ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তিনি আল জাজিরাকে তাঁর নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান।
তিনি আরও বলেন, ‘এ দিক থেকে ভাবলে জেএফ–১৭ একটি “যথেষ্ট ভালো” মাল্টি-রোল যুদ্ধবিমান, যা সহজলভ্যতার কথা মাথায় রেখে তৈরি। স্বল্প বাজেটে আধুনিকায়ন করতে চাওয়া বিমানবাহিনীর জন্য এটি উপযোগী। তবে কত দূরে আঘাত হানতে পারে, একবারে কত অস্ত্র বহন করতে পারে, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভাবনার দিক মিলিয়ে হিসেব করলে এটি জে–১০সি বা এফ–১৬ভির মতো উচ্চমানের যুদ্ধবিমানের সরাসরি বিকল্প নয়।’
ইসলামাবাদের এয়ার ইউনিভার্সিটির অ্যারোস্পেস ও স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ অনুষদের ডিন এবং সাবেক এয়ার কমোডর আদিল সুলতান বলেন, ২০২৫ সালে ভারতীয় যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে জেএফ–১৭-এর পারফরম্যান্স এর সক্ষমতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আকাশযুদ্ধে ফলাফল শুধু বিমানের ওপর নির্ভর করে না। কে সেই বিমান চালাচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিমানের সঙ্গে ভূমি ও আকাশভিত্তিক রাডার, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত মানবিক দক্ষতার সমন্বয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।’
জেএফ–১৭ নিয়ে আগ্রহ কেন বাড়ছে?
২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে চার দিনের সংঘাতের সময় পাকিস্তান বিমানবাহিনী আবারও আলোচনায় আসে। বিশেষ করে ৭ মে রাতে, যখন ভারতীয় বিমান পাকিস্তানের ভেতরে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীর দাবি অনুযায়ী, চীনে তৈরি জে–১০সি যুদ্ধবিমান নিয়ে আকাশে যুদ্ধে যাওয়া পাকিস্তানি স্কোয়াড্রন অন্তত ছয়টি ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করে। শুরুতে ভারতীয় কর্মকর্তারা এই দাবি অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করেন যে তাঁদের ‘কিছু’ বিমান হারিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি করানোর কৃতিত্ব নিজের বলে দাবি করেছেন, তিনি বারবার পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানের পারফরম্যান্সের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে ভারত এই দাবি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
যদিও জেএফ–১৭ সরাসরি ওই ভূপাতিত করার ঘটনায় জড়িত ছিল না, তবে পাকিস্তান বিমানবাহিনী বলছে, ভারতীয় বিমানের সঙ্গে সংঘাতে অংশ নেওয়া বহরের মধ্যে জেএফ–১৭ ছিল।
এর তিন দিন পর, ১০ মে, আইএসপিআর দাবি করে — একটি জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ভারতের ব্যবহৃত রাশিয়ায় তৈরি এস–৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত হানা হয়েছে। ভারত এই দাবিও অস্বীকার করে এবং জানায়, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কোনো ক্ষতি হয়নি।
ইসলামাবাদভিত্তিক ওই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, মে মাসের সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান জেএফ–১৭-কে যুদ্ধপরীক্ষিত ও সাশ্রয়ী একটি বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে — বিশেষ করে সীমিত প্রতিরক্ষা বাজেট থাকা দেশগুলোর জন্য।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘সম্ভাব্য সংগ্রহ’ বিষয়ক ঘোষণাকে সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত। তিনি বলেন, ‘আগ্রহ প্রকাশ আর চূড়ান্ত চুক্তির মধ্যে অনেক তফাৎ আছে। যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া সাধারণত অনুসন্ধানী আলোচনা থেকে চুক্তি স্বাক্ষর ও সরবরাহ পর্যন্ত যেতে বহু বছর সময় নেয়।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘পাকিস্তান বিমানবাহিনী আগ্রাসীভাবে জেএফ–১৭ বাজারজাত করলেও, ঋণ বিনিময়ের মাধ্যমে জেএফ–১৭ বিক্রির ধারণা তাদের মূল পরিকল্পনা নয়।’
অন্যান্য পর্যবেক্ষকরাও মনে করেন, নিজেদের বিমানবাহিনীর পারফরম্যান্সকে কাজে লাগিয়ে প্রতিরক্ষা রপ্তানি বাড়ানো এবং মধ্যম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সুযোগ দেখছে ইসলামাবাদ। জেএফ–১৭ প্রকল্পে যুক্ত অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রের পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মানদণ্ড।
তিনি বলেন, ‘খুব কম দেশই যুদ্ধবিমান তৈরি করে। বাজারের বড় অংশই পশ্চিমা নির্মাতাদের দখলে, যারা বিক্রির ক্ষেত্রে নানা শর্ত জুড়ে দেয়। কিন্তু সবাই এখন বিকল্প খুঁজছে, কারণ সব ডিম তারা এক ঝুড়িতে রাখতে চায় না — আর এখানেই পাকিস্তানের সুযোগ।’
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর পাকিস্তানের প্রতি ঢাকার অবস্থানে বড় পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের চুক্তি শুধু একটি বিমান বিক্রির বিষয় নয়। এটি এক ধরনের সহযোগিতা, জাতীয় পর্যায়ে এক ধরনের সমঝোতা, যা দুই দেশের কৌশলগত সমন্বয়কে তুলে ধরে।’
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধবিমান হলো দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার। একটি যুদ্ধবিমান সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়। তিনি যোগ করেন, ‘বাংলাদেশ যদি জেএফ–১৭ বা সুপার মুশশাক প্রশিক্ষণ বিমান নেয়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় — প্রশিক্ষণ ও বিক্রয়োত্তর সেবাসহ তারা দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের জন্যই এগোচ্ছে। বাংলাদেশ চীনের জে–১০ যুদ্ধবিমানেও আগ্রহ দেখাচ্ছে, যার অর্থ কৌশলগতভাবে তারা ভবিষ্যতে কার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকবে, সে সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছে।’



