ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণ

পাহাড়ে নিহত ১০০ বলা হলো যেভাবে, পেছনে যাদের রাজনীতি? 

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২৫, ০৪:১৭ পিএম

পাহাড়ে সংঘাতের ঘটনায় চারজন নিহত ও অন্তত ৮০ জন আহত হয়েছেন। সশস্ত্র বাহিনীর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) থেকে এই তথ্যই জানানো হয়। এমনকি দেশের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমগুলোও এমন তথ্যই প্রকাশ করেছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ‘ভুয়া তথ্য’। বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হয়, সেখানে ১০০ মানুষ নিহত হয়েছে। 

পার্বত্য চট্টগ্রামে ঘটনার সূত্রপাত গত ১৮ সেপ্টেম্বর। খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় চুরির অভিযোগে পিটুনির পর নিহত হয় এক ব্যক্তি। পরদিনই পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। পরে আগুন দেওয়া হয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের অন্তত ৮০টি দোকানে। পরে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে আরেক পাহাড়ি জেলা রাঙামাটিতেও। দুই দিনে চারজন নিহত ও অন্তত ৮০ জন আহত হয়।  

এ ঘটনার পর দ্য ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কমিশন (এনএইচআরসি) উদ্বেগ প্রকাশ করে। বিবৃতি দেয় সিএইচটি কমিশন ও ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্রুপ ফর ইনডিজেনাস অ্যাফেয়ার্স (আইডব্লিউজিআইএ)। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন আইডি ও পেজ থেকে ছড়াতে থাকে ভুয়া তথ্য। নিহতের সংখ্যা দাবি করা হয় ১০০। এ নিয়ে ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোতেও ছড়াতে থাকে এসব ভুল তথ্য!   

এক বিশ্লেষণে স্বতন্ত্র গবেষণা প্ল্যাটফর্ম ডিসমিসল্যাব বের করার চেষ্টা করেছে, কীভাবে মৃত্যুর এই সংখ্যা এত বাড়িয়ে বলা হলো? এ ছাড়া কারা কীভাবে এসব মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছেন এবং এতে রাজনৈতিক কোন চাল প্রয়োগ করা হয়েছে, সেসব বের করার চেষ্টা করা হয় গবেষণায়।

৪ থেকে ১০০: ভুল তথ্য ছড়াল যেভাবে
১৯ সেপ্টেম্বর রাতে খাগড়াছড়ির স্বনির্ভর এলাকায় গুলির ঘটনার পর মূলত ভূয়া তথ্য ছড়াতে থাকে। সংঘাত শুরু হয় রাত সাড়ে ১০টায়। কয়েক ঘণ্টা পর রাত ১২টা ৫৪ মিনিটে ‘Jummo’ নামের ফেসবুক পেজ থেকে দাবি করা হয়, ‘ইতোমধ্যে ৩২ জন নিহত হয়েছেন, খাগড়াছড়িতে নজর রাখুন।’ ডিসমিসল্যাব বলছে, ভূয়া তথ্য ছড়ানো প্রথম ফেসবুক পেজ এটি। একদিন আগে (১৮ সেপ্টেম্বর) পেজটি খোলা হয়। এতে প্রথমে ভারতের ত্রিপুরাভিত্তিক অনলাইন পোর্টাল ‘দ্য জুম্মু টাইমসের’ লোগো আপলোড করা হয়েছিল।      

এক ঘণ্টার মধ্যে এই সংখ্যা ৩৫ হয়ে যায়। বিভিন্ন পোস্টে গুজব ছড়ানো হয়, ‘পাহাড়ে বাংলাদেশি সেনাবাহিনী গুলি করছে, তাতে পাহাড়িরা মারা যাচ্ছে’। এতে গুলির ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করা হলেও মরদেহের কোনো প্রমাণ ছিল না। এমনকি আগের পোস্টও শেয়ার করা হয়। এমন পোস্ট দেখা যায় ‘RC’s World’ নামের ফেসবুক পোস্টে। এটি ফ্রান্সে অবস্থানকারী কেউ পরিচালনা করেন। 

রাত তিনটার মধ্যেই এই সংখ্যা ৩৬ হয়ে যায়। এবার বিভিন্ন পোস্টে বলা হয়, ‘৫ আগস্টের আগের সব হত্যাকাণ্ডের জন্য যদি আওয়ামী লীগ সরকার দায়ী হয়, তাহলে ৫ আগস্টের পরের হত্যাকাণ্ডের জন্য কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারীকে কেন জবাবদিহি করা হবে না??? তাদের এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি কেন?? ৩৬ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি ২০০টি বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ায় পাহাড় কান্নায় ভারী হয়ে গেছে।’ 

ছবি: ডিসমিসল্যাবের সৌজন্যেমোহাম্মদ জাকারিয়া ইসলাম নামের একটি আইডি থেকে এই পোস্ট করা হয়। তিনি একজন বাংলাদেশি নাগরিক এবং সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের একজন কর্মী। এমনকি ছাত্রলীগের অনেকে এমন পোস্ট করেন। পরদিন ভোরে ত্রিপুরাভিত্তিক নিউজ আউটলেট ‘দ্য জম্মু টাইমস’ ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও শেয়ার করে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা দেখানো হয়। এতে দাবি করা হয়, আর্মি ও বাঙালি সেটলারদের গুলিতে ৩৩ চাকমা নিহত হয়েছে।

ওই দিনই নিহতের সংখ্যা প্রথমে ৬৭ এবং পরে ৭৯ এ পৌঁছে যায়। প্রথম ৬৭ দাবি করা হয় অতুল চাকমা নামের একটি আইডি থেকে। তাতে বলা হয়, ‘জনগণ বলছে, বেসামরিক নিহতের সংখ্যা ১৫০-এর বেশি। ৬৭ মরদেহ পাওয়া গেছে এবং আহত অনেক বেসামরিক নাগরিক।’ অতুল চাকমা একটি পেজও চালান, যাতে তিনি ভারতীয় বলে পরিচয় দিয়েছেন। 

অতুল চাকমার এই তথ্য শেয়ার করেন অল অরুণাচল স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক নেতা অ্যাডভোকেট সুমন্ত চাকমা। তিনি ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বংয়মসেবক সংঘের (আরএসএস) সদস্য। এ ছাড়া চাকমা বাবু নামের একজনও এটি শেয়ার করেন। তিনি ত্রিপুরাভিত্তিক নিউজ আউটলেট ‘দ্য জম্মু টাইমসের’ নিয়মিত লেখক। 

এর বাইরে ভারতীয় ইনফ্লুয়েন্সার পেজ ‘রুপম দ্য এক্সপ্লোরার’ ইউটিউবে ভিডিও প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশি মুসলমানদের নৃশংস হামলায় ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত; বাংলাদেশ পরের আফগানিস্তান।’ এই ভিডিও দ্রুত ছড়াতে থাকে।

হিল ব্লাড নামের বাংলাদেশ থেকে চালানো একটি পেজে দাবি করা হয়, ৭৯ জন নিহত হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর সকালে হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশি মাইনোরিটিস (এইচআরসিবিএম) নামের সংস্থাও এ নিয়ে পোস্ট করে। পরে এই সূত্রের বরাত দিয়ে ৭৯ জন নিহতের তথ্য ছড়াতে থাকে। যদিও আগে হত্যা ও হামলার ঘটনায় বেশ কয়েকবার ভুল তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে এই সংস্থার নামে। এই পেজ চালানো চারজনের তিনজন আমেরিকায় ও একজন ভারতে থাকেন। 
     
ভারতের বিভিন্ন চাকমা নেতাও এই তথ্য ছড়াতে থাকেন। এ ছাড়া বাবা বেনারস নামের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকেও বলা হয় এই সংঘাতের ব্যাপারে। এ ছাড়া ‘ভয়েস অব বাংলাদেশি হিন্দুস’ অ্যাকাউন্টে ছড়ানো হয় গুজব। 

ভারতের ত্রিপুরার শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী এবং বিজেপির নেতা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে চিঠিও লেখেন। তাতে নিহতের সংখ্যা ৪০ বলা হয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন ভারতীয় মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে নিহতের ভুল তথ্য। এর বাইরে ভারতের ‘মেঘ আপডেট’, ‘অরগানাইজার ওইকলি’ ও মিয়ানমারের ‘আরাকান বে নিউজ’ও গুজব ছড়ায়। 

ছবি: ডিসমিসল্যাবের সৌজন্যেপেছনে কার রাজনীতি?

ডিসমিসল্যাব বলছে, ভারতের বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতা, সমর্থক এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নেতারা এই ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক ক্যাম্পেইন করেন।  ত্রিপুরার চাকমা নেতা ও বিজেপির সদস্য ও সমর্থকেরা এসব গুজব ছড়ান। এমনকি তাতে বলা হয়, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যাপারে বিশ্ব সম্প্রদায় যেন ব্যবস্থা নেয়। শেখ হাসিনার সময় এমন সংঘাত হয়নি বলেই দাবি করা হয়।  

‘Supporters of Bangladesh Awami League’ নামের একটি গ্রুপ থেকে প্রথমে ৩৬ জন নিহতের কথা বলা হয়। এরপর এই সংখ্যা ক্রমে ৬৭ হয়ে যায়। বিভিন্ন পোস্টে ড. ইউনূসকে মিয়ানমারের নেত্রী অং সাং সু চির সঙ্গে তুলনা করা হয়। কেড়ে নেওয়ার দাবি করা হয় তাঁর নোবেল পুরস্কার। 

২২ সেপ্টেম্বর পিটিশনের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়। যদিও এই পিটিশন পরে সরিয়ে নেওয়া হয়। সেই সাইটে গিয়ে পাওয়া যায়নি পিটিশন। 

[প্রতিবেদনটি ডিসমিসল্যাব থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত ও সংক্ষেপিত।]

বন্যা বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে পানিবন্দী সমতল ভূমি। কিন্তু চিন্তা করে দেখুন তো—সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উঁচুতে থাকা পাহাড়ি এলাকায় যখন বন্যার পানি ঘরে ঢুকে পড়ে, তখন পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হয়? দেশের...
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের প্রবেশমুখেই অবস্থিত সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর। গত কয়েক দশক ধরে এলাকাটি নিয়ে নানা রহস্য ও ভীতি কাজ করলেও, চলতি বছরের শুরুতেই জঙ্গল সলিমপুর নতুন...
নাথান বম যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে (এখন চারুকলা অনুষদ) পড়াশুনার সুযোগ পেয়ে গেল তখন তা নিয়ে বম সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে গর্বের কমতি ছিল না।  সেই নাথানই এখন বম সম্প্রদায়ের মানুষের...
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় আরও দুই সন্দেহভাজন জাহিদুল ইসলাম ও ফয়সাল আহমেদ রাব্বীর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
হবিগঞ্জে পৃথক অভিযানে আন্তঃজেলা ডাকাত দলের মূল হোতাসহ মোট ৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-৯। সোমবার দুপুরে হবিগঞ্জে র‍্যাব-৯-এর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র‍্যাব কর্মকর্তারা।
বেলুচিস্তানের খোজদার জেলার জিদিতে চালানো এক অভিযানে ১৯ পাকিস্তানি সেনাকে হত্যার দাবি করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। বেলুচিস্তান পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর