বাংলাদেশের সংবিধানে কি আসতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন? মুছে যেতে পারে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘জাতির পিতা’র স্বীকৃতি আর ৭ই মার্চের ভাষণ! আর প্রথমবারের মতো সংবিধানে যুক্ত হতে যাচ্ছেন জিয়াউর রহমান? কেন এই আমূল পরিবর্তন? আজ সহজ ভাষায় জানব, সংবিধান থেকে কী কী বাদ পড়ছে এবং নতুন কী যুক্ত হচ্ছে।
বাদ যাচ্ছেন শেখ মুজিব, যুক্ত হচ্ছেন জিয়াউর রহমান
সংবিধান সংশোধনের এই প্রস্তাবে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়টি হলো শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমানের অবস্থান। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও পঞ্চদশ সংশোধনী পর্যালোচনার মাধ্যমে সংবিধানে আসতে যাচ্ছে বড় পরিবর্তন।
এতে সংবিধান থেকে বাদ যেতে পারে শেখ মুজিবুর রহমানের জাতির পিতার স্বীকৃতি। ফলে বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী বিভিন্ন অফিসে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি বা প্রতিকৃতি টাঙানোর বাধ্যবাধকতা আর থাকবে না। একই সঙ্গে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত হওয়া ৭ই মার্চের ভাষণ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া সংবিধানে নতুন যুক্ত হতে পারে মুক্তিযুদ্ধে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান। ১৯৭১ সালের মার্চে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমানের দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণাটি আনুষ্ঠানিকভাবে সংবিধানে যুক্ত হতে যাচ্ছে।
আরও যা ফিরছে
শুধু ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরিবর্তনই নয়, দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতেও আসছে বিরাট রদবদল। উচ্চ আদালতের রায়ের ওপর ভিত্তি করে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে দুটি বিধান। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের ‘গণভোট’ ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল। কমিটির প্রস্তাবে এই দুটি বিধানকেই আবার সংবিধানে ফিরিয়ে আনা হতে পারে।
সংবিধানে থাকা ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ শব্দের জায়গায় যুক্ত হতে পারে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। এ ছাড়া ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র সম্পর্কিত ধারাগুলোতেও পরিবর্তন আনার আলোচনা চলছে।
পাশাপাশি অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা দখল বা সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংশোধনের অযোগ্য ঘোষণা করে যেসব বিতর্কিত ও অস্পষ্ট ধারা যুক্ত করা হয়েছিল, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সহনশীলতার স্বার্থে সেগুলো বাদ দেওয়া হচ্ছে।
যুক্ত হচ্ছে জুলাই অভ্যুত্থান
এই পুরো সংবিধান সংশোধনের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে ২০২৪ সালের ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ এবং ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে। জুলাই বিপ্লবকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি নতুন কিছু বৈপ্লবিক আইন যুক্ত করার কাজ চলছে। যেমন: ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা ও শহীদদের অবদানকে সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়া, একজন ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে না পারা এবং জাতীয় সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করার পরিকল্পনা। এ ছাড়া আলোচনায় এসেছে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো, একাধিক ডেপুটি স্পিকারের পদ সৃষ্টি এবং নারীদের আসন বৃদ্ধির বিষয়গুলো। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো, কোনো সংসদ সদস্য নৈতিক অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর সদস্যপদ বাতিলের কঠোর বিধান।
রাজনৈতিক বিতর্ক
সংবিধান সংশোধনে যে কমিটি করা হয়েছে, সেই কমিটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কও কম নয়। জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি ও অন্যান্য বিরোধী দল এই কমিটিতে যোগ দেয়নি। তাদের দাবি ছিল গণভোটে পাস হওয়া সংবিধান সংস্কার কাউন্সিলের অধীনে সংশোধন আনা। কিন্তু বিএনপি ও সরকারের বক্তব্য—সংসদই সংবিধান সংশোধনের একমাত্র বৈধ সংস্থা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, বিরোধী দল কমিটিতে না থাকলেও তাদের প্রস্তাব ও আপত্তি বিবেচনায় নেওয়া হবে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সুপ্রিম কোর্ট বার, শহীদ পরিবার এবং জুলাই আন্দোলনের নেতাদের সাথে আলোচনা করেই চূড়ান্ত রিপোর্ট তৈরি করা হবে।
একদিকে স্বাধীনতার ঘোষণার সঠিক ইতিহাস ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন, অন্যদিকে শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক অবদান বাদ দেওয়া নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় উঠতে বাধ্য। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ সংবিধান উপহার দেওয়ার এই উদ্যোগ কতটুকু সর্বজনীন হয়—সেটাই এখন দেখার বিষয়।



