আগামী ১২ নভেম্বর শুরু হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে নানা আয়োজন, আলোচনা ও রাজনৈতিক প্রস্তুতি। কীভাবে হবে নির্বাচন? প্রার্থী হতে শিক্ষাগত যোগ্যতাই বা কী লাগবে? দলীয় প্রতীক কি থাকছে? নির্বাচন ঘিরে আরেকটি প্রশ্ন সবার মনে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ কি অংশ নিতে পারবে? চলুন জেনে নেওয়া যাক স্থানীয় নির্বাচনের সবিস্তার।
স্থানীয় নির্বাচন কবে?
বাংলাদেশে আবারও শুরু হতে যাচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা, প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে শুরু হবে ভোট। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, প্রথম ধাপে ৭টি ধাপে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। যার প্রথম ধাপ শুরু হবে আগামী ১২ নভেম্বর।
ভোটের সময় নির্ধারণে বেশ কিছু বিষয় বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। পাবলিক পরীক্ষা, দুর্গাপূজা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিভিন্ন জাতীয় কর্মসূচির পাশাপাশি সামনে রয়েছে এসএসসি পরীক্ষা, রমজান ও ঈদ। ফলে ভোটের জন্য উপযুক্ত সময় খুব সীমিত। সরকারের লক্ষ্য, পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগামী বছরের জুনের মধ্যে শেষ করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব দেওয়া।
প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগবে?
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক নয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, প্রচলিত নির্বাচনী আইনে স্থানীয় নির্বাচনের প্রার্থীদের জন্য এমন কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত নেই। অর্থাৎ নির্দিষ্ট ডিগ্রি বা শিক্ষাগত সনদ না থাকলেই কেউ নির্বাচনে অযোগ্য—এমন নিয়ম নেই।
তবে সরকারি বা অন্য কোনো লাভজনক পদে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আলাদা আইনি বিধিনিষেধ রয়েছে। বিশেষ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন আইন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট নীতিমালা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেবে।
দলীয় প্রতীক থাকছে না
এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে দলীয় প্রতীক ছাড়া। অর্থাৎ ধানের শীষ, নৌকা, লাঙল বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতীক নিয়ে কেউ ভোট করবেন না। আইন পরিবর্তনের ফলে স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন ও দলীয় প্রতীকের ব্যবস্থা থাকছে না। প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন সাধারণ বা নির্দলীয় প্রতীকে। তবে নির্বাচন নির্দলীয় হলেই যে প্রার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয় থাকবে না, তা নয়। কোনো প্রার্থী কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত বা কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের—তা ভোটারদের কাছে পরিচিত থাকতে পারে।
নির্বাচন কমিশন এ জন্য নতুন আচরণবিধিও দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রচারণায় পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না। ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড ব্যবহারেও রয়েছে নির্দিষ্ট সীমা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা যাবে, তবে এর খরচ নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে যুক্ত হবে। এ ছাড়া ভোটারদের প্রভাবিত করতে টাকা দেওয়া, ধর্মীয় উপাসনালয় বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রচার এবং নির্বাচনী এলাকায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রচারে অংশ নেওয়ার ওপরও বিধিনিষেধ রয়েছে।
আওয়ামী লীগ কি নির্বাচনে অংশ নেবে?
স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি—আওয়ামী লীগ কি এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে? সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ থাকায় দলটির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে দলীয় কর্মকাণ্ড বা দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগও থাকবে না। তবে স্থানীয় নির্বাচন যেহেতু আইন অনুযায়ী নির্দলীয়, তাই কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় থাকা আর দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করা—দুটি আলাদা বিষয়।
সুতরাং আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের প্রশ্নটি মূলত নির্ভর করছে দলটির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা ভবিষ্যতে বহাল থাকে কি না এবং সংশ্লিষ্ট আইনগত সিদ্ধান্ত কী হয় তার ওপর। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রেও দলীয় প্রতীক থাকবে না। তবে স্থানীয় পর্যায়ে কোনো প্রার্থীকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন বা সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানোর বিষয়টি নির্বাচনের মাঠে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা
এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। কমিশনকে একদিকে নির্বাচনের সময়সূচি ও তফসিল নির্ধারণ করতে হবে, অন্যদিকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ ভোট আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজন করা হবে।
তবে কোন নির্বাচন কখন হবে, তা নির্ধারণে ভোটের সময়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মেয়াদ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পাবলিক পরীক্ষা, জাতীয় কর্মসূচি, রমজান ও ঈদের মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হবে নতুন নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকর করা এবং প্রার্থীদের প্রচার, নির্বাচনী ব্যয় ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করা। পাশাপাশি ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করাও কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। দলীয় প্রতীক না থাকলেও স্থানীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রভাব যাতে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে, সেটিও কমিশনকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। সব মিলিয়ে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে, তার বড় অংশই নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি, নিরপেক্ষতা এবং মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগের ওপর।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের ভোট নয়, এটি দেশের তৃণমূল পর্যায়ের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। দলীয় প্রতীক না থাকলেও রাজনৈতিক সমীকরণ যে নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। এখন দেখার বিষয়—নির্বাচন কমিশন কতটা নিরপেক্ষ পরিবেশে ভোট আয়োজন করতে পারে এবং রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে অংশ নেয়। তফসিল ঘোষণার পরই স্পষ্ট হবে—কোন ধাপে, কবে এবং কীভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হবে। তাই এখন সবার নজর নির্বাচন কমিশনের দিকে।



