গত ৫ বছরের সব রেকর্ড ভেঙে কারাবন্দির সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে গেছে। ভাবুন তো, যেখানে ধারণক্ষমতা মাত্র ৪৫ হাজার, সেখানে রাখা হচ্ছে আড়াই গুণ বেশি বন্দি। আর কিছু কিছু জেলায় পরিস্থিতি এতটাই বেসামাল যে, ধারণক্ষমতার ৫ থেকে ৭ গুণ বেশি বন্দি গাদাগাদি করে দিন কাটাচ্ছেন। আসলে দেশজুড়ে হঠাৎ এত বন্দি বাড়ল কেন? কোন কোন জেলের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
৫ বছরের রেকর্ড
শুরু করা যাক একদম সবশেষ তথ্য দিয়ে। কারা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি মাসেই দেশের ৭৬টি কারাগারে মোট বন্দির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ১২৩ জনে। একটু পেছনে ফিরে তাকালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে সর্বোচ্চ বন্দি ছিল প্রায় ৯০ হাজার। ২০২২ সালের অক্টোবরে সেটা কিছুটা কমে হয় ৮৭ হাজার। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ৮৬ হাজার, আর ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ছিল ৭৫ হাজার ৯৫৮ জন। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বন্দি সংখ্যা ছিল ৮৩ হাজার ৭১৯ জন।
কিন্তু এ বছর সেই সব রেকর্ড ভেঙে এক লাফে সংখ্যাটা লাখের ওপরে চলে গেছে। অর্থাৎ গত পাঁচ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে বেশি মানুষ বন্দি রয়েছে। প্রশ্ন হলো—হঠাৎ এত মানুষ জেলের ভেতরে গেল কোত্থেকে?
কোন জেলের কী হাল?
পরিসংখ্যান তো শুনলেন, এবার আসি আসল চিত্রটায়। দেশের কারাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতা হলো ৪৫ হাজার ১৮৬ জন। কিন্তু বর্তমানে বন্দি আছে ১ লাখ ৪ হাজারের বেশি। অর্থাৎ গড়ে প্রতিটি জেলে আড়াই গুণ বেশি চাপ। কিন্তু কিছু কিছু কারাগারে এ পরিস্থিতি ভয়াবহ। যেমন: শেরপুর জেলা কারাগারের ধারণক্ষমতা মাত্র ১০০ জন। অথচ সেখানে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে ৭৪৬ জন বন্দি। হিসাব করে দেখুন, এটা ধারণক্ষমতার প্রায় ৭ গুণ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ভোলা জেলা কারাগারে বন্দি রয়েছে ধারণক্ষমতার ৬ গুণ মানুষ। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৫৩ জনের জায়গায় আছে ৯৩৬ জন, আর ভোলায় ১০০ জনের জায়গায় আছে ৬৬৮ জন। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, ঝিনাইদহ, রাজবাড়ী এবং চাঁদপুরে ধারণক্ষমতার ৫ গুণ বন্দি রয়েছে। আর গাজীপুরের কাশিমপুর-৩ মহিলা কারাগার বা নাটোর জেলের মতো জায়গায় বন্দি আছে সাড়ে চার গুণ। ভাবুন তো অবস্থা। যে স্থানে থাকার কথা ১০০ জনের, সেখানে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে সাত শ'রও বেশি মানুষকে!
নেপথ্যের কারণ কী?
এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, হঠাৎ করে জেলের ভেতরে এই জনস্রোত তৈরি হলো কেন? এর পেছনে মূলত দুটো বড় কারণ কাজ করছে।
প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং বিভিন্ন অপরাধ দমনে একের পর এক বিশেষ অভিযান চলছে। সিএমপির ‘এস ড্রাইভ’, ডিএমপির মোহাম্মদপুরের বিশেষ অভিযান থেকে শুরু করে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ কিংবা চরাঞ্চলের ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট’—সব মিলিয়ে দেশজুড়ে অপরাধীদের ধরতে ঝটিকা অভিযান চলছে। শুধু চলতি বছরের ১ মে থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত দেশব্যাপী বিশেষ অভিযানেই গ্রেপ্তার হয়েছে ৫৩ হাজার ৫১৮ জন।
দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বড় কারণ হলো—মাদকের বিস্তার। কারা কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগে যেখানে কারাগারে থাকা বন্দিদের মধ্যে মাদকের অপরাধী ছিল ২০ থেকে ২২ শতাংশ, এখন সেটা লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২ শতাংশে। অর্থাৎ, প্রতি ১০ জন বন্দির মধ্যে অন্তত ৩ জনই মাদক মামলার আসামি।
কারা আছে জেলের ভেতর?
আচ্ছা, এই বিপুল পরিমাণ বন্দির মধ্যে কারা নেই বলুন তো? সাধারণ ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী, জুয়াড়ি, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য থেকে শুরু করে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সদস্য—সবাই রয়েছে এই তালিকার ভেতর। এমনকি কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগারে সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও বিচারপতির মতো প্রায় ২৩০ জন বিশেষ বন্দিকেও রাখা হয়েছে।
এত মানুষের চাপ সামলাতে গিয়ে কারা কর্তৃপক্ষের মাথা নষ্ট হওয়ার জোগাড়। ভারপ্রাপ্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল দৈনিক সমকালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো রাখতে গিয়ে অপরাধী বেশি ধরা পড়ছে এবং মাদকের বন্দি বাড়ায় এই চাপ তৈরি হয়েছে। তবে তাঁর মতে, বন্দিদের থাকার জায়গা নিয়ে কিছুটা সমস্যা হলেও অন্য কোনো বড় অসুবিধা হচ্ছে না।
সার-সংক্ষেপ হলো—দেশে অপরাধ দমন এবং আইনশৃঙ্খলা জোরদার করতে পুলিশের নিয়মিত ও বিশেষ অভিযান যেমন জরুরি, তেমনি এর ফলে কারাগারগুলোর ওপর যে পাহাড়সমান চাপ তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ৪৫ হাজার ধারণক্ষমতার জায়গায় ১ লাখের বেশি মানুষ রাখা মানে একধরনের নজিরবিহীন চাপ। অপরাধ কমলে কিংবা পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা না হলে এই জেলের ওপর চাপ ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে ঠেকবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।



