৪৫০ আসনের ৪ ভাগের ৩ ভাগ আসনেই জয় পেয়েছে পুতিনের দল, আর তারপরই মস্কো থেকে খবর এল, ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধের সিদ্ধান্তই সঠিক। আর ভোট দিয়েই এই সিদ্ধান্তে সায় দিয়েছে রাশিয়ার সাধারণ মানুষ। কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্ন। এই ভোট কি সত্যিই ইউক্রেন যুদ্ধের পক্ষে রাশিয়ার মানুষের ভোট? নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও জটিল রাজনৈতিক হিসাব? চলুন জেনে নিই বিস্তারিত ঘটনা।
যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি
আগে একটু দেখে নেওয়া যাক, ভোটের সময় ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতি কী ছিল। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ এখনো থামেনি। সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহেও দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনে হতাহতের খবর এসেছে। অন্যদিকে ইউক্রেনও রাশিয়ার ভেতরে তেল শোধনাগার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধের শেষ এখনো দেখা যাচ্ছে না। বরং আকাশপথে হামলা বাড়ছে।
রাশিয়া নতুন ধরনের জেটচালিত ড্রোন ব্যবহার করছে, আর ইউক্রেনও দূরপাল্লার ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে। এর মধ্যেই রাশিয়ায় হলো পার্লামেন্ট নির্বাচন। পুতিনের জন্য এই নির্বাচন শুধু পার্লামেন্ট গঠনের বিষয় ছিল না। ভোটের আগে তিনি নিজেই বলেছিলেন, এই ফলাফল দেখাবে রুশ জনগণ ইউক্রেনে যুদ্ধরত সেনাদের পাশে আছে কি না। অর্থাৎ ভোট শেষ হওয়ার আগেই নির্বাচনটিকে যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থনের একটি পরীক্ষার মতো তুলে ধরা হয়েছিল।
ভোটে রেকর্ড গড়লেন পুতিন?
ফলাফল বলছে—পুতিনের দল সত্যিই বড় জয় পেয়েছে। রাশিয়ার নির্বাচন কমিশনের প্রায় পূর্ণাঙ্গ হিসাবে, ইউনাইটেড রাশিয়া পেয়েছে ৫৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ ভোট এবং ৪৫০ আসনের মধ্যে ৩৫৫টি আসন। ২০২১ সালের নির্বাচনে দলটি পেয়েছিল ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট এবং ৩২৪টি আসন। অর্থাৎ ভোটের হারও বেড়েছে, আসনও বেড়েছে। ৩৫৫ আসন নিয়ে নতুন ডুমায় দলটি সংবিধান পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বড় ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখল। এটি ইউনাইটেড রাশিয়ার জন্য রেকর্ড আসনসংখ্যা। তাই রাজনৈতিকভাবে এই ফল পুতিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পার্লামেন্টে তার নীতির বিরোধিতা করার মতো শক্তিশালী রাজনৈতিক চাপ আরও কমে গেল।
কিন্তু এখানেই আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে। এই নির্বাচনকে পুরোপুরি স্বাভাবিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হিসেবে দেখছেন না অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষক। কারণ রাশিয়ার একমাত্র নিবন্ধিত বড় যুদ্ধবিরোধী দল ইয়াব্লোকো জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়নি। রাশিয়ার সুপ্রিম কোর্ট তাদের নির্বাচনী তালিকা বাতিল করেছিল।
এ ছাড়া যুদ্ধবিরোধী অনেক রাজনীতিক জেলে, কেউ কেউ দেশ ছেড়ে বাইরে চলে গেছেন। ইউরোপের নিরাপত্তা ও সহযোগিতা সংস্থা—ওএসসিই-র নির্বাচনী পর্যবেক্ষকরাও এবার রাশিয়ার ভোট পর্যবেক্ষণ করেনি। আর ভোট হয়েছে রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের কয়েকটি এলাকাতেও, যেটিকে ইউক্রেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। অর্থাৎ ফলাফল বড়—কিন্তু সেই ফলকে বুঝতে হলে নির্বাচনের পরিবেশটাও দেখতে হবে।
যুদ্ধে রাশিয়ার মানুষের সমর্থন?
এখন আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে। ইউনাইটেড রাশিয়ার ৫৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ ভোট কি প্রমাণ করে যে ৫৭ শতাংশের বেশি রুশ মানুষ ইউক্রেন যুদ্ধকে সমর্থন করছে? সরাসরি এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। কারণ একজন ভোটার ইউনাইটেড রাশিয়াকে ভোট দিতে পারেন নানা কারণে। তিনি পুতিনকে সমর্থন করতে পারেন, সরকারের অর্থনৈতিক নীতিকে সমর্থন করতে পারেন, স্থিতিশীলতা চাইতে পারেন—অথবা যুদ্ধ নিয়ে তার নিজের মত থাকলেও দলটিকে ভোট দিতে পারেন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুদ্ধবিরোধী প্রধান রাজনৈতিক বিকল্পটিই জাতীয় ব্যালটে ছিল না।
রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি প্রায় ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে ৪০টি আসন পেয়েছে। এলডিপিআর পেয়েছে ২৫টি এবং নিউ পিপল পেয়েছে ২০টি আসন। কিন্তু এই দলগুলো পুতিনের সঙ্গে সব বিষয়ে একমত না হলেও, ইউক্রেন যুদ্ধের বিরুদ্ধে ইয়াব্লোকোর মতো স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। তাই নির্বাচনের ফল থেকে এটা বলা যায়—পুতিনের শাসন ও তার দল রাশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় শক্তিশালী অবস্থানে আছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পুতিন এই ফলকে তার নীতি এবং যুদ্ধের প্রতি জনগণের সমর্থনের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। তবে একই সঙ্গে যুদ্ধের খরচ ও দীর্ঘ সময় ধরে চলা সংঘাত নিয়ে রাশিয়ার ভেতরে উদ্বেগও রয়েছে।
রাশিয়ার নির্বাচনে পুতিনের দল নিঃসন্দেহে বড় জয় পেয়েছে। ৩৫৫টি আসন নিয়ে পার্লামেন্টে তাদের শক্তি আরও বেড়েছে। এই ফল পুতিনকে ইউক্রেন যুদ্ধসহ তার অন্যান্য নীতি চালিয়ে যাওয়ার জন্য বড় রাজনৈতিক সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু এই ভোটকে সরাসরি “যুদ্ধের পক্ষে গণভোট” বলা ঠিক হবে না। কারণ যুদ্ধবিরোধী বড় রাজনৈতিক শক্তি নির্বাচনের বাইরে ছিল, বিরোধীদের জন্য জায়গা সীমিত ছিল এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণও ছিল না। অর্থাৎ ভোটের ফল একটি বিষয় পরিষ্কার করেছে—রাশিয়ায় ক্ষমতার দৌড়ে পুতিন এখনো অত্যন্ত শক্ত অবস্থানে।



