বাসের গায়ে নতুন স্টিকার। রংও বদলেছে। কোম্পানির নামও নতুন। কিন্তু জানালা ভাঙা, সিট নড়বড়ে। বাস থামছে যেখানে-সেখানে। যাত্রী তুলতে চলছে আগের মতোই হাঁকডাক। রাজধানীতে বাসব্যবস্থা বদলানোর নতুন উদ্যোগের প্রথম দিনের চিত্র ছিল এমনই। ১ নভেম্বর ছয়টি রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাস চলাচল শুরু হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ বাসই পুরোনো। নতুন রং ছাড়া সেবায় দৃশ্যমান পরিবর্তন খুব একটা নেই।
প্রশ্ন হলো, বাসের রং বদলালেই কি বদলাবে ঢাকার গণপরিবহন? নাকি পুরোনো সমস্যাই ফিরে আসবে নতুন নামে? চলুন, বিষয়টি বুঝে নেওয়া যাক।
সমস্যার শিকড় কোথায়
ঢাকার বাসব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নতুন নয়। ২০১১ সালে তৎকালীন ঢাকা পরিবহন সমন্বয় বোর্ড এ নিয়ে কাজ শুরু করে। পরে ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটির তৎকালীন মেয়র আনিসুল হক আটটি করিডরে আলাদা রঙের বাস চালুর পরিকল্পনা করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর উদ্যোগটি থেমে যায়। ২০১৯ সালে আবার পরিকল্পনা পর্যালোচনা শুরু হয়।
এখন ডিটিসিএর পরিকল্পনা, ঢাকার ৯৮টি চালু বাস রুটকে ৩২টি সমন্বিত রুটে আনা। কেন এই পরিবর্তন জরুরি? কারণ একই সড়কে একাধিক কোম্পানির বাস একই যাত্রীর জন্য প্রতিযোগিতা করে। কে আগে যাত্রী তুলবে, কে আগে গন্তব্যে পৌঁছাবে—এই প্রতিযোগিতায় বাস দাঁড়ায় মাঝরাস্তায়। যাত্রী ওঠানো-নামানো চলে যেখানে-সেখানে। বাড়ে যানজট, দুর্ঘটনা ও ভোগান্তি।
নতুন ব্যবস্থার মূল ধারণা হলো, এক রুটে নির্দিষ্ট কোম্পানি বাস চালাবে। থাকবে নির্ধারিত স্টপেজ, টিকিট কাউন্টার, ই-টিকিটিং ও জিপিএস। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা নয়, চলবে সমন্বিত সেবা।
উদ্বোধন বনাম বাস্তবতা
ডিটিসিএর একটি ঘোষিত হিসাবে প্রথম ধাপে ছয়টি কোম্পানির অধীনে ৭৮০টি বাস চলার কথা। ছয়টি মূল রুটে ৮৩১টি এবং একটি সার্কুলার রুটে ৩০টি—সব মিলিয়ে ৮৬১টি বাসের বরাদ্দ রয়েছে।
কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় সমস্যা প্রস্তুতিতে। সরেজমিন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাসগুলো আগের মতোই যত্রতত্র থামছে। টিকিট কাউন্টার নেই। চালকের সহকারীরা আগের মতোই যাত্রী ডাকছেন। পিপিবি পরিবহনের বাসেও পুরোনো নামের চিহ্ন দেখা গেছে।
একটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, অনেক বাসের ফিটনেস ও রংয়ের কাজও উদ্বোধনের আগে শেষ হয়নি। ফলে কোম্পানির নাম বদলালেও পরিচালনার পুরোনো কাঠামো রয়ে গেছে।
আরেকটি বড় সমস্যা চালক-সহকারীদের বেতন। ট্রিপের ভিত্তিতে আয় হলে বেশি যাত্রী তুলতে প্রতিযোগিতা থাকবেই। তাই তাঁদের নির্দিষ্ট মাসিক বেতন, প্রশিক্ষণ ও কাজের নিয়ম নিশ্চিত করা জরুরি।
দিল্লি থেকে শিক্ষা
এখানে ভারতের দিল্লির অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৮ সালে চালু হওয়া দিল্লির ৫ দশমিক ৮ কিলোমিটার বিআরটি করিডর ২০১৬ সালে ভেঙে ফেলার কাজ শুরু হয়। দুর্ঘটনা, যানজট, দুর্বল নকশা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল।
তবে দিল্লি বাসব্যবস্থায় আরেকটি মডেল চালু রেখেছে—ক্লাস্টার বাস। সরকার রুটগুলোকে কয়েকটি ক্লাস্টারে ভাগ করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে অপারেটর নিয়োগ করে। এখানে গ্রস কস্ট মডেলে বাস পরিচালনার জন্য নির্ধারিত চুক্তি অনুযায়ী অপারেটরকে অর্থ দেওয়া হয়। টিকিটের আয় সরাসরি অপারেটরের লাভের ভিত্তি নয়। বরং বাস কতটা নিয়ম মেনে চলছে, তার ওপর নির্ভর করে অর্থ কাটা বা পুরস্কারের ব্যবস্থা রয়েছে।
দিল্লি সরকারের ২০১৮-১৯ সালের নথিতে এই মডেলের বিস্তারিত উল্লেখ আছে। আর ডিআইএমটিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরের শেষে দিল্লিতে প্রায় ৩ হাজার ৩১০টি ক্লাস্টার বাস চলছিল।
তাই শুধু রুট ভাগ করলে হবে না, অর্থের হিসাব ও পরিচালনার নিয়মও বদলাতে হবে।
সমাধানের বাস্তব রূপরেখা
তাহলে ঢাকায় কী করা দরকার? প্রথমত, ৩২টি রুটের পরিকল্পনা বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। প্রতিটি রুটে পর্যাপ্ত বাস, নির্দিষ্ট সময়সূচি ও নির্ধারিত বাস বে নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সব বাসে জিপিএস, সিসিটিভি ও ই-টিকিটিং চালু করতে হবে। যাত্রীরা অ্যাপে দেখতে পারবেন বাস কোথায়, কখন আসবে। এক কার্ডে সব কোম্পানির বাসে চলাচলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যেমন র্যাপিড পাস।
তৃতীয়ত, মালিকদের সঙ্গে চুক্তিতে সেবার মান নির্ধারণ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে বাস না চালালে, স্টপেজ না মানলে বা অনিয়ম করলে জরিমানা করতে হবে। চালক-সহকারীদের দিতে হবে নিয়মিত বেতন। পুরোনো ও অনুপযোগী বাস ধাপে ধাপে সরিয়ে নতুন, নিচু মেঝের বাস আনতে হবে।
শেষ পর্যন্ত জবাবদিহি
গাজীপুর-এয়ারপোর্ট বিআরটি প্রকল্পের অভিজ্ঞতাও আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। ২০১২ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পে ১৪ বছরে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। গত ১৮ অক্টোবর সরকার প্রকল্পটি বাতিল করে অবকাঠামোকে সাধারণ সড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অর্থাৎ শুধু অবকাঠামো বা উদ্বোধন দিয়ে ভালো গণপরিবহন নিশ্চিত করা যায় না। দরকার কার্যকর ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জবাবদিহি।
কারণ যাত্রীরা বাসের গায়ের রং দেখতে চান না। তাঁরা চান সময়মতো বাস, নিরাপদ আসন আর নির্ভরযোগ্য যাত্রা। পাঁচ বছর পরও যদি একই ভোগান্তি থাকে, তাহলে নতুন কোম্পানির নাম দিয়ে লাভ কী?


