‘রাঙামাটির বরকলের চান্দবী ঘাটে ৫ ব্যক্তির মৃত্যু অজ্ঞাত কোনো রোগে নয়, তাঁদের চারজনের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। একজনের মৃত্যু হয়েছে অপচিকিৎসায়।’ সরেজমিনে রোগী দেখে, স্থানীয় ও মৃত ব্যক্তিদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য দিয়েছে রাঙামাটি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের গঠিত মেডিকেল টিম।
গেল ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে জঙ্গলে ঘুরতে গিয়ে চান্দবীঘাটের পশ্চিমপাড়ায় একটি পাগুর গাছ কেটে ফেলেন ঝান্দুমোন পাড়া দুই জুমিয়া। এর ৭ দিন পর স্ট্রোকে মৃত্যু হয় ৫৫ বছর বয়সী বিমলেশ্ব চাকমার। তিনি দীর্ঘদিন ধরে লিভারের জটিলতায় ভুগছিলেন।
এর কদিন পর গত ২৬ ফেব্রুয়ারি এলাকায় ব্র্যাকের স্বাস্থ্যকর্মী ডালিম কুমার চাকমার মৃত্যু হয় হৃদরোগে। ডালিমের মৃত্যুর পর এলাকায় ভাইরাস জ্বর, সর্দি ও কাশি ছড়িয়ে পড়ে। এরইমধ্যে গুজব ছড়ানো হয়, পাগুর গাছটি কেটে ফেলায় গাছে থাকা ভূতেরা রাগ হয়েছে।
এদিকে ডালিমের শূণ্যতায় চিকিৎসকের ভূমিকায় নামেন স্থানীয় কবিবাজ শিব রতন চাকমা। তিনি জ্বর, সর্দি, কাশি, গ্যাসট্রিক, ক্যালসিয়ামের শূণ্যতা, ব্যথা ইত্যাদির চিকিৎসা করতে শুরু করে দেন বনের লতাপাতা ও শিখরের রস খাওয়ানো। বন্ধ করে দেন রোগীদের মাছ, মাংস, ডাল, ডিম ও তেল খাওয়া। তাঁদের খেতে দেন সিদ্ধ খাবার। এতে রোগীরা সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে আরও অসুস্থ হতে থাকে। বাড়তে থাকে আতঙ্ক।
এছাড়া রোগীদের শরীরে হলুদ মেখে দেন কবিরাজ। হাতে পায়ে পড়িয়ে দেন সরিষার বীজ মোচা। পেটে ভেজা কাপড় মুড়িয়ে বেঁধে দেন বিভিন্ন গাছের শিখর–বাকর। নদীতে পানি শুকিয়ে যাওয়ায় রোগীদের নৌকায় করে হাসপাতালে নেওয়ার পথও বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে এলাকায় ইন্টারনেট না থাকায় কারোর সঙ্গে রোগ নিয়ে আলোচনা করতে পারে না চান্দবীঘাটের মানুষ।
দুর্গমতা ও সচেতনতার অভাবকে কাজে লাগিয়ে রোগীদের চিকিৎসার জন্য একমাত্র ভরসার পাত্র হন কবিবাজ শিব রতন চাকমা। এই কবিরাজ বলেন, ‘আমি তো এ যাবত ধরে কবিরাজি চিকিৎসা করে আসছি। আমার কাছে রোগ পরীক্ষার করার কোনো যন্ত্র নেই। পেট ধরে যা মনে হয় তা দিয়ে চিকিৎসা করি।’
কবিরাজ শিব রতন চাকমা চিকিৎসা শুরুর দুই দিনের মাথায় মৃত্যু হয় ২য় শ্রেণী পড়ুয়া এক মেয়েশিশু সোনি চাকমার।
শিশুটির মা দেবী চাকমা বলেন, ‘কবিরাজ বলেছেন জ্বর ভালো না হলে একের পর এক গ্লাস ঔষধ খাওয়াতে হবে। সে হিসেবে খাওয়াইছি। এক পর্যায়ে মেয়ে বমি করে। কিছুক্ষণ পর মারা যায়।’
ইতিমধ্যে মৃত ব্যক্তিদের রোগের পূর্ববর্তী তথ্য সংগ্রহ করেছে বরকল উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। বর্তমান রোগীদের তথ্য সংগ্রহ করে ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, এটি কোনো অজ্ঞাত রোগ নয়।
রাঙামাটির বরকল উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মংক্যছিং সাগর ইনডিপেনডেন্টকে বলেন, ‘এটি অজ্ঞাত রোগ নয়। স্বাভাবিক রোগ। যাদের মৃত্যু হয়েছে প্রত্যেকের রোগ ছিল। অপুষ্টি ও অপচিকিৎসায় মৃত্যু হয়েছে একজনের।



