
মানিকগঞ্জের শিবালয়ে নিজের তৈরি আরসি উড়োজাহাজ আকাশে উড্ডয়ন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তরুণ উদ্ভাবক জুলহাস মোল্লা (২৮)। জুলহাস পেশায় একজন ইলেকট্রনিক মিস্ত্রি। তাঁর উড়োজাহাজ উড্ডয়ন দেখতে যমুনার তীরে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা উৎসুক জনতার ঢল নামে।
আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সব প্রস্তুতি শেষে উপজেলার জাফরগঞ্জ এলাকায় যমুনার চরে তার নিজ হাতে তৈরি উড়োজাহাজ নিয়ে আকাশে সফল উড্ডয়ন করেন। মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শত শত মানুষ উড়োজাহাজের এমন উদ্ভাবন দেখতে যমুনার পাড়ে ভিড় জমান। শখের উড়োজাহাজটির নাম দিয়েছেন স্কে বাইক ৩ (skay bike 3)। উড়োজাহাজটি তিনি নিজেই ড্রাইভ করে আকাশে উড়িয়েছেন। ইতিমধ্যে তার উড়োজাহাজ উড়ানোর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে প্রশংসায় ঝড় উঠে।
পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলার দৌলতপুর উপজেলার বাঘুটিয়া এলাকায় বাড়ি হলেও নদী ভাঙনের কারণে বর্তমানে শিবালয় উপজেলার ষাইটঘর তেওতা (বিলপাড়া গ্রামে) বাড়ি করে পরিবারসহ বসবাস করছেন জুলহাস। বাবা কৃষক জলিল মোল্লা। ছয় ভাই, দুই বোনের মধ্যে জুলহাস পঞ্চম। জিয়নপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৪ সালে এসএসসি পাস করেন। অর্থাভাবে আর পড়া হয়নি তাঁর। ঢাকায় ইলেকট্রিক মিস্ত্রির কাজ করেন।
কিন্তু শৈশব থেকেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি ঝোঁক ছিল জুলহাসের। পড়াশোনার ইতি টানলেও উদ্ভাবনী চিন্তা তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াত। ২০২১ সালে যখন প্রথমবারের মতো আরসি (রিমোট কন্ট্রোল) প্লেন দেখেন, তখন ঠিক করেন নিজে একটা প্লেন বানাবেন। এরপর শুরু হয় নিরলস গবেষণা। ইউটিউব, বই-পত্র ঘেঁটে ধাপে ধাপে শিখতে থাকেন প্লেন তৈরির খুঁটিনাটি। যন্ত্রাংশ জোগাড় করা থেকে শুরু করে নকশা তৈরি, কাঠামো সাজানো, সবকিছু করেছেন নিজেই। দীর্ঘ সময়ের প্রচেষ্টার পর অবশেষে সফলতা এল। নিজের তৈরি সেই প্লেনে চড়ে আকাশে ওড়েন তিনি।

জুলহাস মোল্লা বলেন, ‘এসএসসির পর আর লেখাপড়া করা হয়নি। পেশায় ইলেকট্রনিক মিস্ত্রি হিসেবে ঢাকায় কাজ করি। চার বছর আগে হঠাৎ মাথায় আসে ছোট ছোট রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে বিমান তৈরি করার। এর কিছুদিন পরে আল্টালাইট বিমান তৈরির কথা মাথায় আসে। কিন্তু তাতে তেমন সফলতা আসেনি। পরে গত এক বছর চেষ্টা করে এই বিমানটি তৈরি করতে সক্ষম হই।’
জুলহাস আরও বলেন, ‘মূলত টাকার জোগান না থাকায় পাম্প ইঞ্জিন, আর অ্যালুমিনিয়াম, এসএস দিয়ে মূলত বিমানটি তৈরি করা হয়। বিমানটি ওজন হয়েছে ১০০ কেজি। গতি পরিমাপের জন্য লাগানো হয়েছে একটি ডিজিটাল মিটার, অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে পাখা তৈরি করা হয়েছে। ইঞ্জিন চলবে অকটেন অথবা পেট্রোল দিয়ে। ঘণ্টায় গতি হবে সর্বোচ্চ ৭০ কিলোমিটার।’
গত কয়েক দিন আগে উড়োজাহাজটি পরীক্ষামূলক সফলভাবে আকাশে উড্ডয়ন করতে সক্ষম হন- জানিয়ে জুলহাস বলেন, ‘আমি জীবনে কোনো দিন বিমানের উঠিনি। বিমানটি তৈরি করে আকাশে উড্ডয়ন করতে পেরে নিজের স্বপ্নও পূরণ করেছি।’
তরুণ উদ্ভাবক জুলহাস আরও বলেন, ‘প্রথম দিকে পরিবার ও এলাকাবাসী আমাকে পাগল মনে করেছে। তবে এখন সবাই উৎসাহ আর বাহবা দিচ্ছে। সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা পেলে এ নিয়ে কাজ করার আগ্রহ আছে।’
জুলহাস জানান, ছেচনা মডেলের উড়োজাহাজটি গত ডিসেম্বর থেকে তৈরির কাজ শুরু হয়। শেষ হয় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে। এরপর বাড়ির পার্শ্ব নমুনা নদীর চরে পরীক্ষামূলকভাবে বিমানটি উড্ডয়ন করার একটি ভিডিও তার নিজের ইউটিউব চ্যানেলে চড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয় ভিডিওটি। এতে এলাকাজুড়ে হৈচৈ পড়ে যায়।
তার সাথে কথা বলে জানা গেছে, পেশায় তিনি একজন ইলেক্ট্রিশিয়ান। ফায়ার এলামের চাকরির পাশাপাশি চার বছর ধরে তিনি উড়োজাহাজ তৈরি করে আকাশে উড়ানোর চেষ্টা করছেন। শখের বসে তিনি প্রায় ৩ বছর পূর্বে একটি খেলনা উড়োজাহাজ তৈরি করে আকাশে উড়িয়ে ছিলেন। সেই থেকেই শখ আর পূরণও করে দেখালেন তিনি। কিন্তু তিনি কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিজেই ড্রাইভ করে আকাশে উড়িয়েছেন উড়োজাহাজটি। এই বিমানের মেটেরিয়াল তৈরিতে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ করেছেন জুলহাস। তবে, তাঁর গত চার বছরে এই কাজের পিছনে প্রায় ৮-১০ লাখ টাকা খরচ করেছেন তিনি। এরই মধ্যে তিনি জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে একটি আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছেন।
জুলহাস মোল্লার বাবা জলিল মোল্লা বলেন, ‘জুলহাস ছোটবেলা থেকে প্লাস্টিকের জিনিস কাটাকাটি করে কিছু বানাতে চায়। জিজ্ঞেস করলে বলতো, একদিন দেখবে আমি কি বানাইছি। সারা দেশের মানুষ দেখবে। গত চার বছর ধরে চেষ্টা করছে প্লেন উড্ডয়নের। প্রতি বছরই যমুনার চরে উড্ডয়নের চেষ্টা করে। এবার সফল হয়েছে। গতকাল ৫০ ফুট ওপরে উড়ছে।’
জুলহাসের ছোট ভাই নয়ন মোল্লা বলেন, ‘শুরু থেকে আমি ভাইয়ার সঙ্গে ছিলাম। সব কাজ আমি সঙ্গে থেকে করেছি। আমরা কোনো সময় দমে যাইনি। গত এক বছর দিনে আমরা পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা বিমান তৈরি করতে গবেষণা ও কাজ চালিয়ে গেছি।’
তেওতা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, ‘জুলসাহ এলাকার কৃতি সন্তান। তার কাজ প্রশংসনীয়। স্বল্প শিক্ষিত একজন ছেলে টেকনিক্যালি কোনো প্রশিক্ষণ নেই এবং কখনো প্লেনে না উঠেও নিজের প্লেন তৈরি করে নিজেই অবতরণ করল। বর্তমান সরকার ও যথাযথ কর্তৃপক্ষ যদি জুলহাসকে সহযোগিতা করে, ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে তাহলে দেশীয় প্রযুক্তিতে এমন প্লেন তৈরি করে দেশ ও জাতিকে সম্মানের সাথে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস।’

উদ্ভাবনী এই কাজের প্রশংসা করে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক ডা. মানোয়ার হোসেন মোল্লা বলেন, ‘এমন উদ্ভাবনী কার্যক্রমে আমি অভিভূত। উড়োজাহাজটি অবতরণের একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মুঠোফোন মাধ্যমে জানতে পারি মানিকগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকার একজন ছেলের তৈরি এ উড়োজাহাজের কথা। তাঁর সাথে যোগাযোগ পর আজ তার (জুলহাস) এলাকায় এসে তাঁকে প্রণোদনা এবং সরকারি সহায়তার দেওয়া যায় কিনা সে বিষয়ে চেষ্টা ও এই প্রযুক্তি বিকাশে প্রশাসন তাঁর পাশে থাকব। প্রাথমিকভাবে কিছু আর্থিক সহযোগিতা করে তাকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।’
আজ মঙ্গলবার সব প্রস্তুতি শেষে চার মিনিট জুলহাস উড়োজাহাজটি আকাশে উড্ডয়ন করে আবার নেমে আসেন। বাতাসের গতি বেশি থাকায় ঝুঁকি এড়াতে আর বেশিক্ষণ উড়োজাহাজটি আকাশে উড্ডয়ন করা সম্ভব হয়নি।



