বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় ক্রেতা পোলিশ ক্লোদিং কোম্পানি এলপিপির কাছে রপ্তানিকারকদের বকেয়া পাওনা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ দ্রুত ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে তারা বলেছেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক বিরোধের কারণে এলপিপি যেন বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত না নেয়।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এলপিপি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পোশাক ক্রেতা এবং বহু রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের অর্ডারের ওপর নির্ভরশীল। তাই রপ্তানিকারকদের ন্যায্য পাওনা আদায়ের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কও সুরক্ষিত রাখা জরুরি।
ড্রেস টু ডেকরের সিইও শেখ উল্লাস জানান, যেই প্রতিষ্ঠান মামলা করেছে সেই এনসা ক্লোদিংয়ের জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে তিনি প্রায় ১৪ মাস দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে এনসা, এলপিপি এবং এলপিপি থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া রাশিয়ান এজেন্ট কেসিএইচ/ফেয়ার ফেস-এর মধ্যকার ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের অনেক ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩-এর আগে কেসিএইচ-এর ব্যবসার ডিজাইন, ডেভেলপমেন্ট, প্রোডাকশন ও পেমেন্ট ব্যবস্থাপনা এলপিপির মাধ্যমে পরিচালিত হতো। পরে এলপিপির উদ্যোগে এনসাকে কেসিএইচ-এর সঙ্গে সরাসরি ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়।
তিনি জানান, এনসা প্রথম ও দ্বিতীয় অর্ডার সফলভাবে সম্পন্ন করে এবং উভয় ক্ষেত্রেই পেমেন্ট পায়। তবে তৃতীয় অর্ডারের পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর পর কেসিএইচ জানায়, মোট পেমেন্টের ৫০ শতাংশ বিলম্বে পরিশোধ করা হবে। এরপর বকেয়া অর্থ আদায় নিয়ে জটিলতা তৈরি হয় এবং এনসা বিভিন্নভাবে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করে। পরবর্তীতে এলপিপির সহযোগিতাও চাওয়া হয়।
শেখ উল্লাস আরও জানান, ব্যবসায়িক বিরোধ বা আর্থিক মতবিরোধের সমাধান হওয়া উচিত তথ্য, প্রমাণ এবং আইনসম্মত ও পেশাদার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। আবেগ বা হতাশা থেকে দেওয়া বক্তব্য দীর্ঘমেয়াদে কোনো পক্ষের জন্যই ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না।
তিনি জানান, যে প্রতিষ্ঠান কেসিএইচ মামলা করেছে এলপিপির বিরুদ্ধে, তারা অলরেডি কেসিএইচের কাছ থেকে পেমেন্ট পেয়েছে। আরও পাবে। কিন্তু একই পণ্যের জন্য দুটো প্রতিষ্ঠানের কাছে পেমেন্ট দাবি করা যায় না। দুইটা প্রতিষ্ঠান একই পণ্যের পেমেন্টের জন্য রেসপনসিবল হতে পারে না।
ফোর ডিজাইন গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান বলেন, ‘আমরা চাই না একজনের মিথ্যা মামলার কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হোক। আমরা অবিলম্বে এ অবস্থার সমাধান চাই।’
তিনি বলেন, ‘এনসার অভিযোগ ভিত্তিহীন। তারা টাকা পাবে কেসিএইচের কাছ থেকে, এলপিপির কাছ থেকে না।’
তিনি জানান, দীর্ঘদিন এলপিপির সঙ্গে ব্যবসা করতে গিয়ে তিনি কখনো পেমেন্ট বিলম্বের মুখোমুখি হননি। তার মতে, বর্তমান সংকট মূলত একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও পেমেন্ট ব্যবস্থাপনা নিয়ে তৈরি জটিলতা থেকে উদ্ভূত।
ম্যাগপাই কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেডের হেড অব মার্কেটিং শোয়াইব উদ্দিন খন্দকার বলেন, ‘এলপিপি বাংলাদেশ থেকে অর্ডার কমিয়ে দিলে বা পুরোপুরি সরে গেলে এর প্রভাব শুধু কয়েকটি কারখানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। এতে হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান, দেশের রপ্তানি আয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘অন্যান্য আন্তর্জাতিক ক্রেতার কাছেও বাংলাদেশে ব্যবসায়িক বিরোধের কার্যকর সমাধান নিয়ে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে।’
বিজিবিএর উপদেষ্টা মো. মফিজ উল্লাহ বাবু বলেন, ‘এলপিপি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম বড় ইউরোপীয় ক্রেতা। বকেয়া পাওনা নিয়ে তৈরি অনাকাঙ্ক্ষিত বিরোধ এমন পর্যায়ে যাওয়া উচিত নয়, যাতে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।’
তিনি বলেন, ‘এই সংকটের সমাধানে সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।’
ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে রপ্তানি চুক্তিতে আরও শক্তিশালী পেমেন্ট সুরক্ষা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা রাখারও আহ্বান জানান তিনি।



