
সায়েন্স ফিকশন জনরা বর্তমানের বৈশ্বিক চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যতম মুক্তো। চ্যাটজিপিটির এই যুগে সায়েন্স ফিকশনের ঘরানা পছন্দ করা দর্শকের সংখ্যা ক্রমশই বাড়ছে। বিশেষ করে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো আসার পর এই প্রবণতা আরও বেড়েছে। বেড়ে গেছে এ ধরনের ছবি নির্মাণের হারও। এবার তাতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হয়ে এসেছে ‘দ্য ক্রিয়েটর’। নিন্দুকেরাও বলছেন, খাঁটি সায়েন্স ফিকশন সিনেমার অন্যতম উদাহরণ এটি!
সায়েন্স ফিকশন সিনেমার কাহিনিতে স্বাভাবিকভাবেই এখন বেশি দেখানো হয় এলিয়েনদের, না–হয় রোবট বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কারণে সৃষ্ট বিপদকে। এসবের ব্যতিক্রম যে একদম নেই, তা নয়। তবে সেই সংখ্যা হাতে গোনা যায়। আর এই জায়গাটিতেই একেবারে আলাদা ‘দ্য ক্রিয়েটর’।
গ্যারেথ এডওয়ার্ডস পরিচালিত ছবিটির গল্প এগিয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ও তার স্রষ্টা মানুষের দ্বৈরথের মধ্য দিয়েই। দেখা যায়, এআই–এর হোতা বা ‘নির্মাতা’কে ধরতে মানুষ চালাচ্ছে বিশেষ অভিযান। তেমনই একটি অভিযানে কাজ করছিল জোশুয়া টেইলর নামের চরিত্রটি। আন্ডারকভার এজেন্ট হিসেবে কাজ করা জোশুয়া গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়ে প্রেমে পড়ে যায় বিরোধীপক্ষের মায়া’র। প্রেমিকাকে হারাতেও হয় শুরুতেই। আর তাতেই বদলে যায় জোশুয়ার জীবন। অপরাধবোধ ও বিষণ্নতার দুনিয়ায় প্রবেশ ঘটে তার। কারণ মায়ার সঙ্গে সঙ্গে যে অনাগত সন্তানকেও হারিয়ে ফেলে জোশুয়া।

সায়েন্স ফিকশন হলেই সিনেমায় ভিএফএক্সের কাজ দেখিয়ে বুঁদ করে ফেলার একটা সাধারণ প্রবণতা চোখে পড়ে। তবে দ্য ক্রিয়েটর এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। ভিএফএক্সের কাজ দেখানো হয়েছে, তবে তা পরিমিত। বরং এর চেয়ে মানুষের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্পর্ক কতটা মানবিক হতে পারে, সেটিরই একটি কল্পিত দৃষ্টান্ত দেখানোর চেষ্টা হয়েছে। তাই জোশুয়া যখন জানতে পারল, সরকার যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাজাত ‘অস্ত্র’কে ধ্বংস করতে তাকে পাঠিয়েছে, সেই অস্ত্র আসলে একটি এআই শিশু এবং সেটি নির্মিত হয়েছে জোশুয়া ও মায়ার অনাগত সন্তানের আদলে—তখন সে এক অদ্ভুত দ্বিধায় পড়ে যায়। সে কেন জানি ওই এআই শিশুটির মধ্যে নিজের সন্তানকে খুঁজে বেড়াতে থাকে, মমতার বাঁধনে আটকে পড়ে পুরোপুরি। আর এভাবেই এআই ও মানুষের মধ্যে এক অপরূপ মায়ার সম্পর্কের মোড়ক উন্মোচন হয়। এর মধ্যে ঢোকে মানুষের ভুলের বলি এআই’কে করা এবং মানুষের স্বার্থপরতার উদাহরণ। শেষ অবধি এই সবকিছু মিলে যায় এক বিন্দুতে, পৃথকীকরণের প্রবণতা মুছে ফেলার দামামা বাজায়।
দ্য ক্রিয়েটর সিনেমার সাউন্ড ডিজাইন দুর্দান্ত। সিনেমাটোগ্রাফি লা জওয়াব। হ্যাঁ, চিত্রনাট্যে কিছু অসামঞ্জস্য আছে, তার সব চিত্রায়নও আপনার পছন্দ না হতে পারে। কিন্তু সায়েন্স ফিকশন বলতে যারা কেবল ভিএফএক্সের জারিজুরি আর ধুন্ধুমার মারামারি বুঝতে চান না, গল্প খোঁজেন, তাঁদের জন্য ‘দ্য ক্রিয়েটর’ দেখা উপযুক্ত বটে।

এই সিনেমায় শিল্পীদের অভিনয় দেখেও আফসোস জাগবে না। প্রধান চরিত্র জোশুয়া টেইলর রূপে জন ডেভিড ওয়াশিংটন অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। ‘নির্মাতা’ চরিত্রে গেমা চ্যানও নিখুঁত ছিলেন।
এরই মধ্যে এবারের অস্কার আসরে দুটি বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছে দ্য ক্রিয়েটর। সায়েন্স ফিকশন সিনেমা হিসেবে নিয়ে সেই দুটি বিভাগ কী কী, একটু অনুমান করবেন নাকি? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন—বেস্ট সাউন্ড ও বেস্ট অ্যাচিভমেন্ট ইন ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস। তবে এসব মাথায় না নিলেও, এটুকু বলা যায় যে, ছবিটি দেখলে বিরক্ত হবেন না। গতিশীল গল্পের কারণে সময়ও নষ্ট হবে না। আর জেনে রাখবেন, এই সিনেমার নিন্দামন্দ করা সমালোচকেরাও রায় দিয়েছেন এই বলে যে, সায়েন্স ফিকশন মুভি হিসেবে দ্য ক্রিয়েটর একেবারে খাঁটি!
তবে আর অপেক্ষা কেন? দেখেই ফেলুন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মেও চলে আসা দ্য ক্রিয়েটর। নিরাশ হতে হবে না, সেটি নিশ্চিত।


এই পৃথিবীতে ফুলেরা যেভাবে নিহত হয়
বোমা বানাতে গিয়ে যাঁর মনটাই উড়ে গিয়েছিল
যে মস্তিষ্ক শিশুর, জীবনটা মনস্টারের
