মোটামুটি সিনেমা নিয়ে খোঁজখবর রাখেন, এরকম সবারই অন্তত একবার হলেও দেখা হয়েছে ম্যাট্রিক্স সিরিজের মুভিগুলো। কিন্তু পুরোপুরি বুঝে উঠতে পেরেছেন কতজন, এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তাই ম্যাট্রিক্স ট্রিলোজি নিয়ে কথা বলার শুরুতে বরং সহজ ভাষায় একটু বুঝে নেই, ম্যাট্রিক্স জিনিসটা আসলে কী?
যদি এককথায় কেউ বলার চেষ্টা করে যে ম্যাট্রিক্স হলো একটা ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি বা ডিজিটাল পরাবাস্তবতা, তাহলে আসলে বোঝা যায় না কিছুই। প্রশ্ন ওঠে এই রিয়্যালিটি কে বানালো, কেনই বা বানালো? এই প্রশ্নের উত্তর কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় ট্রিলোজির প্রথম পর্ব দ্য ম্যাট্রিক্সে মরফিয়াস যখন নিওকে ব্রিফ করে।
কিন্তু আরও ভালো করে বুঝতে হলে দেখতে হবে ম্যাট্রিক্স ফ্র্যানচাইজির এনিমেটেড সিরিজ ‘এনিম্যাট্রিক্স’-এর প্রথম দুই পর্ব ‘দ্য সেকেন্ড রেনেসাঁ পার্ট ১ ও ২’। গল্পটা মোটামুটি এরকম: বিংশ শতকের মাঝামাঝিতে যখন মানুষ তার সভ্যতার উৎকর্ষে, তখন তারা মানুষের সেবার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন যন্ত্রপাতি তৈরি করতে শুরু করে। কিন্তু একসময় এআই তার ‘সিঙ্গুলারিটি পয়েন্টে’ পৌঁছে, অর্থাৎ তারা নিজেরাই আরও শক্তিশালী এআই তৈরি করতে শুরু করে। একটা পর্যায়ে এই যন্ত্রগুলিই মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং শুরু হয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।
স্বাভাবিকভাবেই মানুষ অত্যাধুনিক সব মেশিনের সঙ্গে অসম যুদ্ধে হারতে বসে এবং একসময় মরিয়া হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় ‘অপারেশন ডার্ক স্টর্ম’-এর মাধ্যমে পুরো আকাশকে কালো ন্যানাইট দিয়ে ঢেকে দিতে। এতে তারা যন্ত্রদানবদের একমাত্র এনার্জি সোর্স ‘সোলার পাওয়ার’-কে বন্ধ করতে পারলেও, শিগগিরিই এআই বিকল্প সোর্স হিসেবে স্বয়ং মানব দেহকেই ব্যবহার করতে শুরু করে। শুরুতে তারা এ কাজে যুদ্ধে নিহত বা বন্দিদের ব্যবহার করলেও, যখন মানব জাতির চূড়ান্ত পতন ঘটে, তখন তারা কৃত্রিমভাবে মানুষ উৎপাদন করতে শুরু করে, অনেকটা জমি চাষের মতো।
আর এই ‘উৎপাদিত’ মানুষদের ব্রেইন ওয়েভ সচল রাখতে তারা তৈরি করে একটি ভার্চুয়াল পৃথিবী, যেখানে সত্যি পৃথিবীর মতোই হাসি, কান্না, দুঃখ-ভালোবাসা সবই রয়েছে। সত্যি পৃথিবীর কোনো একটি পডে তরলে ডুবানো মানুষের মস্তিষ্ক ভার্চুয়াল পৃথিবীটাকেই বিশ্বাস করে বাস্তবতা হিসেবে। সেখানেই তারা ছোট থেকে বড় হওয়ার এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের মতো সব উদ্দীপনা লাভ করে। আর যত বেশি উদ্দীপিত হয় তাদের মস্তিষ্ক, ততই বেশি বিদ্যুৎ তারা তৈরি করে যন্ত্রদানবদের বাঁচিয়ে রাখতে। ম্যাট্রিক্স নাহয় তৈরি হলো।
কিন্তু এর পরে কী? সিনেমাতে যে গল্পগুলো আমরা দেখি, তা কখন ঘটে, কেন ঘটে? সিনেমার শুরুতে মরফিয়াস নিওকে জানায়, তারা সম্ভবত ২১৯৯ সালে অবস্থান করছে। কিন্তু দ্বিতীয় পর্ব ‘ম্যাট্রিক্স রিলোডেড’-এ আর্কিটেক্টের সঙ্গে নিওর কথপোকথন থেকে আমরা জানতে পারি, তারা এই মুহুর্তে ম্যাট্রিক্সের ষষ্ঠ সাইকেলে অবস্থান করছে। অর্থাৎ এর আগে ম্যাট্রিক্স আরও পাঁচবার আবর্তিত হয়েছে এবং প্রতিবারই ধ্বংস করা হয়েছে। এর পেছনে কারণ হলো মানুষের মুক্তির অদম্য বাসনা।
প্রতিটি ম্যাট্রিক্সেই কিছু মানুষ ভার্চুয়াল জগত থেকে পালিয়ে আসার চেষ্টা করে এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত আসল পৃথিবীর কেন্দ্রের কাছে গড়ে তোলা ভূ-গর্ভস্থ শহর ‘জিওন’-এ গিয়ে অন্য মানুষদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যন্ত্রদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। প্রতিবারই এই প্রতিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যে প্রতি ৪০ বছরে একবার আর্কিটেক্ট বাধ্য হন জিওন এবং তার বাসিন্দাদের ধ্বংস করতে এবং ম্যাট্রিক্সকে ভেঙ্গে নতুন করে শুরু করতে। কেবল অল্প কয়েকজন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা হয়।
ম্যাট্রিক্সের জনক এআই ‘দ্য আর্কিটেক্ট’ প্রথমে শুধুই হাসি, আনন্দ ও ভোগবিলাস দিয়ে ম্যাট্রিক্স তৈরি করেছিলেন। কিন্তু মানুষের বিদ্রোহের কারণে তিনি দ্বিতীয় সংস্করণ বানান, যা সত্যিকারের মানব সভ্যতার মতো। তৃতীয় এবং পরবর্তী ম্যাট্রিক্সও সফল হয়নি।
তৃতীয় পর্বে ‘দ্য ওয়ান’ হওয়ার জন্য নিওর গল্প, ট্রিনিটির প্রেম, এজেন্ট স্মিথের মৃত্যু সবই ছিল ওরাকলের পরিকল্পনার অংশ। মানুষকে বাঁচাতে এবং সিস্টেমে ভারসাম্য রাখার জন্যই এজেন্ট স্মিথকে ‘ফ্রি ভাইরাস’ হিসেবে শক্তিশালী করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। শেষপর্যায়ে নিও এক্স মেশিনার সঙ্গে চুক্তি করে এবং স্মিথকে ধ্বংস করার মাধ্যমে মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে শান্তি আসে। এর ফলে প্রথমবারের মতো মানুষ ও জিওন ধ্বংস ছাড়াই ম্যাট্রিক্স রিলোড করা সম্ভব হয়।
ম্যাট্রিক্সের কাহিনি যতটা স্মিথ বনাম নিওর, ঠিক ততটাই আর্কিটেক্ট বনাম ওরাকলেরও। সপ্তম সাইকেলের শুরুতে আর্কিটেক্ট ওরাকলের সঙ্গে বলেন, ও একটু বেশি ঝুঁকি নিয়েছেন। ওরাকল বলেন, পরিবর্তন আনতে হলে ঝুঁকি নেওয়াই প্রয়োজন। এরপর থেকে মানুষ ও যন্ত্র সহাবস্থান বজায় রাখে। ম্যাট্রিক্স চলতে থাকে তার নিজের গতিতে।
চতুর্থ পর্ব ‘ম্যাট্রিক্স রিজারেকশন’ আসে এর ৭০ বছর পরের গল্প নিয়ে। কিন্তু সে গল্প হয়ত পরে অন্য কোনো লেখায় আলোচনা করা যাবে। আগামী কিস্তিতে আমরা দেখব কেন ম্যাট্রিক্স এত আলোচিত এবং জনপ্রিয়, এবং চলচ্চিত্র অঙ্গনে কেন এটিকে মাইলফলক হিসেবে ধরা হয়।
সিনেমা:
দ্য ম্যাট্রিক্স (১৯৯৯)
দ্য ম্যাট্রিক্স রিলোডেড (২০০৩)
দ্য ম্যাট্রিক্স রেভল্যুশনস (২০০৩)
পরিচালনা: লানা ওয়াচোস্কি ও লিলি ওয়াচোস্কি
চিত্রনাট্য: লানা ওয়াচোস্কি ও লিলি ওয়াচোস্কি
অভিনয়শিল্পী: কিয়ানু রিভস, লরেন্স ফিশবার্ন, ক্যারি-অ্যান মস, হিউগো উইভিং, জাদা পিঙ্কেট স্মিথ, মনিকা বেলুচ্চি প্রমুখ
ধরন: সাই-ফাই, অ্যাকশন, দার্শনিক থ্রিলার
ভাষা: ইংরেজি
মুক্তি: ১৯৯৯–২০০৩



