শীতকাল এলেই শিশুর স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে মা বাবা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কারণ এ সময় ঠান্ডা সর্দির পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে পাতলা পায়খানা প্রকট হয়ে দেখা দেয়।
ডায়রিয়া কখন বলব?
পাতলা পায়খানা যদি দিনে তিনবার অথবা তারও বেশি হয়, তখন তাকে আমরা ডায়রিয়া বলে থাকি।
ডায়রিয়ার প্রকারভেদ
ডায়রিয়াকে আমরা তিনভাগে ভাগ করতে পারি। যেমন:
১.একিউট ওয়াটারি ডায়ারিয়া: ডায়রিয়ার স্থায়িত্ব ১৪ দিনের কম হলে।
২.পারসিসটেন্ট ডায়রিয়া: স্থায়িত্ব ১৪ দিন অথবা বেশি দিন হলে।
৩. ক্রনিক ডায়রিয়া : ডায়রিয়ার স্থায়িত্ব ২৮ দিনের বেশি হলে।
আজকে আমরা একিউট ডায়রিয়া নিয়ে আলোচনা করব। একিউট ওয়াটারি ডায়ারিয়া সাধারণত ব্যাকটেরিয়া অথবা ভাইরাস সংক্রমণে হয়ে থাকে। তবে শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে কমন হল রোটা ভাইরাল ডায়ারিয়া।
উপসর্গ কি
রোটা ডায়রিয়া শুরু হয় সাধারণত বমি দিয়ে। বমি একটু কমলেই শুরু হয় অনবরত পানির মত পাতলা পায়খানা হওয়া। মা বাবারা অনেক সময় বলেন, যা খাওয়াচ্ছি ঠিক তাই পায়খানা দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। ডায়রিয়ার সঙ্গে জ্বর হয়, শরীর দুর্বল হয়ে যায়, খাওয়ার রুচি কমে যায়, শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। এই ডায়রিয়া থাকতে পারে ৭ দিন পর্যন্ত।
কীভাবে আক্রান্ত হয়?
রোটা ভাইরাস প্রধানত মুখগহবর দিয়ে খাদ্যনালীতে প্রবেশ করে। এই ভাইরাস আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে এবং একজনের কাছে থেকে অন্যজনের দেহে প্রবেশ করে। সংক্রমিত পানি, খাবার, খেলনা এমনকি বিভিন্ন আসবাবপত্র থেকেও এই রোগের জীবাণু ছড়াতে পারে। রোটা ভাইরাসের সংক্রমণ হওয়ার ২৮ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়।
রোটা ভাইরাসের ভয়াবহতা
রোটা ভাইরাস ডায়রিয়ার কারণে সারা বিশ্বে প্রতিবছর ৬ লাখের ও বেশি শিশুর মৃত্যু হয়। বাংলাদেশের প্রতিবছর প্রায় ২৪ লক্ষ শিশু রোটা ভাইরাসজনিত পরিপাকতন্ত্রের প্রদাহে ভোগে। প্রতিবছর ৩ লাখেরও বেশী শিশু মারাত্মক সংক্রমণে আক্রান্ত হয়, যার মধ্যে প্রায় অনেক শিশুর মৃত্যু হয়।
চিকিৎসা
রোটা ডায়ারিয়া একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এখানে অ্যান্টিবায়োটিকের কোন ভূমিকা নেই। শরীরের পানিশূন্যতা পূরন করার জন্য ঘন ঘন খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে। ২ বছরের কম হলে প্রতিবার পায়খানার পর ১০-২০ চামচ, ২ বছরের বেশি হলে ২০-৪০ চামচ খাওয়ার স্যালাইন বা ওরস্যালাইন খাওয়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই ৫০০ মিলি পানিতে পুরো এক প্যাকেট ওরস্যালাইন গুলিয়ে খাবার স্যালাইন তৈরি করতে হবে। এর সঙ্গে ডাবের পানি, ভাতের মাড়, চিড়ার পানি,কাঁচাকলা ভর্তা খাওয়াতে পারলে ভালো হয়। ৬ মাসের কম বয়সের শিশুদের ক্ষেত্রে মায়ের বুকের দুধ চালিয়ে যাওয়া বাঞ্ছনীয়।
কখন হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে?
শিশু নেতিয়ে পড়লে, মুখ শুকিয়ে গেলে, প্রস্রাব কমে গেলে, মাথা ডেবে গেলে, মুখে স্যালাইন খেতে না পারলে হাসপাতালে বা ক্লিনিকে ভর্তি করাতে হবে। এ সময় শিরাপথে স্যালাইন দিয়ে পানিশূন্যতা পূরণ করতে হবে।
প্রতিষেধক
রোটা ভাইরাল ডায়রিয়া থেকে রক্ষা পেতে দুইভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। যেমন:
প্রথমত, পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন, শিশু যে সমস্ত জিনিসপত্র ব্যবহার করে সেগুলো সবসময় পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রাখা। শিশু যেসব খেলনা নিয়ে খেলা করে তাও পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রাখা এবং আপনার হাত, এমনকি খাবার তৈরি করার স্থান সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা। সর্বোপরি শিশুদের ৬ মাস পর্যন্ত শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো।
দ্বিতীয়ত, শিশুকে রোটা ভাইরাসের টিকা খাওয়ানো। বর্তমানে প্রতিষেধক হিসেবে রোটা ভাইরাসের টিকা বাংলাদেশে পাওয়া যায়।
কেন এই টিকা জরুরি?
গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নত জীবনযাত্রা মেনেও অনেক ক্ষেত্রে এই রোগ প্রতিরোধ করা যায় না। সর্বোপরি ২ মাস থেকে ৬ মাস বয়সের শিশুদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই এই বয়সের শিশুদের রোটাভাইরাল ডায়রিয়ায় মুখে খাবার স্যালাইন দিয়ে সুস্থ করে তোলা খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিরাপথে স্যালাইন দিয়ে পানিশূন্যতা পূরণ করতে হয়। তাই এই টিকার বিকল্প নেই।
টিকা কখন দিতে হবে?
রোটা ভাইরাসের টিকা দিতে হবে দেড় মাস থেকে ছয় মাসের মধ্যে। এই টিকা মুখে খাওয়ানো হয়। প্রথম ডোজ দেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ কমপক্ষে ১ মাস পর দিতে হয়। এই টিকা দিলে রোটা ভাইরাসের কারণে ডায়রিয়া হবে না। শিশু রোটা ভাইরাসজনিত ডায়রিয়ার কারণে মৃত্যু থেকে রক্ষা পাবে। সুতরাং শিশুদের জীবন রক্ষার্থে তাদের পরিচর্যার পাশাপাশি রোটা ভাইরাস ডায়রিয়া থেকে পরিত্রাণ পেতে সময়মতো টিকা দিয়ে শিশুদের ডায়রিয়া থেকে রক্ষা করুন।
অন্যান্য ডায়রিয়ার মধ্যে পাতলা পায়খানা যদি চিড়ার পানির মত পাতলা হয় তাহলে সেটা কলেরা, যদি পায়খানার সঙ্গে রক্ত, আম (মিউকাস) যায় তাহলে সেটা সিগেলা সালমোনেলা, ইকোলাই জাতীয় ব্যাকটেরিয়ার কারণে সাধারণত হয়ে থাকে।
লেখক: রেসিডেন্ট ডাক্তার, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউট।


যেভাবে বুঝবেন শিশুর নিউমোনিয়া হয়েছে
শিশুর সকালের খাবারে কী দেবেন
শীতকালে অসুখ থেকে শিশুকে রক্ষায় যা করবেন
