অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার একটি নিউরোডেভেলপমেন্টাল (স্নায়বিক বৈকল্য) অবস্থা, যা ব্যক্তির সামাজিক যোগাযোগ, আচরণ ও সংবেদনশীলতার ক্ষেত্রে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে ১ জন অটিজম বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মায়। বাংলাদেশে আনুমানিক ১৭ লাখেরও বেশি মানুষ অটিজম স্পেকট্রামে রয়েছেন।
অটিজম কোনো রোগ নয়, বরং এটি মস্তিষ্কের গঠন ও বিকাশের একটি স্বতন্ত্র ধরণ। তবে এই বৈশিষ্ট্যের মানুষদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, সহায়ক পরিবেশ ও সমন্বিত প্যালিয়েটিভ কেয়ার। বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি দিবস, যা প্রতি বছর ২ এপ্রিল পালিত হয়।
অটিজম সচেতনতা
বাংলাদেশসহ বৈশ্বিক পরিসরে অটিজম সম্পর্কে ভুল ধারণা ও কুসংস্কার এখনও বিদ্যমান। অনেক পরিবার লজ্জা বা সমাজের ভ্রান্ত ধারণার কারণে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সদস্যদের গোপন রাখেন। অথচ প্রারম্ভিক চিহ্নিতকরণ, থেরাপি ও শিক্ষার মাধ্যমে এদের দক্ষতা বিকাশ সম্ভব।
প্রারম্ভিক হস্তক্ষেপ: ৩ বছর বয়সের মধ্যে চিহ্নিতকরণ ও থেরাপি শুরু করলে ৮০ শতাংশের ক্ষেত্রে উন্নতি লক্ষ্য করা যায়। (সূত্র: সিডিসি, ২০২৩)।
শিক্ষার অধিকার: বাংলাদেশে ২০১৯ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে অটিজম আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষা ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে।
প্যালিয়েটিভ কেয়ার
অটিজম একটি আজীবন অবস্থা। তাই শুধু চিকিৎসা নয়, জীবনব্যাপী সমর্থন ও যত্ন প্রয়োজন। এখানেই প্যালিয়েটিভ কেয়ারের ভূমিকা অপরিসীম। এখানে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে জীবনমান উন্নত করা হয়।
প্যালিয়েটিভ কেয়ারের স্তম্ভ
১. চিকিৎসা সহায়তা: স্পিচ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি ও সেন্সরি ইন্টিগ্রেশন।
২. পরিবারকেন্দ্রিক কাউন্সেলিং: অভিভাবকদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও প্রশিক্ষণ।
৩. শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন: বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করা।
৪. সামাজিক অন্তর্ভুক্তি: কমিউনিটিতে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অর্জন ও চ্যালেঞ্জ
১. বাংলাদেশ ২০১৯ সালে জাতীয় অটিজম নীতি গ্রহণ করে। তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়।
২. সেবার অপ্রতুলতা: গ্রামীণ এলাকায় বিশেষায়িত থেরাপি সেন্টার ও প্রশিক্ষিত কর্মীর অভাব।
৩. আর্থিক সীমাবদ্ধতা: থেরাপি ও শিক্ষার খরচ বহন করতে না পারা পরিবারগুলোর জন্য ঝুঁকি।
৪. সামাজিক সংকীর্ণতা: বিবাহ, চাকরি বা সামাজিক অনুষ্ঠানে বৈষম্য।
প্যালিয়েটিভ কেয়ার
অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য সমাজভিত্তিক (কমিউনিটিবেসজ) প্যালিয়েটিভ কেয়ারের সফল মডেল গড়ে তুলতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ জরুরি–
১. কমিউনিটি ক্লিনিক সম্প্রসারণ: উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অটিজম স্ক্রিনিং ও বেসিক থেরাপি সুবিধা চালু করা।
২. অভিভাবক সাপোর্ট গ্রুপ: স্থানীয় পর্যায়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় ও মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদান।
৩. বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ: সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে কারিগরি শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন।
৪. সামাজিক প্রচারণা: মিডিয়া ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অটিজম বিষয়ক কর্মশালা আয়োজন।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে অটিজম সহায়ক নীতিমালা ও প্যালিয়েটিভ কেয়ার সিস্টেম প্রশংসনীয়। উদাহরণস্বরূপ, সুইডেনে ‘LSS আইন’ অনুযায়ী, অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিরা ব্যক্তিগত সহকারী পেয়ে থাকেন। ভারতে ‘ন্যাসকম ফাউন্ডেশন’ আইটি সেক্টরে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। বাংলাদেশে এরকম মডেল করা যেতে পারে।
অঙ্গীকার
১. অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিরা সমাজের বোঝা নয়, বরং তারা আমাদের বৈচিত্র্যেরই অংশ। তাদের সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন।
২. সহানুভূতির পরিবর্তে সম্মান: ‘দয়া’ নয়, ‘সমঅধিকার’ ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠন।
৩. নীতি বাস্তবায়ন: জাতীয় অটিজম নীতির বাজেট বরাদ্দ ও মনিটরিং জোরদার করা।
৪. যুব সমাজের ভূমিকা: স্কুল-কলেজে অটিজম অ্যাওয়ারনেস ক্লাব গঠন।
বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস শুধু একটি দিন নয়, এটি আমাদের দৈনন্দিন চর্চার হাতিয়ার। আসুন, অটিজমকে বুকে ধারণ করি, প্যালিয়েটিভ কেয়ারের মাধ্যমে গড়ে তুলি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ।
লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সিলর, সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার



