কর্মক্ষেত্রে বাড়ছে মানসিক চাপ, কী করবেন?

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম

আধুনিক কর্মজীবন বাইরে থেকে যতটা ঝকঝকে দেখায়, ভেতরে ততটাই চাপ ও অনিশ্চয়তায় ভরা। প্রতিদিনের কাজের চাপ, সময়মতো কাজ শেষ করার তাড়া। এছাড়াও রয়েছে চাকরি টিকে থাকার দুশ্চিন্তা। সব মিলিয়ে অনেক কর্মী নীরবে মানসিক চাপে ভুগছেন। আগে এসব সমস্যা ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখা হলেও এখন তা বড় সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য এখন শুধু ব্যক্তিগত সুস্থতার বিষয় নয়। এটি জনস্বাস্থ্যের একটি বড় সংকট।

চোখের সামনে ঘটছে, তবু অদৃশ্য

কর্মক্ষেত্রে এই সংকট অনেক সময় চোখের সামনেই ঘটছে, কিন্তু তা ধরা পড়ছে না। সহকর্মীরা দেখছেন, কেউ হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যাচ্ছে, কেউ কাজে মনোযোগ দিতে পারছে না, কেউ অকারণে বিরক্ত হচ্ছে। আবার কেউ মিটিংয়ের মাঝেই হঠাৎ অস্বস্তি অনুভব করছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, বুক ধড়ফড় করছে। যা আসলে আতঙ্কজনিত সমস্যা।

অনেকে কাজের চাপ সহ্য করতে না পেরে চুপচাপ ওয়াশরুমে গিয়ে কাঁদছেন। কিন্তু বাইরে ফিরে এসে আবার স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছেন। কারণ অনেক জায়গায় এখনো মানসিক সমস্যার কথা বলাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রের অতিরিক্ত চাপ মানুষকে চরম সিদ্ধান্তের দিকেও ঠেলে দিচ্ছে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। বরং একটি বড় সমস্যার ইঙ্গিত।

সমস্যার পরিধি বাড়ছে দ্রুত

ওয়ান্ড হেলথ অর্গানাইজেশন তথ্য অনুযায়ী, উদ্বেগ ও বিষণ্নতার কারণে প্রতি বছর বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়। কিন্তু এই সংখ্যার বাইরে রয়েছে অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিগত কষ্ট, যা পরিসংখ্যানে পুরোপুরি ধরা পড়ে না।

অনেক কর্মী রাতে ঘুমাতে পারেন না। কেউ কাজের মূল্যায়ন নিয়ে এতটাই দুশ্চিন্তায় থাকেন যে কয়েক দিন ধরে ঠিকমতো বিশ্রাম নিতে পারেন না। কেউ ক্লায়েন্টের সামনে কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। আবার কেউ মাসের পর মাস অতিরিক্ত কাজ করে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।

কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে

কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের সীমারেখা ধীরে ধীরে মুছে যাওয়া। আগে অফিস শেষে ব্যক্তিগত সময় থাকত। এখন মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের কারণে কাজ সব সময় সঙ্গে থাকে।

এর পাশাপাশি রয়েছে-

  • দীর্ঘ সময় কাজ করার চাপ।
  • সব সময় অনলাইনে থাকার প্রত্যাশা।
  • হঠাৎ চাকরি হারানোর ভয়।
  • নতুন প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা।
  • কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ও লক্ষ্য পূরণের চাপ।

করোনা মহামারির সময় ঘরে বসে কাজের অভ্যাস তৈরি হলেও পরে অফিসে ফেরার সময় নতুন করে মানিয়ে নেওয়ার চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে মানসিক চাপ আরও বেড়েছে।

শুধু ‘ভালো থাকুন’ বললেই হয় না

অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের মানসিক চাপ কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। যেমন যোগব্যায়াম ক্লাস বা মেডিটেশন সেশনের আয়োজন করে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান ‘নিজের যত্ন নিন’-এ ধরনের বার্তা দিচ্ছেন কর্মীদের।

এসব উদ্যোগ একেবারে অপ্রয়োজনীয় নয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এগুলো মূল সমস্যার সমাধান হয় না। কারণ যদি কর্মপরিবেশই অস্বাস্থ্যকর হয়, তাহলে সামান্য ব্যায়াম বা মেডিটেশন দিয়ে সেই চাপ দূর করা যায় না।

ধরা যাক, একজন কর্মীকে প্রতিদিন ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করতে হচ্ছে। তার ওপর আবার অযৌক্তিক সময়সীমা দেওয়া হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে তাকে ‘নিজের যত্ন নিন’ বলা বাস্তবসম্মত সমাধান নয়।

মানসিক সমস্যা আসলে কী

অনেকেই এখনো মনে করেন, মানসিক চাপ বা উদ্বেগ খুব সাধারণ বিষয়। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন, এগুলোর অনেকটাই গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হতে পারে।

উদ্বেগজনিত সমস্যা, বিষণ্নতা বা তীব্র মানসিক চাপের জন্য চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে এগুলো আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

যখন কেউ মিটিংয়ের মাঝখানে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, তখন তার শুধু একটু বিশ্রাম নয়। প্রয়োজনে চিকিৎসা সহায়তা দরকার হতে পারে।

যখন কাজ হয়ে ওঠে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন

বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রের চাপ অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ায়। অতিরিক্ত কাজের চাপ, সহকর্মী বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আচরণ, অপমান, চাকরি হারানোর ভয়। এসব বিষয় মানুষের মানসিক অবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

বিশেষ করে কিছু পেশায় এই চাপ বেশি দেখা যায়। যেমন- স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, আইনসহ উচ্চচাপের কাজগুলোতে মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বেশি।

কীভাবে পরিবর্তন আনা সম্ভব

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমস্যার সমাধান ব্যক্তিগত পর্যায়ে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন। প্রথমত কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু মুখে নয়, বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন-

  • প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ রাখা।
  • ম্যানেজারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে তারা কর্মীদের সমস্যার লক্ষণ বুঝতে পারেন।
  • কাজের সময় ও চাপ বাস্তবসম্মত করা।
  • মানসিক অসুস্থতার জন্য ছুটি নেওয়াকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখা।
  • কর্মীদের জন্য নিরাপদ ও সহানুভূতিশীল পরিবেশ তৈরি করা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করা, যেখানে কেউ নিজের সমস্যার কথা বলতে ভয় পাবে না।

নীরবতা ভাঙার সময় এখন

অনেক কর্মী এখনো তাদের সমস্যার কথা প্রকাশ করেন না। কারণ, তারা মনে করেন এতে তাদের ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই ভয় দূর করা জরুরি। প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে সবার মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে যে, মানসিক স্বাস্থ্য কোনো দুর্বলতা নয়। এটি একটি বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়, এটি বর্তমান বাস্তবতা। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এই চাপের মধ্যে কাজ করছেন, অনেকেই নীরবে ভুগছেন।

এই পরিস্থিতিতে শুধু ব্যক্তিকে দায়ী করলে চলবে না। প্রয়োজন পুরো ব্যবস্থার পরিবর্তন। কর্মীরা ইতিমধ্যে নানা উপায়ে জানিয়ে দিচ্ছেন, তাদের সহ্যের সীমা কোথায়। এখন দায়িত্ব প্রতিষ্ঠান ও সমাজের এই সংকটকে গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।

সময় থাকতে সচেতন না হলে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। আর তাই এখনই প্রয়োজন, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা। সেই সাথে বাস্তবসম্মত সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া।

একটি শিশু হারিয়ে গেলে পরিবারের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যায়। অনেকেই বুঝতে পারেন না কী করা উচিত, কোথায় যাওয়া উচিত। আর ঠিক এই আতঙ্কের মুহূর্তেই নষ্ট হয়ে যায় সবচেয়ে মূল্যবান সময়। পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, চলতি...
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর অগ্রগতি হলেও কর্মী নিয়োগের লাইসেন্স মাত্র ২৫ রিক্রুটিং এজেন্সির। খাত সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সীমিত এজেন্সির কারণে বাড়তে পারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। খরচও বাড়তে পারে কর্মীদের।...
চালকের ভুলে বিমানবাহিনীর ৩ সদস্যের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিক ধারণার কথা জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। 
ভারতের দিল্লিতে পুলিশি বাধায় আওয়ামী লীগ নেতাদের কর্মসূচি বাতিল হওয়ায় স্বস্তিতে ঢাকা। ভারত সরকারের এমন পদক্ষেপই প্রত্যাশিত জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, এর ফলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর