বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে হঠাৎ-ই আলোচনায় এসেছে কাবা শরিফের পবিত্র আবরণ কিসওয়া। যুক্তরাষ্ট্রে প্রাপ্ত ‘এপস্টিন ফাইলস’-এ দাবি করা হয়েছে, মক্কার কাবা শরিফের কিসওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু কাপড় জেফ্রি এপস্টিনের কাছে পাঠানো হয়েছিল। খবরটি সামনে আসার পর ধর্মীয় মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে। কী এই কিসওয়া? কেন এটি মুসলমানদের কাছে এত পবিত্র? কেনই বা কাবার আবরণের অংশ পাঠানো নিয়ে এই বিতর্ক।
রিলিজিয়ন নিউজ সাভিসের তথ্য মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বিতর্কিত ধনকুবের ও দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিন মক্কার কাবা শরিফের কিসওয়ার কিছু অংশ কিনেছিলেন। নথিতে দেখা যায়, তিনটি ফ্রেম করা কিসওয়া কাপড় মক্কা থেকে ফ্লোরিডায় পাঠানো হয়েছিল।
কিসওয়া হলো সেই কালো কাপড়, যা কাবা শরিফকে আবৃত রাখে। সোনালি সূচিকর্মে এতে কোরআনের আয়াত লেখা থাকে। মুসলিমদের কাছে কাবা এবং কিসওয়া এক ধরনের পবিত্র প্রতীক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ব্যবসায়ী আজিজা আল-আহমাদি ও আবদুল্লাহ আল-মা’আরী ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে কিসওয়া কাপড়ের এই চালানটি পাঠিয়েছিল।
নথিতে আরও উল্লেখ আছে, কিসওয়ার এই অংশগুলো ‘কমপক্ষে ১ কোটি মুসলিম’ স্পর্শ করেছিলেন। তিনটি অংশের মধ্যে একটি কাবার ভিতরের অংশ থেকে, একটি বাইরে থেকে এবং একটি ব্যবহার না করা নতুন অংশ ছিল। এই টুকরোগুলোকে ‘শিল্পকর্ম’ হিসেবে চিহ্নিত করে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের কার্গো মাধ্যমে পাঠানো হয়। তবে এখনও স্পষ্ট নয়, এপস্টিন কেন এই কাপড়গুলো কিনেছিলেন বা যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন দ্বীপের তার ব্যক্তিগত দ্বীপে কীভাবে ব্যবহার করেছিলেন।
কিসওয়া কেবল একটি কাপড় নয়, এটি মুসলমানদের বিশ্বাস, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক পবিত্র প্রতীক। প্রতি বছর হজের সময় জিলহজ মাসের ৯ তারিখে পুরোনো কিসওয়া খুলে নতুন কাপড় দিয়ে কাবা পুনরায় আবৃত করা হয়। এই দিনে হাজিরা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন। নতুন কিসওয়া পরানোর পর পুরোনো কাপড় ছোট ছোট টুকরো করে জাদুঘর, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিতরণ করা হয়।

ইতিহাসে কিসওয়ার রঙ ও নকশা পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে কালো হলেও, বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন রঙের কাপড় ব্যবহার করা হয়েছে। বর্ণনায় পাওয়া যায়, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইয়েমেনি সাদা ও লাল ডোরাকাটা কাপড়ে কাবা আবৃত করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে খলিফা হজরত আবু বকর (রা.), হজরত ওমর (রা.) ও হজরত উসমান (রা.) সাদা কাপড় ব্যবহার করেন। ইবনে জুবায়ের কাবা আবৃত করেছিলেন লাল রেশমি কাপড়ে। আব্বাসীয় শাসনামলের শেষ দিকে কালো রঙকে স্থায়ীভাবে নির্বাচন করা হয়। কালো কাপড় টেকসই হওয়ায় এবং ভিড়ের মধ্যে সহজে নোংরা না হওয়ার কারণে এটি ব্যবহার করা শুরু হয়।
বর্তমানে কিসওয়া তৈরির দায়িত্ব রয়েছে কিং আবদুল আজিজ কমপ্লেক্স ফর দ্য কিসওয়া অব দ্য কাবা’র। শতাধিক দক্ষ কারিগর কয়েক মাস ধরে হাতে তৈরি করেন কাবার এই পবিত্র কাপড়। এতে ব্যবহৃত হয় উন্নতমানের রেশম, যা পরে কালো রঙে রঞ্জিত করা হয়। সূচিকর্মে ব্যবহার করা হয় প্রলেপ দেওয়া সোনা ও রুপা সুতো। কোরআনের আয়াত সূচিকর্মে ফুটিয়ে তোলা হয় শতভাগ হাতে, যা কাবার আবরণকে এক বিশেষ সৌন্দর্য ও পবিত্রতা দেয়।
কিসওয়ার ধর্মীয় গুরুত্বের কারণে এটি মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার বিষয়। যে কোনো কিসওয়ার অংশ বা টুকরো বিশেষভাবে সংরক্ষণ ও বিতরণ করা হয়। তবে সদ্য প্রকাশিত এপস্টিন ফাইলসে কিসওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত কাপড় পাঠানোর তথ্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মুসলমানদের আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত এই পবিত্র কাপড়ের ব্যতীত কোনো উদ্দেশ্যই গ্রহণযোগ্য নয়।
কাবার কিসওয়া শুধু একটি কাপড় নয়, এটি ইসলামের ইতিহাস, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক। সম্প্রতি আলোচিত তথ্যের কারণে কিসওয়ার গুরুত্ব এবং তা সংরক্ষণের নিয়মকানুনের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়ে গেছে। ধর্মীয় মহল বলছে, পবিত্র কিসওয়া সর্বদা সম্মান ও সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করা উচিত।
তথ্যসূত্র: মিডেল ইস্ট আই, টাইমস নাউ, রিলিজিয়ন নিউজ সার্ভিস



