বাংলাদেশে ফেসবুক সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত হলেও প্রতিবেশি ভারতে এক্স বা সাবেক টুইটার লোকপ্রিয়তার নিরিখে এগিয়ে। বিশেষ করে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কাছে। যারা আসলে দেশের কলকাঠি নাড়েন বা ভাগ্যনিয়ন্তা। আগামী ২২ জানুয়ারি অযোধ্যায় ভেঙে ফেলা বাবরি মসজিদের স্থানে সরকারি উদ্যোগে তৈরি রাম মন্দিরের উদ্বোধন হতে চলেছে। উদ্বোধন করবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই প্রথম কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী সরাসরি মন্দিরের উদ্বোধনে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে চলেছেন।
এ উপলক্ষে অনুষ্ঠানে হাজির থাকার জন্য সব রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে রাম মন্দির ট্রাস্ট। কোনো কোনো দল অংশ নেবে বলে জানিয়েছে। দোলাচলে ছিল বিজেপিবিরোধী অন্যতম বড় ও ভারতের সবচেয়ে পুরোনো দল কংগ্রেস। তারা শেষমেষ জানিয়েছে, রাম মন্দিরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকছে না তারা। কারণ তারা মনে করে, এটা একান্তই বিজেপি ও আরএসএস-এর অনুষ্ঠান। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্ত আসার পর থেকেই এক্স হ্যান্ডেলে এর পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্যের স্রোত বয়ে চলেছে। এ ক্ষেত্রে বলা, কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের বিপক্ষের মতই গরিষ্ঠ। তারা কংগ্রেস দলটাকে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠীর বিরোধী বলে প্রমাণে তৎপর।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকার ভারতে ক্ষমতায় বসার পর যেভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদকে ভারতে, বিশেষ করে উত্তর ভারতে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে, তা নড়ানোর ক্ষমতা এই মুহূর্তে ভারতের কোনো দলের নেই। কংগ্রেসসহ কোনো রাজনৈতিক দল সে চেষ্টাও করেনি। বরং মোদির এই হিন্দু জাতীয়তাবাদের তত্ত্ব দিনে দিনে বৃহত্তর হিন্দু জনগোষ্ঠীর মনের গভীরে প্রোথিত হয়েছে। এর বিপরীতে রাজনৈতিক দল হিসেবে কংগ্রেস একটু লজ্জা লজ্জা করে নরম হিন্দুত্বের লাইন নিয়েছে। এ ব্যাপারে বিজেপি যত চড়াও হয়েছে, রাহুল, প্রিয়াঙ্কা ও অন্য কংগ্রেস নেতাদের মন্দির-যাত্রা তত বেড়েছে। বিজেপির চ্যালেঞ্জের মুখে নিজেদের হিন্দু প্রমাণে তাঁরা মরিয়া। কিছু দিন মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস নেতাদের এই নরম হিন্দুত্বের লাইন সেখানকার মানুষ নেয়নি। বরং বিজেপির অনেক বেশি খুল্লাম-খুল্লা ভাব তাদের পছন্দ।
কংগ্রেস নেতারা মুখে ধর্মনিরেপক্ষতার কথা বলেন। কিন্তু এটা বলতে তাঁরা কী বোঝান, সেটা সাধারণ মানুষ বোঝে না। এমনকি নিজেরাও বোঝেন কিনা সন্দেহ। তাঁদের কথায়, ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেকুল্যারিজমকে তাঁরা পশ্চিমা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন না। তাঁরা মনে করেন, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে সব ধর্মের সমান অধিকার। খুব ভালো কথা। কিন্তু যা মুখে বলেন, তা তাঁরা বিশ্বাস করেন? আদৌ না।
'বিতর্কিত' বাবরি মসজিদের কথায়ই আসি। একে বিতর্কিত করেছে কে? কংগ্রেস। ভারতের স্বাধীনতার পরপরই ১৯৪৯ সালের ২২ ডিসেম্বর রাতের অন্ধকারে মসজিদের ভেতরে রামলালার মূর্তি রেখে একে বিতর্কিত করে তোলা হয়। উত্তর প্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী গোবিন্দ বল্লভ পন্থ কংগ্রেসের বিরাট নেতা, ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের অন্যতম সেনানি হয়েও এই মসজিদে তালা লাগিয়ে দেন। এবং স্থায়ীভাবে এর গায়ে বিতর্কিত স্থানের লেবেল সেঁটে দিলেন। অথচ তার আগের দিনও সেখানে নামাজ হয়েছে। এত কথার বলার মূল উদ্দেশ্য হলো, ৭৫ বছর আগে বিষয়টি বিতর্কিত করে তুলেছিলেন কংগ্রেস নেতারা। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুও কিছু করতে পারেননি এর বিরুদ্ধে। মনে রাখতে হবে, ভারতে নিষিদ্ধ ছিল হিন্দু মহাসভা। এই প্রতিষ্ঠানই এখন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ বা আরএসএস নামে অধিক পরিচিত। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিজেপির আদর্শ-নির্ধারণী সংগঠন হলো আরএসএস।
এই বিতর্কের মধ্যে ফৈজাবাদের জেলা আদালতে পূজা করার অধিকার চেয়ে মামলা করেন মহন্ত রঘুবীর দাস। মামলা চলতে থাকে দশকের পর দশক। ১৯৮৬ সালে রাজীব গান্ধী সরকারের আনুকুল্যে মসজিদের তালা খোলার অনুমতি দেয় আদালত। রাজীব অযোধ্যা সফর করে 'মাচান বাবা'র পদধুলি নিয়ে নিজেকে অনেক বেশি হিন্দু প্রমাণে মরিয়া চেষ্টা চালান। কিন্তু তাঁর ওই সিদ্ধান্তই বুমেরাং হয়ে আসে। এরপর বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনায় নামে আরএসএস। আর ১৯৯০ সালে তা বাস্তবায়ন করেন বিজেপির তৎকালিন সভাপতি লালকৃষ্ণ আদভানি। তিনি কলিকালের রাম সেজে আধুনিক গাড়িকে রথে পরিণত করে ভারতজুড়ে রথযাত্রা শুরু করেন। সেই রথের চাকা আটকে দেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব। গ্রেপ্তার হন আদভানি।
আর এর পরে বাবরি মসজিদ-রাম মন্দির সংক্রান্ত মামলা চলে যায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টের কাছে। ১৯৯২ সালে ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদের স্থানে করসেবার অনুমতি চায় বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। উত্তর প্রদেশের তৎকালীন বিজেপি সরকার এর অনুমতি দেয়। কিন্তু এজন্য সরকারকে সুপ্রিম কোর্টের কাছে মুচলেকা দিতে হয় যে, কেউ বাবরি মসজিদের কাঠামোর ধারে-কাছে যেতে পারবে না। একই মুচলেকা আদালতকে দিতে হয় ভারতে সরকারকেও। তখন ভারতের শাসন ক্ষমতায় পিভি নরসীমা রাওয়ের নেতৃত্বে কংগ্রেস জোট সরকার। কিন্তু কেউই সেদিন মুচলেকায় দেয়া কথা রাখেনি। সবার চোখের সামনে বাবরি মসজিদের গম্বুজ একে একে ভেঙে ফেলে উন্মত্ত করসেবকেরা। সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া মেলেনি। এমনকি মামলা নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ভেঙে যাওয়া মসজিদটির কাঠামো আগের অবস্থায় ফেরত আনার সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শও কানে তোলেনি কংগ্রেস সরকার। ভাবখানা ছিল, ল্যাটা চুকে গেছে। আর কোনো ঝামেলা নেই। এবার বিজেপি মরুক গিয়ে! কিন্তু তাদের হিসেব যে কতটা ভুল ছিল, উত্তর ভারতে বিজেপির রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা তার প্রমাণ।
এবার দেখা যাক, বাবরি মসজিদ-রাম মন্দির সংক্রান্ত মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি তরুণ গগৈর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের রায়। এই বিষয়ে মামলা ছিল একাধিক। একটা ছিল সেখানকার বিতর্কিত ২.৭৭ একর জমির মালিকানা আসলে কার? মহন্ত রঘুবীর দাশের না সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের? দ্বিতীয় বিষয়টি ছিল, মসজিদ কাঠামো ধ্বংসের জন্য যারা দায়ী, তাদের বিচার। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তার কোনো প্রতিফলন ছিল না। বলা হলো, ওই ২.৭৭ একর জমি রাম জন্মভূমি ট্রাস্টকে দেওয়া হোক। সেখানে সরকারি উদ্যোগ ও অর্থে রাম মন্দির নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি বেশ কিছু দূরে অযোধ্যার ভেতরে সুন্নি ওয়াকাফ বোর্ডকে জমি ও অর্থ দিতে হবে। যাতে তারা মসজিদ নির্মাণ করতে পারে।
এই রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বিচারপতি অশোককুমার গঙ্গোপাধ্যায় আনন্দবাজারে লিখেছিলেন, 'এই রায়টা কিসের ভিত্তিতে দেওয়া হলো, সবটা ঠিক বুঝতে পারছি না। সুপ্রিম কোর্ট দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সেই আদালত একটা রায় দিলে তা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর আমি খুঁজে পাচ্ছি না।'
তিনি লিখেছিলেন, '৪০০-৫০০ বছর ধরে একটা মসজিদ একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল। সেই মসজিদকে আজ থেকে ২৭ বছর আগে ভেঙে দেওয়া হলো বর্বরদের মতো আক্রমণ চালিয়ে। আর আজ দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলল, ওখানে এবার মন্দির হবে। ...সাংবিধানিক নৈতিকতা বলে তো একটা বিষয় রয়েছে! এমন কোনও কাজ করা উচিত নয়, যাতে দেশের সংবিধানের উপর থেকে কারও ভরসা উঠে যায়।'
অন্যদিকে কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানালেন। মন্দির বা মসজিদ নিয়ে টুঁ শব্দটিও করলেন না। দলটির তৎকালীন মুখপাত্র রণদীপ সূর্যওয়ালাকে বলেছেন, 'যুগে যুগে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ঐক্য আমাদের সমাজকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে, তা পুনরায় নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের।' ভাবখানা এমন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বিরাট একটা ঝামেলা থেকে মুক্ত হওয়া গেছে। তবে এ নিয়ে কংগ্রেসের শ্যাম রাখি না কূল রাখি অবস্থান হিন্দু বা মুসলমান কারও কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়নি।
এ বিষয়টি ভারতের বিশিষ্ট সাংবাদিক শেখর গুপ্ত বেশ ভালোভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলছেন, যে কংগ্রেস তালা ঝুলিয়ে বাবরি মসজিদ বিতর্কের সূত্রপাত করল; আবার তালা খুলে বিতর্ক উসকে দিল; কংগ্রেসের আমলে বাবরি মসজিদের কাঠামো ধ্বংস হলো, কংগ্রেস মন্দির নির্মাণে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানাল - এই কংগ্রেসই এখন আরএসএস-বিজেপির অনুষ্ঠানের অভিযোগ তুলে রাম মন্দিরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
এসব কথা উঠে আসছে কারণ ২০২৪-এর এপ্রিল-মে মাসে ভারতে লোকসভা নির্বাচন। সেখানে এবার অবশ্যই রাম মন্দিরকে ইস্যু করবে বিজেপি। গোটা ভারত নয়, শুধু উত্তর ভারতে যদি বিজেপিকে রুখে দিতে হয় তাহলে অবশ্যই কংগ্রেসের জন্য এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠীর মন জয় করা জরুরি। না হলে রামও থাকবে, অযোধ্যাও থাকবে, বিজেপিও থাকবে, কিন্তু কংগ্রেস থাকবে না।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন


মোদি-ম্যাজিক কি টিকে আছে
