হেমন্তের প্রথম মাস চলছে। ধান কাটার সময় প্রায় সমাগত। পৌষের পার্বণ আসতে এখনো বাকি। সারা দেশে একটা শীত শীত ভাব। শীত বাড়লে গ্রামের মানুষ একটু ওম পেতে জড়ো হয় আগুনের কাছে। আর এই শহরে আমরা রাজনীতির উত্তাপ পোহাচ্ছি গাড়ি পুড়িয়ে। গাড়ির সাথে অঙ্গার হচ্ছে অতিসাধারণ কিছু মানুষ, যারা আমাদের শহুরে আলাপের রসদ হলেও গোনার হিসেবে অচ্ছুত। তাই আমাদের কোনো হেলদোল নেই। ফলে এ নিয়ে কথা বললে কারও কানে পৌঁছাবে, এতটা আশা করা বাতুলতা মাত্র।
থাক এসব। চলুন যাই আরেকটু বৃহত্তর পরিসরে আমরা রাজনীতির বিষয়টি দেখি। এই উপমহাদেশে আমরা যারা ব্রিটিশের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছি, তাদের রাজনৈতিক চলার পথটা যেন একই সূতোয় বাঁধা। ১৯৪৭-এর পরে ১৯৬৫ ও ১৯৭১-এর ঘটনায় এই উপমহাদেশের প্রতিটি মানুষ যুক্ত হয়ে পড়েছিল। কম-বেশি সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ঐতিহাসিক ঘটনার চড়া দাম এখনো দিয়ে চলেছে এখানকার মানুষ। ১৯৭৫ সাল; বিপথগামী সেনাসদস্যদের নৃশংস হামলায় সপরিবারে নিহত হলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ওই বছর সব গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ধ্বংস করে ভারতে জরুরি অবস্থা জারি করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোকে সরানোর ষড়যন্ত্র শুরু করেন জেনারেল জিয়া–উল হক প্রায় একই সময়ে। দেখুন একই বছর কাছাকাছি সময়ের ঘটনায় চড়া মূল্য দিতে হলো বাংলাদেশ–ভারত–পাকিস্তানের সাধারণ মানুষকে।
অন্যান্য সময়ের ব্যাখ্যায় আর না যাই। শুধু ২০২৩-এর শেষ থেকে ২০২৪-এর প্রথম কয়েক মাসের দিকে লক্ষ্য করুন। জানুয়ারির শুরুতে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন; ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানে এবং মে মাসে ভারতের লোকসভা নির্বাচন। ফলে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে এই উপমহাদেশের ১৮০ কোটি মানুষ তাদের আগামী ৫ বছরের শাসক নির্বাচিত করতে চলেছে। এই সময়টাতে উপমহাদেশের সর্বত্র কৃষকের শূন্য গোলায় ফসলের বান ডাকে। ফলে গ্রামের নীরব শ্মশানও কোলাহলমুখর হয়ে ওঠে। কিন্তু বর্তমানে ক্ষমতার রাজনীতি ও এর প্রধান অনুষঙ্গ ভোট-ব্যবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে উৎসবমুখর, প্রাণচঞ্চল গ্রামীণ জীবনে নবান্নের দিনগুলো বোধহয় এবার হারিয়েই যাবে। কারণ ভোট-উৎসবটাকে ঠেলতে ঠেলতে আমরা ভোট-যুদ্ধে পরিণত করেছি।
এই যুদ্ধের প্রথম রাউন্ড শুরু গেছে। বিশেষ করে ভারতে। সেখানে পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে ৭ নভেম্বর থেকে। চলবে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। এই পাঁচ রাজ্য হলো রাজস্থান, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা ও মিজোরাম। এর মধ্যে মিজোরাম আমাদের প্রতিবেশী। ছোট রাজ্য। গুরুত্বের তালিকায়ও বেশ পেছনে। ৪০ সদস্যের মিজোরাম বিধানসভায় জোরামথাঙ্গার মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেসকে ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। এবারও সরকার গঠন করবে এমনই আভাস মিলছে। তবে কংগ্রেসের অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। তারচেয়ে ভালো অবস্থায় আছে নতুন আঞ্চলিক দল জোরাম পিপলস পার্টি (জেডপিপি)। লালডুহোমার এই দল এবার ১০-১৪টা আসন পেতে পারে। এবং তেমনটা হলে কংগ্রেসের সাথে জোট বেঁধে বিজেপির বন্ধু জোরামথাঙ্গার সরকার উল্টিয়ে দিতে পারেন তিনি।
তেলেঙ্গানায় ক্ষমতাসীন ভারত রাষ্ট্রীয় সমিতির (বিআরএস) সাথে কংগ্রেসের হাড্ডাহাড্ডি লাড়াইয়ের ইঙ্গিত মিলছে সর্বশেষ জনমত জরিপে। সরকার-বিরোধী মনোভাবকে ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারলে কংগ্রসের জেতার সম্ভাবনা অনেক বেশি। তবে এই দুই রাজ্যে ভারতের শাসক দল হিসেবে বিজেপি তেমন কোনো গুরুত্ব বহন করে না।
বিজেপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিন্দিবলয় বলে পরিচিত বাকি তিন রাজ্য—রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়। এই তিন রাজ্যের মধ্যে দুটিতে (রাজস্থান ও ছত্তিশগড়) কংগ্রেস এবং একটিতে (মধ্যপ্রদেশ) বিজেপি ক্ষমতায়। এই তিন রাজ্যে লোকসভার আসন সংখ্যা ৬৫। ২০১৯–এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এর মধ্যে ৬১টি আসন পেয়েছিল। যার জোরে ২০১৯-এ একই সরকার গড়ে বিজেপি। সেজন্য ২০২৪-এর মে মাসে অনুষ্ঠেয় লোকসভা নির্বাচনের আগে আগে এটাকে অনেকেই সেমিফাইনাল হিসেবে গণ্য করছেন।
এই তিন রাজ্যে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি ও কংগ্রেস। কিছুদিন আগে কংগ্রেসের নেতৃত্বে প্রায় দুই ডজন দল নিয়ে ‘ইন্ডিয়া’ জোট তৈরি হয়েছে। জোট গঠনের পর এই প্রথম ভোট-সমরে কংগ্রেস শামিল হলো। তা-ও প্রতিপক্ষ বিজেপি। ফলে এবার যদি এই তিন রাজ্য কংগ্রেস নিজের দখলে নিতে পারে, তাহলে ইন্ডিয়া জোটে তার প্রভাব অনেকটাই নিরঙ্কুশ হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
গতবারও তিন রাজ্যে কংগ্রেস জিতেছিল। কিন্তু দল ভাঙানোর খেলায় কংগ্রেসকে হারিয়ে মধ্যপ্রদেশের দখল নেয় বিজেপি। কিন্তু বিভিন্ন জনমত জরিপের যে পূর্বাভাস, তাতে মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে কংগ্রেস ক্ষমতায় আসছে বলেই জোরালো ইঙ্গিত রয়েছে। একমাত্র রাজস্থানে তারা বিজেপির চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে। তবে লড়াইটা হাড্ডাহাড্ডি হবে বলে রাহুল গান্ধীসহ কংগ্রেস নেতাদের বিশ্বাস। কিন্তু ১৯৯০–পরবর্তী ভোটের ইতিহাস বলে রাজস্থানে ক্ষমতাসীন দল কখনো পরেরবার ফিরে আসতে পারেনি। সাথে জুটেছে মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট ও তরুণ নেতা শচীন পাইলটের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। ফলে দলটির আশাবাদী হওয়ার সুযোগ কম। যদিও রাজস্থানের একজন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ নারায়ণ বারেথ বলেছেন, এবার ক্ষমতাসীনদের ফিরে আসার একটা ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। লড়াইটা যে এবার জোরদার হবে, তা নিয়ে তাঁর কোনো সন্দেহ নেই।
এই পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য বড় পরীক্ষা। বিশেষ করে হিন্দিভাষী তিন রাজ্যে। দলকে নির্বাচনী বৈতরণী পার করে দেওয়ার একক দায়িত্ব তিনি নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়েছেন। কর্ণাটকে মোদি-ম্যাজিক কাজ না করায় এবারের চ্যালেঞ্জটা তাঁর কাছে অনেক বড়। কর্ণাটকে বিজেপির পরাজয়ের পর দক্ষিণ ভারতে কোনো রাজ্যেই তাঁর দল ক্ষমতায় নেই। বরং কর্ণাটক বাদে অন্য রাজ্যে গোনার মধ্যেও আসে না। সেদিক দিয়ে বিজেপির মতো একটি সর্বভারতীয় দল ১০ বছর টানা ভারতের ক্ষমতায় থাকার পরও শেষমেষ উত্তর ভারতের একটি হিন্দুত্ববাদী দল হিসেবে পরিচিতি পেয়ে গেছে। এখন সেখানেও ধাক্কা লাগলে কী করবেন তিনি?
নরেন্দ্র মোদির ক্যারিশমা ধরে রাখতেই কোনো রাজ্যে বিজেপি দ্বিতীয় কোনো নেতাকে প্রচারে তুলে ধরেনি। রাজস্থানে বসুন্ধরা রাজে, মধ্যপ্রদেশে শিবরাজ সিং চৌহান, ছত্তিশগড়ে রমণ সিং–এর মতো ডাকসাইটে নেতারা মোদির নির্বাচনী পোস্টারে ঠাঁই পাননি। তাঁদের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেও তুলে ধরা হয়নি। বলা যায়, তিন রাজ্যে বিজেপির নির্বাচনী প্রচার পুরোটাই মোদিময়। উল্টোদিকে কংগ্রেস অশোক গেহলট, কমলনাথ, ভূপেশ বাঘেলের মতো দলের স্থানীয় নেতাদের তুলে ধরেছে।
ঠিক এই কাজটাই কর্ণাটকে করেছিল বিজেপি। পাল্টা একই কৌশল নেয় কংগ্রেস। এবার কার কৌশল খাটে দেখা যাক। কর্ণাটকে বিজেপির স্লোগানই ছিল—রাজ্যের ২২৪ আসনে দলের প্রার্থীর নাম নরেন্দ্র মোদি। ক্ষমতাসীন দলের হয়ে মোদি সেখানে ৪৬টি জনসভা করেন। তারপরও বড় ব্যবধানে ফল গেছে কংগ্রেসের ঝুলিতে। এরপর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে—মোদি-ম্যাজিক কি ফিকে হয়ে গেছে?
অবশ্য মোদির সমর্থকদের ঝুলিতে থাকা যুক্তি একেবারে ফেলনা নয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড় ও কর্ণাটক কংগ্রেসের হাতে থাকলেও পরের বছর লোকসভা নির্বাচনে দলটি ধুয়েমুছে যায়। এই চার রাজ্যের ৯৩টি আসনের মধ্যে ৮৬টি পায় বিজেপি। এটাই ছিল মোদি-ম্যাজিক। তখনো ফিকে হতে থাকা মোদি-ম্যাজিক কাশ্মীরের পুলওয়ামায় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর কনভয়ে জঙ্গি হামলার পর জাতীয়তাবাদের জারক রসে জারিত হয়ে আবার আপন রূপে ফিরে আসে। পাকিস্তানের বালাকোটে ‘ঘুসকে মারেঙ্গে’ (ঢুকে মারব)–মোদির এই সেনা–বীরত্বের কথকতা ভালোই খেয়েছিল তখন ভারতীয় ভোটাররা।
এবারও যদি হিন্দি বলয়ের তিন রাজ্যসহ পাঁচটিতে বিজেপি হারে তবুও নরেন্দ্র মোদি হাল ছাড়বেন না। সে পাত্র তিনি নন। আর রাজস্থান পেয়ে গেলে কিছুটা সামাল দেওয়া যাবে। সাথে থাকছে, আগামী জানুয়ারিতে অযোধ্যার ‘বিতর্কিত বাবরি মসজিদের’ জমিতে নবনির্মিত রামমন্দিরের উদ্বোধন। এই আবেগ কিছুটা হলেও হিন্দি বলয়কে প্রভাবিত করবে। এর বাইরে জুটেছে বন্ধু ইসরায়েলের আক্রান্ত হওয়ার খবর। যে খবরে সহমর্মী ভারত কোথাও ফিলিস্তিনিদের পক্ষে প্রতিবাদ–বিক্ষোভ করতে দিচ্ছে না। কেরালার মতো কিছু রাজ্য অবশ্য ব্যতিক্রম। হাতে এখনো মাস ছয়েক আছে। এর মধ্যে আর কোনো পুলওয়ামা এসে ধরা দেবে না, তা তো কেউ জোর দিয়ে বলতে পারে না!
আরেকটি উত্তরহীন প্রশ্ন হলো, ৭৩ বছর বয়েসী নরেন্দ্র মোদির এটাই কি শেষ নির্বাচন? কারণ, তিনি নিজেই ৭৫-এর সীমারেখা আগেই টেনে রেখেছেন। যদি তাই হয়, তাহলে শেষ ভালো কী হবে? গত ১০ বছরে নরেন্দ্র মোদি যা চেয়েছেন, তাই করেছেন—এবারও মোদি-ভক্তদের ভরসার জায়গা সেটাই।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন



