অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ নিয়ে বিতর্ক সেই উনিশ শতক থেকেই, ১৫২৮ সালে মসজিদ তৈরির প্রায় চার শ বছর পর থেকে। এই বিতর্ক চূড়ান্ত রূপ পায় ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর। ওই দিন সব প্রতিশ্রুতি ভেঙে বিজেপি, আরএসএস ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের উন্মত্ত কর্মী-সমর্থকেরা প্রকাশ্য দিবালোকে বাবরি মসজিদের গম্বুজগুলো গুঁড়িয়ে দেয়। অবশ্য ততদিনে নিরন্তর প্রচারের মাধ্যমে বাবরি মসজিদের গায়ে ‘বিতর্কিত’ শব্দটা সেঁটে দেওয়া গিয়েছিল। এরপর প্রয়াত সাংবাদিক গৌরকিশোর ঘোষ আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম পাতায় একটি মন্তব্যধর্মী লেখা লিখেছিলেন। যার শিরোনাম ছিল ‘ধর্মের নামে ফ্যাসিবাদ আসছে’।
সেদিন ভারতের খুব অল্প সংখ্যক মানুষ এটা বুঝেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বাড়বাড়ন্ত দেখে মনে হয় অনেক পাঠকের এতে গোসসা হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু ম্যাগসেসাই পুরস্কার জয়ী এই বর্ষীয়াণ সাংবাদিক তাঁর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে যে ভবিষ্যত দেখতে পেয়েছিলেন, তা অনেকেই পাননি। বিশেষ করে ভারতের বাম ও কংগ্রেসসহ মধ্যপন্থী দলগুলো। তারা বুঝলে আজ হয়তো এ পরিস্থিতি এমনটা না-ও হতে পারত। ইতিহাস থেকে তারা কিছু শিখতে চায়নি।
১৯৪৭ সালে ১৫ আগস্ট ভারত ব্রিটিশ মুক্ত হওয়ার পরপরই প্রথম দাবি ওঠে সোমনাথ মন্দির নিয়ে। ভারতের প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের নেতৃত্বে সোমনাথ মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। এবং এটি অনুমোদন করেন মহাত্মা গান্ধী। সোমনাথ মন্দির ছিল গুজরাটের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠীর আবেগের সাথে জড়িত। আর কে না জানে বল্লভভাই প্যাটেল ও মহাত্মা গান্ধী– দুজনেই গুজরাটের মানুষ। মন্দির নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রথমে প্রস্তাব করা হয় রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে তৈরির। কিন্তু প্যাটেল এই কাজটি সমর্থনও করেননি, হতেও দেননি। সাধারণ মানুষের দেওয়া অর্থে সোমনাথ মন্দির পুনর্নির্মাণ হয়েছে। এখন সেখানে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের (বিজেপি শাসিত) উদ্যোগে আরও অনেক কাজ চলছে।
তবে এখানে রাজনৈতিক মতাদর্শগত সিদ্ধান্তই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫১ সালে সোমনাথ মন্দিরের কাজ শেষ হয়। এর আগেই গান্ধীজি নিহত হন কট্টর হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর সদস্য নাথুরাম গডসের গুলিতে। মন্দিরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদ। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর এতে তীব্র আপত্তি ছিল। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার কোনো বিশেষ ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকাটা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের সাথে যায় না বলে তিনি মনে করেছিলেন।
লক্ষ্য করলে দেখবেন, সোমনাথ মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ যখন চলছে বা শুরু, ঠিক তেমনই এক সময়ে ১৯৪৯ সালের ২২ ডিসেম্বর শীতের রাতে কে বা কারা রাম ও সীতার পুতুলসদৃশ মূর্তি বাবরি মসজিদের ভেতরে রেখে আসে। শুরু হয় বিতর্ক। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও উপ-প্রধানমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এই মূর্তি সরানোর নির্দেশ দেন। অযোধ্য তখন ফৈজাবাদ জেলার অধীন। সেখানকার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট (এখানে জেলা প্রশাসক বলে পরিচিত) ছিলেন কে কে নায়ার, কেরালার মানুষ। দুই নেতার নির্দেশ মানতে অস্বীকার করেন তিনি। এর জন্য তাঁকে চাকরিচ্যুতও করা হয়। ততক্ষণে বেশ কিছু দিন চলে গেছে। তখন গোবিন্দবল্লভ পন্থের নেতৃত্বাধীন উত্তরপ্রদেশ সরকার জানায়, জন-আবেগের কারণে এটা সরানো যাবে না। তারা মসজিদে তালা ঝুলিয়ে সবার প্রবেশ নিষিদ্ধ করে সমস্যার একরকম ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। এ নিয়ে ফৈজাবাদের আদালতে শুরু হয় মামলা। সরকার আদালতের ওপর দায় চাপিয়ে বছরের পর বছর হাত গুটিয়ে বসে থাকে।
এভাবেই যাচ্ছিল। কিন্তু বাদ সাধলেন কংগ্রেস সাবেক সভাপতি ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। তাঁর আমলেই খুলে দেওয়া হলো বন্ধ থাকা মসজিদের তালা। অনুমতি দেওয়া হলো পুজোর। বোফোর্স-কেলেঙ্কারি, দলে ভাঙন, দুর্নীতির অভিযোগে জেরবার রাজীব ১৯৮৯ সালে তাঁর নির্বাচনী প্রচার শুরুই করলেন অযোধ্য থেকে। নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে হিন্দুত্বকে ট্রাম্প কার্ড নিয়ে খেলতে গিয়েও ব্যর্থ হলেন। বিরোধী দলে বসতে হলো তাঁকে। আর বিজেপি ১৯৮৪-র লোকসভা নির্বাচনে দুটি আসন থেকে রাজনৈতিক ডামাডোলে ১৯৮৯-এ পৌঁছে যায় ৮৬-তে। কংগ্রেসের পরেই সবচেয়ে বড় একক বড় দল হয়ে ওঠে তারা। একই সাথে চারটি রাজ্যে সরকার গঠন করে বিজেপি। বুঝতে পারে, দিল্লির মসনদ দখলের তাদের স্বপ্ন এতদিনে সাকার হতে চলেছে। যদি তারা ঠিকঠাক চলতে পারে।
বিষয়টি আরও ভালো বুঝেছিল বিজেপির জন্মদাত্রী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ বা আরএসএস। এজন্য রাজীব গান্ধী বাবরি মসজিদের তালা খুলে দেওয়ার পর সেখানে নিয়মিত পুজোর বা মন্দির নির্মাণের দাবি নিয়ে মাঠে নামায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দলের মতো অঙ্গ সংগঠনগুলোকে। যাতে এর দায় কখনো সরাসরি আরএসএস বা বিজেপির ওপর না এসে পড়ে। কিন্তু লাভের বেলায় ষোল আনাই বিজেপির।
এখন প্রশ্ন হলো, এত দেবদেবীর মধ্যে রামকে বেছে নেওয়া কেন? উত্তরভারতের হিন্দিভাষী অঞ্চলের জন্য এর একটা সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা আছে। বিপিন চন্দ্র, মৃদুলা মুখার্জি ও আদিত্য মুখার্জি তাঁদের ‘ভারতবর্ষ: স্বাধীনতার পরে (১৯৪৭–২০০০)’ বইয়ে লিখছেন, ‘হিন্দুধর্ম কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নয়– কোনও একখানি পবিত্র গ্রন্থের প্রশ্নাতীত কর্তৃত্বের ওপর, কিংবা যুগ যুগ ধরে ক্রমবিন্যস্ত কোনও পুরোহিতশ্রেণির কর্তৃত্বের ওপর তা নির্ভরশীল নয়, হিন্দুদের কোনও একমেবাদ্বিতীয়ম ঈশ্বর বা নির্দিষ্ট একপ্রস্থ বিশ্বাসমালা নেই। ফলত, হিন্দুদের মধ্যে অজস্র ধর্মীয় বৈচিত্র আছে। বাস্তবিক, কে হিন্দু তা নির্ণয় করার কোনও অকাট্য নিয়মবিধি নেই।’ আরএসএস বা অন্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের ক্ষেত্রে হিন্দুত্বের জিগির তোলার ক্ষেত্রে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় সমস্যা। আর সেখানেই ত্রাতা হয়ে এলেন রামচন্দ্র।
ওই লেখকেরাই লিখছেন, ‘আশির দশকের গোড়াতে বাবরি মসজিদ – রাম-জন্মভূমি বিতর্কটি তাদের সামনে ওইরকম একটা সুযোগ এনে দিল। রাম ভারতে এক অনন্য স্থানের অধিকারী, তাই এই বিষয়টি হিন্দুদের ক্ষেপিয়ে তুলতে পারে। রাম ঠিক সেসব মূল্যবোধের অবতার যা প্রতিটি হিন্দুর, বস্তুত প্রতিটি ভারতীয়ের আরাধ্য। তাঁর নাম কোটি কোটি ভারতীয়ের হৃদয়মন স্পর্শ করে।’ এছাড়া উত্তর ভারতের সম্ভাষণ বিনিময়ের ভাষাতেও রামের সরব উপস্থিতি। দুজন হিন্দুর দেখা হলে তাঁরা পরস্পরকে রাম-রাম বলে সম্ভাষণ করেন। সবার মনে থাকার কথা, গডসের গুলি গান্ধীজির বুকে লাগার পর মৃত্যুর আগ মুহূর্তে তাঁর উচ্চারিত শেষ শব্দটি ছিল ‘হে রাম’। ‘রাম’ শব্দটি আসলেই হিন্দিভাষী অঞ্চলের মানুষের মনের গভীরে প্রোথিত।
ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগের পর এ বিষয়টি কংগ্রেসের নেতারাও বুঝতেন। তাঁরা একটু হালকা চালে, যাকে পরিভাষায় বলে নরম হিন্দুত্ব, সেভাবে প্রায় ৫০ বছর একে কাজে লাগিয়েছেন। আর বিজেপি ও আরএসএস চলে গেছে হার্ডলাইনে। এর ফল তারা হাতেনাতে পেয়েছে। ১৯৮৪ সালে দুটি আসনে জেতা বিজেপি ১৯৯৭ সালে ১৫ দিনের জন্য এবং ১৯৯৯ সালে পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় চলে গেল। এটাই রাম বা রাম-মন্দিরের রাজনৈতিক মাহাত্ম্য। এই সময়কালে বিজেপি ক্ষমতায় থাকার পরেও মসজিদের জায়গায় রামমন্দির বানাতে পারেনি। অটলবিহারি বাজপেয়ি, লালকৃষ্ণ আদভানিদের কিছুটা হলেও লোকলজ্জার ভয় বা আদালতের ওপর বিশ্বাস ছিল। ফলে অল্প সময়ে তাঁরা আর পেরে ওঠেননি।
সেই জায়গাটাই নিয়ে নিলেন নরেন্দ্র মোদি। বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন, জম্মু ও কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা রদ, বাবরি মসজিদের স্থানে রামমন্দির তৈরি, নতুন সংসদ ভবন–একে একে আরএসএস-এর সব এজেন্ডা পূরণের মাধ্যমে মোদি প্রমাণ করেছেন তিনি বর্তমান ভারতীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে একমেবাদ্বিতীয়ম, তাঁর কোনো বিকল্প নেই। ভারতের সবকিছু আজ মোদিময়। কয়েক বছর আগে আরএসএস-এর এক তাত্ত্বিক নেতা লিখেছিলেন, বিজেপিকে চিরকালের জন্য ক্ষমতায় রাখাটা তাদের লক্ষ্য না। তাঁরা খেলার চরিত্র ও নিয়মাবলী নির্ধারণ করে দিয়ে যেতে চান। যাতে ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যেতে হলে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলকে সেই নিয়ম মেনে চলতে হয়। সেই নিয়মের প্রধান শর্তই ভারত হিন্দুদের দেশ। হিন্দুদের বিরুদ্ধে যাবে এমন কোনো কিছু করার সাহস কেউ করবে না। নরেন্দ্র মোদি সেই খেলার নিয়মাবলী রচনা করে চলেছেন। এটা শেষ করতে তাদের আরও সময় লাগবে এটা মোদি বা তাঁর দল বিজেপি বা আরএসএস খুব ভালোভাবে জানে। সেই সময়কে টেনে লম্বা করার যত পন্থা আছে, তা নিজেদের মতো প্রয়োগ করবে তারা। অর্ধসমাপ্ত রামমন্দিরে আজকে (২২ ডিসেম্বর, ২০২৪) পুরুষোত্তম রামের প্রাণ প্রতিষ্ঠা তাই বড়ই জরুরি। এর জন্য শঙ্করাচার্যরা যতই আপত্তি জানান, তা গ্রাহ্যে নিলে চলবে না। আর মাত্র কয়েক মাস পরে জনগণেশের দুয়ারে যেতে হবে ভোট ভিক্ষা করতে। এই ভোট ভিক্ষার পন্থা এই মুহূর্তে নরেন্দ্র মোদির চেয়ে ভালো কেউ জানে না।
সাংবাদিক শ্রাবস্থী দাসগুপ্ত তাই যতই লিখুন, ধর্ম আর রাজনীতির মধ্যে দূরত্ব কমছে, বিদায় নিচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা। আর দিল্লির জওহরলাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মৃদুলা মুখার্জি যতই বলুন, যেভাবে রাম মন্দিরের উদ্বোধন হতে চলেছে, তার পুরোটাই রাজনীতি। রাজনীতির সাথে ধর্মের মিশেল দেওয়ার এক ক্লাসিক উদাহরণ, যাকে আসলে সাম্প্রদায়িকতা বলে। তা যে ধর্মেরই হোক না কেন। আসলে এই কচকচানিতে কান দেওয়ার সময় মোদিময় ভারতের নেই। সেখানে রচিত হতে চলেছে এক নতুন ভারত, যার স্বপ্ন গত প্রায় ৭৭ বছর ধরে অনেকে দেখছেন।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন


যা আছে অযোধ্যার সেই রাম মন্দিরে
রাম মন্দির উদ্বোধন হচ্ছে সোমবার, শঙ্কায় অযোধ্যার মুসলিমরা
