সারা বিশ্বে এ বছর প্রায় ৬০টি দেশে নির্বাচন হবে–এ তথ্য সবারই জানা। এ সময়ে বেশ কয়েকটি দেশে নির্বাচন হয়েও গেছে। এর মধ্যে দুটি দেশের জাতীয় নির্বাচনে ভোটগ্রহণের ভেতরে সময়ের পার্থক্য ছিল এক মাস। একটি হয়েছে ৭ জানুয়ারি, অপরটি ৮ ফেব্রুয়ারি। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন দেশ দুটি হলো বাংলাদেশ ও পাকিস্তান।
এই দুই নির্বাচনের মধ্যে আপাতত কোনো মিল না থাকলেও আলোচিত বিবেচনায় দুটিই কম-বেশি এক জায়গায়। বাংলাদেশের ৭ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশগুলো বেশি সক্রিয় ছিল। তাদের নিত্যদিনের বিবৃতি, প্রতিক্রিয়ায়–অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল এ দেশের মানুষ। এর পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত থাকা সত্ত্বেও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মেনে ৭ জানুয়ারি নির্বাচন হয়ে গেছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল গত বছর ১৪ নভেম্বরের মধ্যে। কিন্তু সে দেশের ‘কথিত’ তত্ত্বাবধায়ক সরকার তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ নিয়ে তেমন কোনো মাথাব্যথা বা প্রতিক্রিয়া আমেরিকা ও তার মিত্রদের মধ্যে দেখা যায়নি। বরং বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়ার কৌশলই তাদের কাছে শ্রেয় বলে মনে হয়েছে।
বাংলাদেশের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে অন্যতম বড় দল বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি। বিএনপির দাবি ছিল, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার। সেই দাবি পূরণ না হলে নির্বাচনে অংশ নেবে না–এই সিদ্ধান্ত বিএনপি অনেক আগে থেকেই নিয়ে রেখেছিল। তাই দাবি পূরণ না হওয়ায় তারা ভোটে অংশ নেওয়ার পথে পা বাড়ায়নি।
এ জন্য তৎকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন, আইন–শৃংখলা রক্ষাকারীবাহিনীসহ বিভিন্ন পক্ষকে চাপের মধ্যে রাখাই ছিল পশ্চিমা দেশগুলোর নীতি। এর মধ্যে জনপ্রিয় উদাহরণ হলো আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা। এর উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছিল—বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে যারাই বাধা হবে, তারাই ভিসা নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর লোকজনের ‘স্বপ্নের দেশ’ আমেরিকায় যাওয়ার এবং সেখানে স্থায়ী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। বিশেষ করে বিত্তশালী ও ক্ষমতাবানদের জন্য।
তাঁদের মনের ভয় ধরাতে এমন মহৌষধের বিকল্প কমই আছে, মার্কিন শাসকেরা এমনটাই মনে করেছিল।
অন্যদিকে পাকিস্তানে দেখুন, আনোয়ারুল হক কাকারের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় বসার পর দিন থেকেই সে দেশে একটি বিশেষ দল বা জোটকে ক্ষমতায় আসার পথ সুগম করতে ব্যস্ত ছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সুষম নির্বাচনী ময়দান বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির কোনো ইচ্ছাই পাকিস্তান নির্বাচন কমিশনের (পিইসি) মধ্যে দেখা যায়নি। যে কারণে পাকিস্তানের সাংবাদিক, একাডেমিক, রাজনৈতিক কর্মী হুসেন হাক্কানি এই নির্বাচনকে ‘রিগড ইলেকশন’ (কারচুপির নির্বাচন) না বলে ‘ফিক্সড ইলেকশন’ (পূর্ব নির্ধারিত নির্বাচন) বলে বর্ণনা করেছেন। এ ক্ষেত্রে সংবিধান মেনে ঠিক সময়ে নির্বাচন করতে না পারা বা সব দলের জন্য নির্বাচনে সমান সুযোগ তৈরিতে ব্যর্থ হওয়ার পরও পাকিস্তান নিয়ে আমেরিকা বা তার মিত্ররা টু-শব্দটি পর্যন্ত করেনি।
জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপারে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে দ্বৈত নীতি নিয়ে বাইডেন প্রশাসন সব সময় প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। এখন টাইম ম্যাগাজিনের মতো পত্রিকা বাইডেন প্রশাসনের গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার ও দ্বৈত পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের একটাই প্রশ্ন—পাকিস্তানের জেনারেলদের (পড়ুন সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির) কত দূর পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হবে এবং কেন? যদিও সবাই জানে, এমন প্রশ্নের কেউই জবাব দেবে না। নির্বাচন শেষ হওয়ার দুদিন পরও পূর্ণাঙ্গ ফল প্রকাশে ব্যর্থ হওয়া, ফল প্রকাশে টালবাহানা–এসব দেখে তাদের টনক কিছুটা হলেও নড়েছে। এখন বলছে, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। এর তদন্ত দরকার। একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশে রাজনৈতিক শক্তির ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে পশ্চিমা দেশগুলো। তারা সব সময় পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে সেনাপ্রধানকে গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল বলে মনে করে।
এ তো গেল দুই দেশের সরকারি পর্যায়ের বিষয়-আশয়। এবার একটু চোখ ফেরানো যাক দুই দেশের নির্বাচনী ময়দানের মূল খেলোয়াড়, অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে। বিশেষ করে, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি এবং ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) ভূমিকার দিকে। দুটি দলই নির্বাচনের সময় ক্ষমতার বাইরে ছিল। কিন্তু অভিযোগের সুর একই—সরকার ও ক্ষমতাসীন দল তাদের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। ভোটের মাঠে তারা যাতে না দাঁড়াতে পারে, সে জন্য গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করছে সরকার।
বিএনপি বিভিন্ন মেয়াদে চারবার দেশের ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু দীর্ঘ ১৭ বছরের বেশি সময় ধরে তারা ক্ষমতার বাইরে। তাদের অভিযোগ, সরকারসহ ক্ষমতাসীনদের সবাই তাদের প্রতি খড়্গহস্ত। অতএব এই সরকারকে বিদায় না করে নির্বাচনে যাওয়া যাবে না। অথচ গত ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত বিএনপি টানা দেড় বছর ধরে সভা-সমাবেশ করে গেছে। এর লক্ষ্যই ছিল দাবি আদায়।
অন্যদিকে পিটিআই-এর কথাই ধরুন। ইমরান খানের এই দল ১৯৯৬ সালে গঠিত হওয়ার পর মাত্র একবারই (২০১৮-২২) ক্ষমতায় বসার সুযোগ পেয়েছে। তা-ও সেনাবাহিনীর বদান্যতায়। আবার তাদেরই অঙ্গুলি হেলনে ক্ষমতা থেকে অসময়ে বিদায় নিতে হয়েছে। আর বিদায় নেওয়ার পর যা ঘটেছে, তা যেকোনো অল্পবয়সী রাজনৈতিক দলের জন্য টিকে থাকার লড়াই করাটা খুবই কঠিন কাজ।
দলের প্রধান ইমরান খানসহ ওপরের সারির সব নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে জেলে আটক থাকার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন। পাননি ইমরান। আদালতের মাধ্যমে তাঁকে সাজা দিয়ে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। দলের নির্বাচনী প্রতীক (ক্রিকেট ব্যাট) বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে গিয়েও কোনো লাভ হয়নি দলটির। কিন্তু তারপরও তারা ভোটের মাঠ ছেড়ে যায়নি। এ জন্য পিটিআই-এর প্রার্থীরা স্বতন্ত্র হিসেবে বিভিন্ন প্রতীকে নির্বাচন করতে বাধ্য হয়েছেন। দলটিকে কোথাও নির্বাচনী সমাবেশ করতে দেওয়া হয়নি, যাতে ওই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কোনোভাবেই নিজেদের ইমরানের দলের প্রার্থী হিসেবে পরিচিত করাতে পারেন। নিরুপায় পিটিআই প্রার্থীরা সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়া কোথাও নিজেদের কথা বলতে পারেননি।
এর সবই করা হয়েছে এ কারণে, যাতে ইমরানের দল নির্বাচনে না আসে। না এলেই জেনারেল আসিম মুনিরের জন্য পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করাটা সহজ হয়ে যেত। সেনাকর্তারা আগেই দেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মিয়াঁ নওয়াজ শরিফের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। যার ফলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, সারা জীবনের জন্য দেশের রাজনীতিতে অযোগ্য বলে সুপ্রিম কোর্টের রায় পাল্টে গেছে ম্যাজিকের মতো। লন্ডনের নির্বাসিত জীবন ছেড়ে নওয়াজ শরিফ দেশে ফেরেন বীরের বেশে।
কিন্তু বিধি বাম। জেনারেল মুনির বা নওয়াজ শরিফ–কেউই দেশের মানুষের মনের গতি-প্রকৃতি বোঝেননি। বুঝলে হয়তো ভোটের ছক অন্যভাবে সাজাতেন। এত কিছু করে সাজানোর পর ভোটের ফল প্রকাশের প্রাথমিক ঘোষণাতেই পাশার দান উল্টাতে থাকে। একের পর এক আসনে এগিয়ে যেতে থাকেন পিটিআই-সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। পাকিস্তানের বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর খবরে তখন চমকের পর চমক। নওয়াজের মতো প্রার্থীও প্রথম দিকে পিছিয়ে ছিলেন। এরপর হঠাৎই ফল ঘোষণা বন্ধ হয়ে যায়।
ইমরানের দলের নেতাদের দাবি—ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লির ২৬৬টি আসনের মধ্যে তারা ১৭০টিতে জিতেছেন। যদিও নির্বাচন কমিশনের হিসেবে তা এখনো ৯৩। তারপরও এককভাবে গরিষ্ঠ ইমরানের দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এত সুযোগ পেয়েও দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে আছে নওয়াজ শরিফের পিএমএলএন (৭৫) ও বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির পিপিপি (৫৪)। এদিকে ম্যাজিকের মতো বদলে গেছে আদালতের কর্মকাণ্ড। ইসলামাবাদের সন্ত্রাসবিরোধী আদালত (এটিসি) গত শনিবার ১২টি মামলায় ইমরান খানকে জামিন দিয়েছেন। অথচ ভোটের আগে যেসব মামলায় তাঁর সাজা হয়েছে, সেখানে তিনি নিজের আইনজীবী পর্যন্ত নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ পাননি। অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য ইমরানকে বাহবা দেওয়ার কিছু নেই। কিন্তু লড়াইয়ের অংশ হিসেবে শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নির্বাচনে অংশ নিয়ে তাঁর দল যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তা প্রশংসনীয়।
আসলে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার অধিকার যেকোনো রাজনৈতিক দলের আছে। আবার অংশ না নেওয়ার জন্য সমালোচনাও তাদের মানতে হবে। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার জন্য পরোক্ষভাবে বিএনপিকে যারা উৎসাহিত করেছিল, তাদের অনেকেই এখন এই সিদ্ধান্তের সমালোচনায় মুখর। ইমরানের দলের এই ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই থেকে বিএনপি কি কিছু শিখবে?
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন



