না, না। শিরোনামে দেওয়া মানুষের সংখ্যা দেখে বিভ্রান্ত হবেন না দয়া করে। এটিই চূড়ান্ত নয়। বাড়বে বৈ কমবে না। কারণ আরও কিছু মানুষ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছে এখনো। প্রাণহরণের হাফ সেঞ্চুরি তাই হতেই পারে। এমনকি তা ছাড়িয়েও এগিয়ে যেতে পারে!
সুতরাং, পুড়িয়ে মারা মানুষের সংখ্যা নিয়ে একেবারেই ভ্রান্তি রাখবেন না মনে। ওটুকু বাদ দিয়ে এবার চলুন নিজেদের হত্যাকারী হওয়ার ফরমুলা নিয়ে আলোচনা করা যাক। কি, নিজেকে হত্যাকারী হিসেবে মানতে চাইছেন না তো? কিন্তু বিশ্বাস করুন, গতকাল রাতের অন্ধকারে রাজধানী ঢাকার বেইলি রোডে অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়া ৪৬ জনের হত্যাকারী আমি-আপনিই!
গতকাল ছিল বৃহস্পতিবারের রাত। শুক্রবার, সপ্তাহান্তের ছুটির দিন। ফলে এই রাতটা এ শহরবাসীদের একটু হাঁফ ছেড়ে স্বস্তি পাওয়ার রাত। সারা সপ্তাহ জীবনধারণের জন্য কতই না সংগ্রাম করে যেতে হয়। চাকরিজীবী টেনে যান চাকরিদাতার ঘানি। যিনি ব্যবসা করেন, তাঁকেও পুরো সপ্তাহ আয়ের পথ খুঁজে যেতে হয়-তা আপনি বড় বা ছোট, যে কারবারই করেন না কেন। ওদিকে হোমমেকারদের টানতে হয় পুরো সংসারকে। শুধু টাকা-পয়সা দিয়ে কী আর সংসার চলে, ওতে লাগে আরও শ্রম। কোনো মা হয়তো সারা সপ্তাহ স্বামী-সন্তানকে আগলে রেখে এদিন একটু হালকা হতে চান।
কোনো শিক্ষার্থী হয়তো এ রাতটায় একটু বেশি বেশি ঘুমাতে চান। শ্রমজীবীরাও তেমনি। তবে সবার যে এমন রাজকপাল থাকে, তা না। কিন্তু একটু ঢিলেঢালাভাব তো চলেই আসে কিছুটা। তাই একটু উদ্যাপনের ভাবও হয়তো এসে যায় একেবারে শ্রমক্লিষ্ট জীবনেও।
আর ঠিক তখনই আমরা আগুন জ্বালিয়ে দিই। সব সময় যে সেই আগুন শরীরেই লাগে, তা নয়। বেশির ভাগ সময়ই লাগে মানুষের জীবনে। কখনও গ্যাসের সিলিন্ডারে, কখনও রাস্তায় হেঁটে যাওয়া মানুষকে মাড়িয়ে, আবার কখনও নিতান্তই সন্তানের জন্য বাড়ি ফেরা মায়ের মাথায় ইট ফেলে সেই আগুন আমরা ধরাই। এর পরে তাঁদের জীবনে আগুন কতটা সময় ধরে ধিকি ধিকি জ্বলে, সেই খোঁজ কে আর রাখে! ওটা একান্তই ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত ব্যাপার কিনা!
এভাবেই গতকাল রাতে রাজধানীর বেইলি রোডে ৪৬ জনের শরীরে বা শতাধিক মানুষের জীবনে আমরা আগুন ধরালাম। মনের হিসাব আর না করি। ওতে সংখ্যার স্তূপ আরও ভারাক্রান্তই হবে। আসুন, বরং স্থানকাল জানা যাক। বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ ভবনে রাত পৌনে ১০টায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে থাকে। একে একে যোগ দেয় ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিট। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, হঠাৎ বিকট শব্দ শুনতে পান তাঁরা। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভবনে। প্রথম দুই ঘণ্টা কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর থেকে বাড়তে থাকে হতাহতের সংখ্যা। আর শুক্রবারের দুপুর পর্যন্ত জানা গেছে, ৪৬ জনের প্রাণ গেছে। হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন আরও অনেকে।
ফায়ার সার্ভিস আঙুল তুলেছে গ্যাস সিলিন্ডারের দিকে। বলছে, পুরো ভবনে, এমনকি ভবনের সিঁড়িতেও অসংখ্য গ্যাস সিলিন্ডার মজুত ছিল। ফলে ভবনটিতে আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে তা দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। ওদিকে আবার ভবনটিতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
বেইলি রোডের ওই ভবনটিতে এই অধমের যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। ভবনটিতে বেশ কয়েকটি সুপরিচিত রেস্টুরেন্ট ছিল। এছাড়া ছিল বেশ কিছু জনপ্রিয় পোশাকের দোকান। ছিল মোবাইল বা প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট নানা মনোহারী পণ্যের দোকানও। শুধু যদি নিচতলার কথা বলি, তবে বলতে হয় সেখানে ছিল ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোট সে তরী’র অবস্থা। দু পাশে দোকানের ভিড়, মাঝে যে রাস্তাটিতে ক্রেতাদের হাঁটাচলার পথ ছিল, তাতে পাশাপাশি দুজনের বেশি হাঁটা যেত না। বোঝাই যায় যে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের শো-রুমগুলোকে বেশি জায়গা দিতে গিয়ে ক্রেতাদের ফেলা হয়েছিল চাপাচাপিতে।
এর কারণ অনুমান করা কঠিন কিছু নয়। বেইলি রোডের মতো জায়গায় পার স্কয়ারফিটের দাম দেখলেই তা বোঝা যায়। মানুষের অস্বস্তিতে তো আর টাকা আসে না! এই অস্বস্তি বলুন, আর পুরো ভবনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা গ্যাস সিলিন্ডারের স্তূপ, কিংবা ওই ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকা–সব তো আমার-আপনার মতো কিছু এ দেশীয় নাগরিকই করেছেন, তাই না? কীসের জন্য করেছেন? পকেটে একটু বেশি টাকা ঢোকানোর জন্য। তা দিয়ে আরেকটি বৃহস্পতিবারের রাত রাঙানোর জন্যই। সেজন্য যদি ৪৬ জন মানুষের শরীর আগুনরাঙা হয়, তবে তাই সই!
অথচ এই শহরটায় বাড়ি বানানোর সরকারি আইন আছে, আছে তদারককারী সংস্থাও। কিন্তু কে আর কাকে মানে? মালিকের বেশি বেশি টাকা দরকার। ইঞ্জিনিয়ারেরও তাই। এমনকি তদারককারী সংস্থাগুলোর কুম্ভকর্ণের মতো দিনে-রাতে ঘুমানোর জন্যও পকেট ভারি হওয়া চাই। রেস্টুরেন্টের মালিকেরও মক্কেল বসানো জায়গা বাড়ানোর স্বার্থে সিঁড়িতে সিলিন্ডারের স্তূপ রাখা চাই। সবার চাওয়া যখন এভাবে এক বিন্দুতে মিলে যায়, তখনই সাধারণ মানুষ হয়ে যায় মূল্যহীন। এই পুরো কর্মকাণ্ডে তাই আমি-আপনি সবাই-ই দায়ী। আমরাই তো পাশের মানুষটিকে চিকেন ফ্রাই খাওয়ানোর কথা বলে জীবন্ত ফ্রাই করি। সব পুড়ে মরে শেষ হওয়ার পর বলি, ‘আমাদের সার্ভিস আপনাদের কি ভালো লেগেছে? ভালো লেগে থাকলে গুগল অ্যাপে গিয়ে ফাইভ স্টার রেটিং দেবেন প্লিজ!’
এরই মধ্যে বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সব তদারকি সংস্থা নড়েচড়ে বসেছে। কেউ মামলা করবে, কেউ করবে তদন্ত। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এই ‘হত্যাকাণ্ড’ সংগঠনে আমি-আপনি শতভাগ সফল। শিক্ষক লুৎফুন নাহার লাকি ও তাঁর মেয়ে নিকিতা পুড়ে মরে গেছেন। ক্যাশিয়ার কামরুল ও ওয়েটার জাহিদুর রেস্টুরেন্টে খেতে আসা মানুষদের বের হতে সাহায্য করতে গিয়ে মারা গেছেন। কাচ্চি খেতে গিয়ে দুই সন্তানসহ পুড়ে মারা গেছেন পপি রাণী দাশ। আরও কত কত নাম। আহা, ‘সার্ভিস’ তো তবে ভালোই ছিল!
চলুন তবে, আমাদের সার্বিক উদ্যোগে একটি হত্যাকাণ্ড সুসম্পন্ন করার সাফল্যে ফাইভ স্টার রেটিং দিয়েই দেওয়া যাক! আর দিন গোনা শুরু হোক পরবর্তী ঘটনার জন্য। ততক্ষণ বিরতি।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন


হারিয়ে গেল যেসব প্রাণ
বেইলি রোডের আগুনে পুড়ল দুই বুয়েট শিক্ষার্থীর স্বপ্ন
স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেল তুষারের ছবি
