
“মনুষ্যত্বের শিক্ষাটাই চরম শিক্ষা আর সমস্তই তার অধীন। কিন্তু সমাজে এই শিক্ষার খুবই অভাব রয়েছে। তবে একজন সুশিক্ষিত মানুষের ন্যায়টাই তার জীবনের মূল হাতিয়ার। বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে আর সুশিক্ষার ব্যাখ্যার সঙ্গে মানুষকে মেলালে সমাজে সুশিক্ষা আছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়।” বহুকাল আগে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বড় বেচাল শব্দ এই মনুষ্যত্ব। কোথায় যে কীভাবে, কাকে ধরে বলা মুশকিল।
ধারণা করি, মনুষ্যত্ব শব্দটি ইংরেজি হিউম্যানিটি থেকে এসেছে, যা আদতে ল্যাটিন শব্দ হিউমিনিটাস-এর উত্তরসূরি। দেখুন, ‘মানুষ’ এর মধ্যে কেমন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে, আলাদা করাই সম্ভব না। শব্দটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে এ কারণে যে, বৃহস্পতিবার রাতে ‘এ শহরের একমাত্র বিনোদন’ রসনা তৃপ্তির বা পরিবারের ও স্বজনদের সাথে কিছু আনন্দের মুহূর্ত কাটানোর জন্য হতভাগ্য কিছু মানুষ বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজকে বেছে নিয়েছিলেন। নামে কটেজ হলে কী হবে, বাস্তবে বহুতল। শুধু বানিয়ে ক্ষান্ত তাঁরা হননি। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে শুধু বিত্তের দাপটে সেটাকে জতুগৃহ বানাতে কুণ্ঠিত বোধ করেননি। তাদের সেই লালসার বলি এখন পর্যন্ত ৪৬ জন মানুষ। যারা সেখানে জীবন দিলেন তারাও মানুষ, যারা নিলেন তারাও মানুষ। কী আশ্চর্য লীলা!
দুজনেই যদি মানুষ হয় তাহলে মনুষ্যত্বটা গেল কোথায়? একদল সংখ্যালঘু কি ইরেজার দিয়ে নিজেদের জীবনে মানুষ পরিচয় থেকে মনুষ্যত্ব শব্দটা ঘষে মুছে ফেলেছেন? এমন ঘটনার পর জোর দিয়ে বলাই যায়, হ্যাঁ। কারণ, তাঁদের অনেক ডিগ্রি থাকতে পারে, কাঁড়ি-কাঁড়ি টাকা থাকতে পারে, ক্ষমতার সীমাহীন দাপট থাকতে পারে কিন্তু মনুষ্যত্বটা নেই। বেশ কয়েক বছর আগে রতন টাটা এক প্রশ্নের জবাবে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে ভেদরেখা টেনেছিলেন। তাঁর কাছে মূলত প্রশ্ন ছিল, টাটা গ্রুপ এত পুরোনো ও বড় হওয়া সত্ত্বেও কেন সবচেয়ে ধনী নয়। জবাবে রতন টাটা বলেছিলেন, তাঁরা যখন কোনো উদ্যোগ নেন তখন সমাজের সবার কথা ভেবেই নেন, শুধু লাভের কথা চিন্তা করে নয়। আর যাদের অনেক বিত্তের অধিকারী হিসেবে বলা হচ্ছে, তারা শুধু লাভের কথা চিন্তা করেন। এজন্য টাটা উদ্যোক্তা, অন্যরা স্রেফ ব্যবসায়ী। আমাদের এখানে মনে হয়, দ্বিতীয়টিই গরিষ্ঠ। ব্যবসার সাথে কোনোভাবেই মানবিকতা বা সামাজিক হিতকে আমরা যুক্ত করতে পারছি না। ছোট থেকে বড়—কেউ এর ব্যত্যয় না।
এক হাতে যেমন তালি বাজে না, তেমনি শুধু ভবনমালিক বা ব্যবসায়ীদের ওপর একতরফা দোষ চাপিয়ে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে আগুন লাগার পর দেখুন না বিভিন্ন সরকারি সংস্থা (যারা তদারকির দায়িত্বে) কেমন হুক্কাহুয়া করতে শুরু করেছে। বলছে, এই অনুমতি ছিল না, ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল, আরও কত কী! বুঝলাম তো এত কিছু আপনারা করেছিলেন, তারপরও না মানার জন্য কী ব্যবস্থা নিয়েছেন, সেটা বলুন। এখন তো টুঁ শব্দটি করবেন। শুধু বলবেন, ওপরের চাপ ছিল, চাকরি হারানোর ভয় ছিল, আরও হ্যানা-ত্যানা। অবশ্য এগুলো না থাকলে ‘খলের ছলের অভাব হয় না’—এই বাংলা প্রবাদের জন্মই হতো না।

আসুন, ভবনটি ঘুরে বিশিষ্ট স্থপতি ইকবাল হাবিব কী বলছেন, তা শোনা যাক। সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, “আরেকটি অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হলাম। এই অবহেলাটা এতটাই ভয়াবহ অবহেলা যে, ভবনটির প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে তার ফায়ার স্কেপ, তার মূল যে সিঁড়ি—প্রতিটি আইনের ব্যত্যয় করে অত্যন্ত সরু। পুরো ভবনটি একটি আবদ্ধ ভবন। তার কোনো নরমাল ভেন্টিলেশনের কোনো ব্যবস্থা নাই। ভবনের রেস্টুরেন্টে যে জায়গাগুলোতে সবচেয়ে বেশি লাশ পাওয়ার কথা—ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের ডিজি মহোদয় দেখাচ্ছিলেন, তার প্রত্যেকটি রুম কোনো ধরনের আলো-বাতাস প্রবেশের জায়গা ছিল না। মানুষগুলো দমবন্ধ হয়ে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে মারা গেছেন। আগুনে পুড়ে যতটা না ক্ষতি হয়েছে, এই ধোঁয়ায় আচ্ছন্নতার কারণে এই মানুষগুলোর মৃত্যু ঘটেছে। এই ভবনগুলো প্রায় আটটি সংস্থার অনুমোদন নিয়ে তার কর্মপরিচালনা করতে হয়। এই প্রত্যেকটি সংস্থা এই অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ডের আসামি। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই এই ভবনের যে কমপ্লায়েন্স ইস্যু রয়েছে তার কোনোটি প্রতিপালিত না হওয়ার কারণে অনুমোদন দিতেই পারে না। দ্বিতীয়ত, এটি বাণিজ্যিক ভবন হিসেবে অনুমোদন দেওয়া সেখানে রেস্টুরেন্ট করা, আপনারা সবাই জানেন রেস্টুরেন্টের যে কিচেন সেটাকে বলে বাণিজ্যিক কিচেন। তার যে নকশা সেটা অত্যন্ত জটিল নকশা। সেটির অনুমোদন দিতে পারে না। অনুমোদন না নিয়ে এই কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সিটি করপোরেশন ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে। সেও ট্রেড লাইসেন্স দিতে পারে না। আমরা জেনেছি, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স সতর্ক করা সত্ত্বেও তিন মাসের নোটিশ দেওয়া সত্ত্বেও এই ভবনটিতে জোরপূর্বক অনুমোদন নেওয়ার ব্যাপারে বাধ্য (বাধকতা) করা হয়েছে। এবং আমরা এ-ও জেনেছি, এর সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সকল সেবা সংস্থা তার লাইসেন্স অথবা অনুমোদন অথবা কোনো ধরনের প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন। তার মানে এই মৃত্যুর জন্য যারা যারা অনুমোদন দিয়েছেন, কিন্তু সরেজমিন দেখেন নাই, যারা যারা এই কমপ্লায়েন্স ইস্যুগুলো আছে কি না নিশ্চিত করেন নাই তাদের প্রত্যেককে আমি আজকে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের পক্ষ থেকে আসামি হিসেবে ঘোষণা করতে চাই।”
দেশের একজন বিশিষ্ট স্থপতির মুখ দিয়ে এ কথা শোনার পর আর কিছু বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন আছে? বুঝিয়ে বলার হয়তো প্রয়োজন নেই, তবে প্রশ্ন আছে। ইকবাল হাবিব যাদের আসামি হিসেবে ঘোষণা করতে চান, রাষ্ট্র কি তাদের আসামি করবে? লাখ টাকার প্রশ্ন। উত্তরটা ভবিষ্যতের গর্ভে রেখেই এগিয়ে যাওয়া ছাড়া এই মুহূর্তে গত্যন্তর নেই। বেইলি রোডের আগুনের ঘটনায় এটা পরিষ্কার, মনুষ্যত্বহীন মানুষের সংখ্যা এ শহরে ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এটা নিছক একটা দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার উপায় নেই।
তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়াই যায়, সব ধরনের কমপ্লায়েন্স থাকার পরেও আগুন লাগার মতো ঘটনা ঘটতে পারত। হ্যাঁ, ঘটতে পারত। তবে এতগুলো মানুষ প্রাণে মারা যেত না। আগুনে পুড়ে মৃত্যুর বড় বৈশিষ্ট্য হলো লাশ শনাক্ত না করতে পারা; ডিএনএ টেস্টের জন্য অপেক্ষা করা। কিন্তু এক্ষেত্রে অধিকাংশ মানুষই মারা গেছেন শরীরে অতিরিক্ত কার্বন মনোক্সাইডের বিষক্রিয়ায় ও শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ায়। প্রশস্ত সিঁড়ি, খোলা জায়গা, বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকলে এদের অধিকাংশ বেঁচে যেতেন।
সমস্যা হলো সময়ের সাথে সাথে আমাদের স্মৃতিশক্তি গোল্ডফিশের মতো হয়ে যাচ্ছে। পরদিনই আমরা এমনই বিপজ্জনক রেস্টুরেন্টে বসে সমাজমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে চলেছি। একবারও ভাবছি না, যে ডালে বসে আছি সেটা যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে। বেইলি রোডের ঘটনার পর রাজধানীতে এ ধরনের বহুতল ও অপরিকল্পিত (হয়তো অননুমোদিতও) রেস্টুরেন্টে ভিড় কমেছে, এমন কোনো তথ্য অন্তত আমার জানা নেই। আসলে ‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?’ শুধু মুখে বড় বড় বুলি ঝেড়ে আর সমাজমাধ্যম কাঁপানো এবং অন্যকে দায়ী করে স্ট্যাটাস দিলে ‘পাবলিক’ খায় ভালো, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না।
মনে রাখবেন, জীবনটা আপনার। অতএব সুরক্ষার দায়িত্বও এখন আপনার। আপনি যাদের হাতে এই দায়িত্বটা সঁপে দিতে চাচ্ছেন, তাঁরা কবেই বিবেক, মনুষ্যত্ব নামের বিষয়গুলো লোভ আর দাসত্বের বাজারে বিক্রি করে দিয়ে এসেছেন।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন


বেইলি রোডে আগুন: যেভাবে আমরা ৪৬ জনকে পুড়িয়ে মারলাম
বেইলি রোডের আগুন: মৃত্যুপুরির দিকে চলমান সিঁড়ি
