শিশুকাল থেকে শুনে আসছি, পৃথিবীতে চারটি মহাকাব্য-রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়াড ও ওডেসি। এগুলোর মধ্যে দুটি ভারতের বৈদিক আর্যদের সৃষ্টি। আর এর কাহিনি, নিদেনপক্ষে চরিত্রের সাথে আমরা সবাই কম-বেশি পরিচিত। কিন্তু কিছুকাল ধরে এই প্রশ্ন মনের ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে যে রামায়ণ, মহাভারত-দুটোই মহাকাব্য। সাধারণভাবে দুটোই দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। এর বাইরেও নিশ্চয় আরও অনেক বড় ভাবনার পরিসর সেখানে আছে, আছে নানা দর্শন, নীতিজ্ঞান। এর মধ্যে মহর্ষি বাল্মীকির রামায়ণের মূল চরিত্র রাম বা উত্তর ভারতের হিন্দিভাষী অঞ্চলে রামা। যিনি হিন্দু ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী ভগবান শ্রীবিষ্ণুর সপ্তম অবতার এবং কোশল রাজ্যের রাজধানী অযোধ্যার রাজা দশরথ ও রানি কৌশল্যার সন্তান।
অন্যদিকে মহাভারত এই ধরনের একক কোনো চরিত্রকে ঘিরে গড়ে ওঠেনি। সেখানে শত শত চরিত্র এবং তাঁদের অভিমুখ, চিন্তা-সবই বিচিত্র। সে ক্ষেত্রে মহাভারতের কেন্দ্রে শ্রীকৃষ্ণের অবস্থান বলা চলে। অর্জুন, ভীম, কর্ণ এখানে মহাবীর হিসেবে স্বীকৃত। তবে পঞ্চপাণ্ডবের জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব যুধিষ্ঠির কিন্তু ধর্মপুত্র হিসেবেই পরিচিত। কুরুক্ষেত্রের যে লড়াই ধর্ম ও অধর্মের এবং শেষমেশ ধর্মই জয়ী হয় যেখানে, সেখানে ধর্মপুত্রের প্রচার সেভাবে হয়নি। যেমনটা রামের ক্ষেত্রে হয়েছে।
হাজার হাজার বছর ধরে চর্চিত বিষয়ে কয়েক দিনের পড়াশোনা ও আলাপচারিতার ভিত্তিতে মতামত দেওয়াটা নিতান্তই বোকামি বা বালখিল্য। এ বিষয়ে ‘তুলনামূলক আলোচনায় রামায়ণ ও মহাভারত’ নামে গবেষণালব্ধ একটি বই লিখেছেন ড. বিবেকানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়। বইটির ‘কথামুখ’-এ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ রমাকান্ত চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘…এই দুই মহাকাব্যের মধ্যে বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই। সেই রাজবাড়ি, সেই চক্রান্তমূলক রাজনীতি, সেই যুদ্ধবিগ্রহ, লোকক্ষয়, সেই নৈতিক উপদেশনা এবং সেই একই রকমের বিয়োগান্ত পরিণতি।’ তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে ভারতবর্ষে বিশেষ করে গো-বলয় বলে পরিচিত এলাকায় রামায়ণের মুখ্য চরিত্র রাম যতটা হিন্দুজনমনের মর্মমূলে প্রবেশ করতে পেরেছেন, মহাভারতের কেউ তা পারেননি কেন?
এ ব্যাপারে সাধারণ বুদ্ধিতে ও রামায়ণ পড়ার সুবাদে যেটুকু বুঝেছি, সেটা এমনই-রাজা দশরথ ও তাঁর তিন রানি কৌশল্যা, কৈকেয়ী ও সুমিত্রা। তাঁদের চার পুত্র-রাম, লক্ষ্মণ, ভরত ও শত্রুঘ্ন। কুচক্রী দাসী মন্থরা। সব মিলিয়ে রাজকাহিনি হলেও তার সাথে ভারতীয় সমাজব্যবস্থা ও বৃহত্তর পারিবারিক বন্ধনের অনেক মিল আছে। যে কারণে রামায়ণের কাহিনি ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভাষা-উপভাষায় লিখিত হয়েছে এবং অধিকাংশের মধ্যে প্রকাশকাঠামোয় মিলের চেয়ে অমিলই বেশি। কারণ, ওই কাহিনির ওপর কবিদের আঞ্চলিক প্রভাব অত্যন্ত বেশি। এই তালিকায় বাংলার কাশীরাম দাসও আছেন। যাঁর লেখা ‘কাশীদাসী রামায়ণ’ নামে পরিচিত। তবে এই রামের প্রভাব ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে গো-বলয়ে অনেক বেশি। সেখানে দুজন সাধারণ মানুষ দেখা হলে পরস্পরকে সম্ভাষণই করেন রাম-রাম বলে। এমনকি সবাই জানেন, ভারতের জাতির জনক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী বা মহাত্মা গান্ধী উগ্র হিন্দুত্ববাদী নাথুরাম গডসের গুলিতে নিহত হওয়ার আগে শেষ কথাটি বলেছিলেন ‘হে রাম’।
সামাজিকভাবে এতটা শক্তিশালী এই রামের রাজনৈতিক ব্যবহার কখন শুরু হলো, এটা আমার জানা নেই। অথবা হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ বা তাদের উত্তরসূরি রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস) ভারতের রাজনীতিতে রামকে ব্যবহার কখন কীভাবে শুরু করেছিল, এই তথ্য-উপাত্ত এখনো আমার উপলব্ধ হয়নি। তবে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের স্থানেই যে ‘ভগবান রামচন্দ্রের’ জন্ম—এই বিতর্ক ওঠার পরে তারা বুঝতে পেরেছিল, কী ব্রহ্মাস্ত্র তাদের হাতে এসেছে। আর একে আসলেই কাজে লাগিয়ে যিনি গো-বলয়ে বিজেপির ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতির গণভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিলেন, তাঁর নাম লালকৃষ্ণ আদভানি। ১৯৮০-র দশকের শেষ থেকে শুরু হওয়া আরএসএস, বিজেপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের আন্দোলন সাকার হয়েছে এ বছরের ২২ জানুয়ারি, ভেঙে ফেলা বাবরি মসজিদের স্থানে নতুন করে রামমন্দির নির্মাণ ও উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে। আর এর পুরোভাগে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি। আমন্ত্রণ পাননি এর মুখ্য কারিগর লালকৃষ্ণ আদভানি, তাঁর ৯৬ বছর বয়স নাকি এ ক্ষেত্রে বিরাট প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল। ঘরে বসে টেলিভিশনের পর্দায় রামমন্দিরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে আদভানি কী ভাবছিলেন, তা আজ কারও জানার উপায় নেই। তাঁর এক চোখে সাফল্যের অশ্রু থাকলেও অন্য চোখের উপেক্ষার প্রতি ঘৃণা থাকাটাই স্বাভাবিক। এর আগে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সবাই ধরে নিয়েছিলেন, তাঁর রাজনৈতিক গুরু আদভানি হতে চলেছেন ভারতের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি। কিন্তু তা হয়নি। বরং ৭৫ বছরের ওপরে কাউকে আর বিজেপির নির্বাচনী টিকিট দেওয়া হবে না—এই নিয়মের ঘোষণা দিয়ে আদভানিসহ সব বর্ষীয়ান বিজেপি নেতাকে এক লহমায় ছেঁটে ফেলেছিলেন মোদি ও অমিত শাহ। ‘ভারতরত্ন’ আদভানি যত দিন বাঁচবেন, নিশ্চয় তত দিন রামজন্মভূমি আন্দোলনের সাফল্যের সুখস্মৃতি দূর থেকে রোমন্থন করবেন। সেই রোমন্থনের মধ্যে কি একটা কাঁটা খচখচ করবে না?
ধান ভানতে এসে শিবের গীত বোধ হয় একটু বেশি গাওয়া হয়ে গেল। ভারতের লোকসভা নির্বাচনের শুরু আর মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি। সাত পর্বের এই ভোট গ্রহণ আগামী ১৯ এপ্রিল শুরু, শেষ হবে ১ জুন। ফল ঘোষণা হবে ৪ জুন। ভারতের ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন নিয়ে বিরাট আগ্রহ থাকার কথা না। কারণ, সবাই ধরে নিয়েছে নরেন্দ্র মোদি তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসতে চলেছেন। সুতরাং যা নির্ধারিত বা আগাম জানা, তা নিয়ে আগ্রহ না থাকাটাই স্বাভাবিক। মোদির ঝুলিতে কী নেই—পুরুষোত্তর রামের মন্দির ও প্রাণপ্রতিষ্ঠার সাফল্য, কাশী ও মথুরায় মন্দিরের প্রতিশ্রুতি, জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত রাজ্যের মর্যাদা বিলোপ, নাগরিকত্ব আইন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ার প্রতিশ্রুতি, নতুন পার্লামেন্ট ভবন, শ্রেষ্ঠ আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রনেতা হিসেবে মোদির ভাবমূর্তি, অনাবাসী ভারতীয়দের মধ্যে ভারতীয়ত্বের গণজাগরণ—কী নেই। দেশে বড় বড় ১২টি রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায়, যা দেশের মোট আয়তনের ৫৮ ভাগ। মোট জনসংখ্যার ৫৭ ভাগ বিজেপি দ্বারাই শাসিত রাজ্যে বাস করেন। সর্বোপরি কংগ্রেসসহ ছন্নছাড়া বিরোধী দলগুলো তো আছেই। যাদের অধিকাংশের নিজেদের চিন্তায় ঘুম হয় না। যারা মোদির কঠোর হিন্দুত্ববাদী নীতির কাছে চুপিচুপি আত্মসমর্পণ করে বসে আছে। এরপর ভোটে জিততে নরেন্দ্র মোদির আর কিছু লাগে? এত কিছুর কারণেই তো মোদি এবার বিজেপির চার শ পার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তারপরও কি ঈশান কোণে কোনো সিঁদুরে মেঘ দেখছেন নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ। এই দুজনের নাম বলছি এ জন্য যে এরাই বিজেপি, এরাই সরকার। এর বাইরে বিজেপির কাউকে গোনার মধ্যে না ধরলেও চলে। এ সময়কালে সমাজমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক কিছু ঘুরে বেড়াচ্ছে, যার অধিকাংশ বিশ্বাসযোগ্য নয়। আর ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যম গত ১০ বছরে মোদি সরকারের সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে, তাদের সরকারি প্রচারমাধ্যম বলাই ভালো। যে কারণে কংগ্রেস পার্টিসহ মোদির বিরোধী পক্ষ—কেউই মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ওপর বিশ্বাস রাখছে না। তারা নিজের স্যোশাল মিডিয়া পেজ বা চ্যানেলে বক্তব্য প্রচার করে চলেছে। ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে উপেক্ষা করার যে ধারা শুরু করেছিলেন, আজ তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতের বেশ পরিচিত একজন রাজনৈতিক কর্মী যোগেন্দ্র যাদব, যিনি কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন; একটি জরিপ তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে শেয়ার করেছেন। যেটাকে বলা হচ্ছে আরএসএস ও বিজেপির একেবারেই অভ্যন্তরীণ জরিপ। এই জরিপে মোদির চার শ পার তো দূরস্থান মাত্র ২১৪ আসনে বিজেপির জেতার কথা বলা হয়েছে।
এই জরিপই কি তাহলে মোদি ও অমিত শাহদের কপালে ভাঁজ ফেলেছে? না হলে ভোটের ঠিক আগে আগে রাষ্ট্রযন্ত্র (পড়ুন ইডি, সিবিআই, ইনকাম ট্যাক্স, এনআইএ) এত সক্রিয় হয়ে উঠবে কেন? ইডির সক্রিয়তায় বিজেপি-বিরোধী দলগুলোর দুজন মুখ্যমন্ত্রী দিল্লির অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও ঝাড়খন্ডের হেমন্ত সোরেন কারাগারে। অভিযোগ তুচ্ছ বলেই প্রচার, কিন্তু মুক্তি দূরঅস্ত। নির্বাচনের আগে কংগ্রেসের মতো বড় দলের সব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। ফলে প্রচারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে দলটির। বিষয়টি এমনই দাঁড়িয়েছে, নির্বাচনের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা বিজেপির সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের, সেখানে বীরদর্পে ঝাঁপাচ্ছে ইডি, সিবিআই-এর মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। এবং সব ঘটনাই ঘটছে অ-বিজেপিশাসিত রাজ্যে। পুবের পশ্চিমবঙ্গ থেকে মহারাষ্ট্র, দক্ষিণে তামিলনাডু থেকে উত্তরে দিল্লি পর্যন্ত কেউই বাদ নেই। সব দেখেশুনে বিরোধী দলগুলো বিজেপির নাম দিয়েছে ওয়াশিং মেশিন। যে মেশিনের মধ্য দিয়ে ‘দুর্নীতিবাজবিরোধী রাজনীতিকেরা’ গিয়ে পুরো ধোপদুরস্ত হয়ে বিজেপি নেতা বনে যাচ্ছেন অথবা তাদের সহযোগী হয়ে উঠছেন।
রামায়ণে সীতা, লক্ষ্মণসহ রাম যখন বনবাসে গেলেন, তখন রাজপুরোহিত বশিষ্ঠ অযোধ্যার সিংহাসনে আরোহণের জন্য আদেশদান করলে ভরত তা মানতে অস্বীকৃতি জানান এবং বলেন, ‘রামই দশরথের ন্যায় রাজ্যভিষিক্ত হওয়ার যোগ্য। আমি যদি অসাধু ব্যক্তিবর্গের মতো কীর্তি ও স্বর্গলাভের বিরোধী রাজ্য গ্রহণ রূপ পাপ কার্যের অনুষ্ঠান করি, তাহা হইলে প্রজাগণের নিকট ইক্ষবাকু বংশের কলঙ্ক বলিয়া গণ্য হইব।’ মহাভারতেও দেখা যায়, রাজ্যহারা পাণ্ডবদের পক্ষে অর্জুন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে জ্ঞাতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। নিজের পরমাত্মীয়দের প্রাণসংহারে তাঁর হৃদয় আর্দ্র হয়ে উঠছে। চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। আর এই কলিযুগের ভারতে হিন্দুত্ববাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও সর্বময়তা প্রতিষ্ঠারতরা ক্ষমতার মোহে অন্ধ। ভালো-মন্দ কোনো কিছুই নেই তাঁদের অভিধানে। মোদি-শাহদের এই নীতি মনে করিয়ে দেয়, প্রেম ও যুদ্ধে অন্যায় বলে কিছু নেই। আর দ্বিতীয়টি হলো—হয় তুমি আমার পক্ষে, নয়তো তুমি আমার শত্রু। এই দুটির জন্ম পশ্চিমা ভাবধারায়। প্রাচীন ভারতবর্ষ তো দূরস্থান; বর্তমান ভারতের সাথেও এর কোনো মিল নেই। তারপরও প্রশ্ন করার কেউ নেই!
কংগ্রেস বা অন্য দল ত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দিলে দুটি সুবিধা। এক, কোনো অভিযোগে (যত তুচ্ছই হোক) জেলে যাওয়া লাগবে না; দুই, লোকসভা নির্বাচনে টিকিট প্রায় নিশ্চিত। ফলে দলত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার একটা প্রবণতা স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে যাদের মধ্যে ইডির জুজু কাজ করছে। এক হরিয়ানার কথাই যদি ধরা যায়, এখানে ১০টি আসনে মধ্যে ছয়টিতে বিজেপির টিকিট পেয়েছেন কংগ্রেস ছেড়ে আসা নেতারা। অথচ ১৯৮০-র দশকে জন্ম হওয়া বিজেপি অনেকটা বামপন্থী দলের মতো করে চলত। সেখানে যোগ দিলেই এক ধাক্কায় নেতাও হওয়া যেত না, পদও মিলত না। এখন হয়তো রাম আছে, কিন্তু নীতি গেছে। দলের প্রার্থী তালিকায় জনপ্রিয় চিত্রতারকাদের বেশি বেশি করে স্থান দেওয়াটাও ওই দলের জন্য দেউলিয়াপনার শামিল। আর এতে ক্ষুব্ধ ও অসম্মানিত হন দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা। বিশেষ করে আরএসএস-এর মতো সংগঠন করে যাঁরা বিজেপি নেতা হয়েছেন, তাঁদের জন্য এই বহিরাগতদের মানা খুবই কঠিন। কিন্তু দলে তাঁদের অবস্থা ‘না গেলার, না উগরানোর’।
আর নরেন্দ্র মোদি ১০ বছর ধরে টানা ক্ষমতায়, বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপি আরও বেশি দিন ধরে ক্ষমতায়। ফলে রাজ্যে রাজ্যে দলের একাধিক প্রভাবশালী নেতা উঠে এসেছেন। হরিয়ানা, গুজরাট, কর্ণাটক, পশ্চিমবঙ্গ, রাজস্থানসহ বিভিন্ন রাজ্যে অনেক বিজেপি নেতা আছেন, যাঁরা মোদি-শাহ জমানায় নানাভাবে নিজেদের বঞ্চিত, উপেক্ষিত, অপমানিত বোধ করছেন। তাঁদের অনেকেই মনে করেন, এই জুটি আরও পাঁচ বছর টিকে গেলে তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকার। ছন্নছাড়া বিরোধী দল থাকা সত্ত্বেও মোদির পক্ষে দলের এই ক্ষুব্ধ অংশ অনেক বেশি চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
সাংবাদিক অশোক ওয়াংখেড়ের কথা শুনছিলাম ইউটিউবে। তিনি একাধিক রাজ্যে ঘুরে বেড়িয়েছেন। প্রতিদিন বহু লোকের সঙ্গে কথা বলেছেন। এর মধ্যে অন্য দলের পাশাপাশি বিজেপি ও আরএসএস নেতাদের সাথে কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, উত্তর প্রদেশ ও গুজরাটের বাইরে বিজেপির পক্ষে ২০১৯-এর জয় অসম্ভব। অশোক ওয়াংখেড়ের হিসেবে বিজেপি ২৩০ বা এর নিচে থাকবে। অর্থাৎ, ক্ষমতায় বসার জন্য ২৭২-এর ম্যাজিক নম্বরে পৌঁছাতে হলে মোদিকে আসলেই আগামী মাসখানেকের মধ্যে কোনো ম্যাজিক দেখাতে হবে।
নরেন্দ্র মোদির ভোটযুদ্ধের তূণে অনেক বাণই আছে এবং তার উল্লেখও করা হয়েছে। কিন্তু এবার নেই কোনো পুলওয়ামা। নেই কোনো ‘ঘুসকে মারেঙ্গে’র দাবি। বরং চীন সীমান্তে আছে উলটো চাপ। ভারতের ভূখণ্ডে ঢুকে পড়া চীনা সৈন্যদের সরাতে মোদি সরকার ব্যর্থ হয়েছে—এমন প্রচারও উচ্চগ্রামে চলছে। ফলে এক রাম সহায় হলেও মোদি সরকারকে রক্ষা করতে পারবেন, এমনটা বিজেপি ও আরএসএস-এর অনেকেই ভাবছেন না।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন


প্রচারের ভারত, বাস্তব ভারত
কেজরিওয়ালের গ্রেপ্তার: মোদিবিরোধীরা কি এক হতে পারবে?
