বাংলা নববর্ষ: উৎসব হোক বিধি-নিষেধমুক্ত

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:০৫ পিএম

পয়লা বৈশাখকে ঘিরে আমার ছোটবেলার দিনগুলোর কথা আজও অমলিন। মনে আছে বাড়িতে, বিটিভিতে আর ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলসহ (যেখানে তখন ছায়ানটের কার্যক্রমগুলো চলত) নানা জায়গায় আম্মুর সাথে মহড়ায় যেতাম। কিসের মহড়া, সেটা তখন  না বুঝলেও ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো…’ গানটির সাথে মাথা দোলাতাম সুরে সুরে। চেষ্টা করতাম হাত নেড়ে নাচতে। তখন একটু একটু করে বুঝতে শিখেছি, এ আয়োজনটি নতুন বছরকে বরণ করার। বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে পয়লা বৈশাখ ভোরে ছায়ানটের বর্ষবরণ। নতুনকে আবাহন করার আয়োজন।

আমার পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন ছিল ভোরে ছায়ানটের আয়োজন বৈশাখী মেলায় ঘুরে মাটির খেলনা হাঁড়ি-কুড়ি কেনা। পাতার বাঁশি আর ডুগডুগি কিনে, কাঁচা আমের ভর্তা খেতে খেতে বাড়ি ফেরা। বাড়িতে দাদি পছন্দের খাবার রান্না করে অপেক্ষায় থাকতেন। তবে ফিরেই কিন্তু খাওয়া হতো না; আগে পাখার নিচে বসে ঠান্ডা হয়ে কাঁচা আমের টক-মিষ্টি শরবত খেয়ে স্নান সেরে তারপর খাওয়া। তবে পান্তা-ইলিশ কখনোই খাইনি পয়লা বৈশাখে। বিকেলে ধানমন্ডি আট নম্বরের মাঠে মেলায় নিয়ে যেতেন চাচা। নাগরদোলা আর চড়কিতে চড়ে ভয় আর আনন্দ একসাথে পেতাম। ঘাড় নড়া তুলোর দাড়িওয়ালা বুড়ো কিনে হাওয়াই মিঠাই খেতে খেতে চাচার হাত ধরে বাড়ি ফিরতাম। আর সান্ধ্যকালীন বিনোদন নিজেদের পরিবেশনার অনুষ্ঠানসহ বিটিভির বর্ষবরণের নানা আয়োজন দেখা।

২০০১ সালের সেই ভয়াল পয়লা বৈশাখে আব্বু বিটিভির লাইভ সঞ্চালনা করছিলেন একটু দূরে লেকের ধার ঘেঁষে। দুই ছেলেসহ বন্ধুরা ছিলাম মঞ্চের পিছন দিকে বাঁ পাশের বাঁশ ধরে। গান শুনছি, গল্প করছি। আবার ছেলেরা যেন বেশি দূরে কোথাও চলে না যায়, সে খেয়ালও রাখছি। হঠাৎ একটি শব্দ, তেমন বিকটও নয়। ভাবলাম লোকের দৌড়াদৌড়ি শুরু করল কেন হঠাৎ? কিছুক্ষণ পরই বুঝতে পারলাম, বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে। মনে আছে, যে বছর বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল মৌলবাদীরা, তার পরের বছর দ্বিগুণ তিনগুণ উৎসাহে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করেছে বাঙালি। সেটাই প্রমাণ করে দিয়েছিল, এই সব ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের কোনো পরোয়া করে না বাংলার মানুষ।

বাঙালি একান্ত নিজের মতো করে ঘরোয়া আয়োজনে পালন করে বর্ষবরণের উৎসব। পয়লা বৈশাখ শুধু গান, নাচ, আবৃত্তি, নাটকে নতুন বছরকে আবাহনই নয়, এর সঙ্গে বাঙালির আর্থ-সামাজিক আচারও জড়িয়ে আছে। ব্যবসায়ীরা হালখাতার মাধ্যমে পুরোনো দেনা-পাওনা চুকিয়ে নতুন বছর শুরু করেন। ক্রেতা, সরবরাহকারী নানাজন আসেন, মিষ্টিমুখ করেন। ঘরে ঘরে নতুন পোশাক না হলেও ধুয়ে পাট করে রাখা লাল-সাদা পোশাকটি পরে ভোর ভোর বেড়াতে বেরিয়ে পড়ে মানুষ। বড়দের হাত ধরে মেলার পথ ধরে নানা রঙিন জিনিস দেখতে দেখতে বিস্মিত চকচকে চোখে হেঁটে ছায়ানটের আয়োজনে পৌঁছে যাওয়া হয় সূর্যোদয়ের আগেই। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে মঞ্চ আর শ্রোতার আসন থেকে একযোগে গেয়ে ওঠা যেন পাখ-পাখালিকেও মুগ্ধ করে। রমনার গাছের পাতাও আন্দোলিত হয় বছরের প্রথম সমীরণে। হাজার মানুষ রঙিন সাজে সেজে, নারীরা খোঁপায় ফুল, কপালে টিপ আর সাদা খোলের তাঁতের শাড়ি পরে। পুরুষেরা আটপৌরে পাঞ্জাবি পরে গুনগুন সুর ভাঁজতে ভাঁজতে আনন্দে ঘুরে ঘুরে বন্ধু-স্বজন খুঁজে খুঁজে আনন্দ ভাগাভাগি করে। একে অন্যকে আলিঙ্গন করে সম্পর্কের উষ্ণতা প্রকাশ করে। বসন্তের কোকিল বৈশাখের আগমনেও গায় মিষ্টি সুরে।

তখনো বৈশাখী মেলা বসত, তবে সেখানে থাকত না পান্তা-ইলিশ খাওয়ার ধুম। বাড়িতে বাড়িতে হাজার হাজার টাকা দিয়ে হলেও ইলিশ কেনার প্রতিযোগিতা আমাদের ছোটোবেলায় ছিল বলে শুনিনি, কখনো দেখিওনি। এখন প্রচুর ব্যাবসা-বাণিজ্য হয় পয়লা বৈশাখকে ঘিরে, সে অবশ্য মন্দ নয়। তবে করপোরেট পুঁজি যখন মাটির সংস্কৃতিকে গ্রাস করে; তখন হারিয়ে যায় প্রাণের ছোঁয়া। সব পরিবার তো নতুন পোশাক কেনার সামর্থ্য রাখে না। চারদিকের চাকচিক্য সেই সব পরিবারের সন্তানদের মন খারাপের কারণ হয়, হয় বাবা-মাকে হেয় করে দেখার কারণ, নয়তো অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ করে।

তখন আজকের মতো কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না উদ্‌যাপনের সময়ের। ছিল না সরকার কিংবা কোনো বাহিনীর চোখ রাঙানি। তখনো মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু না হলেও শিল্পীরা নিজেরাই নানা অভিনব সাজে সাজতেন, সাজাতেন। কেউ শাসন করেনি এই বলে যে, এটা করা যাবে, আর সেটা করা যাবে না। তখনো বহু বিদেশি আসত, এ নান্দনিক উৎসব দেখতে। কাউকে ভয় দেখানো হয়নি এই বলে যে, ওখানে কিন্তু বোমা ফাটতে পারে। যখন মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হলো চারুকলার শিল্পী আর সংস্কৃতিকর্মীদের আয়োজনে, তখন থেকে চৈত্র মাসজুড়ে চারুকলায় মুখোশ আর বিশাল আকারের পেঁচা, ঘোড়া, টেপা পুতুল, ময়ুর কত্ত কিছু তৈরির আরেক উৎসবও শুরু হয়ে গেল। মুখোশ, সরা বিক্রি করা অর্থে শোভাযাত্রার ব্যয় নির্বাহের চেষ্টা হতো। এ ছাড়া বহু সংস্কৃতিজন নানাভাবে অর্থের জোগান দিয়ে শোভাযাত্রাকে বর্ণাঢ্য করতেন। ছিল আন্তরিক ভালোবাসার ছোঁয়া। নানা চোখ রাঙানি ভালোবাসার উৎসবকে এতটুকুও ম্রিয়মান করতে পারেনি সংস্কৃতিপ্রেমী বাঙালির প্রাণের টানেই।

তাই এবারের বৈশাখে একটাই চাওয়া—প্রাণের উৎসবগুলো যেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে মাটির কাছাকাছিই থাকে। যেন সকলেই প্রাণে প্রাণ মিলিয়ে উদ্‌যাপন করতে পারে নববর্ষের নান্দনিক আয়োজন।

লেখক: শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী

সমাজের চোখে শিক্ষার্থী কী? এক কথায়, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ। একদিন তারা সমাজ গড়বে, রাজনীতি বলুন, অর্থনীতি বলুন, কিংবা চিকিৎসা-সশস্ত্রবাহিনী-প্রশাসন বলুন… পুরো সমাজের নেতৃত্ব দেবে, এই স্বপ্ন দেখে বলেই তো...
নারীদের ছাড়া এ দেশে কোনো আন্দোলন হয়নি। সর্বশেষ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানেও নারীরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, লড়েছেন। কিন্তু তারপর? রাজনীতিতে আসা নারীকে লক্ষ্যবস্তু করে কুরুচিকর সব বক্তব্য দেওয়া কি...
এখনও যদি ভিন্নমত দমন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সামাজিক বিভাজন ও সম্প্রীতি নষ্টের মতো গুরুতর প্রশ্ন ওঠে, তাহলে ফ্যাসীবাদী সরকারের পতন হলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্রে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে? তবে...
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যায় বর্তমানে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি। সেই ২০২২ সাল থেকেই বেশি। একটি দেশের অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক বিতর্কিত করে, দমন করার চেষ্টা করে, কেবলই পুরুষের যৌনবস্তু...
হরমুজ প্রণালিতে সৌদি আরবের তেলবাহী দুটি বিশাল ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে সোমবার রাতে ট্যাংকার দুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জানিয়েছে শিপিং ট্র্যাকিং সংস্থা। 
প্রিমিয়ার লিগ ইতিহাসে এটি যৌথভাবে সর্বোচ্চ ট্রান্সফার ফির রেকর্ড। এর আগে গত মৌসুমে নিউক্যাসল থেকে আলেক্সান্ডার ইসাককে দলে ভেড়াতে লিভারপুলও এই পরিমাণ অর্থ খরচ করেছিল। এবার চেলসি থেকে এনসোকে দলে...
জর্ডান, ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। মঙ্গলবার রাতে এসব হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড আইআরজিসি।
যশোরের শার্শায় একই বাড়িতে বাবা ও দুই শিশু সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করেছে শার্শা থানা-পুলিশ। শিশু দুটিকে হত্যার পর তাদের বাবা আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ ও স্থানীয়রা। বিষয়টি...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর