বাকস্বাধীনতা‑শূন্য এক স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পতনের দিন আজ। বাংলাদেশের ইতিহাসে চব্বিশের ৩৬ জুলাই কিংবা ৫ আগস্ট আরও একবার প্রমাণ হয়েছিল জনতার শক্তি। দীর্ঘ ১৫ বছর ভিন্নমত দমনে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, অপহরণের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার সরকার যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল, তার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত এক জাগরণ ঘটেছিল। অবশেষে জুলাই-আগস্টের টানা ৩৬ দিনের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে স্বৈরাচারের পতন হয়।
জনগণের মুক্তির এই দিনটি এসেছিল হাজার হাজার মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে। এই তো সেদিন! শহীদ পরিবারের সদস্যদের চোখ ভেজা এখনও। হাসপাতালে এখনও কাতরাচ্ছে আহতরা। জাতিসংঘ জানিয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতের সংখ্যা ১৪০০’র বেশি এবং আহত হয়েছে হাজার হাজার মানুষ।
গণঅভ্যুত্থানের পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। মানবাধিকার সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার নিয়ে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করছেন তাঁরা। রাষ্ট্রের আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও গণমাধ্যম সংস্কারের লক্ষ্যে বিভিন্ন কমিশন গঠিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক আদর্শের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রূপরেখা বা নতুন বন্দোবস্ত প্রণয়নে কাজ করছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী সনদে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ, যা বিগত সময়ে গুমের শিকার ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষা এবং গুমের ঘটনা বন্ধ করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
কিন্তু এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও কিছু বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবনতি, নারীর অধিকার, সুফি ভাবাদর্শের ওপর আক্রমণ–এসব ক্ষেত্রে উদ্বেগ রয়ে গেছে। মানুষ যদি নিরাপত্তার অভাবে সারাক্ষণ চিন্তায় থাকে, তখন সেই সমাজব্যবস্থায় বিকশিত হওয়ার সুযোগ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসে। স্বাভাবিক জীবন-যাপনে অনিশ্চয়তা, দুশ্চিন্তা ভর করে।
এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক মাজারে হামলার ঘটনা সামনে এসেছে। গত ১৮ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়, ‘দেশে গত ৪ আগস্ট থেকে পরবর্তী সাড়ে ৫ মাসে ৪০টি মাজার, সুফি সমাধিস্থল ও দরগাহে ৪৪টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলাকালে ভাঙচুর, ভক্তদের ওপর আক্রমণ, মাজারের সম্পদ লুটপাট ও আগুন দেওয়ার অভিযোগ পেয়েছে পুলিশ। ৪৪টি হামলার ঘটনাতেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২৩ জনকে। অন্তর্বর্তী সরকার মাজারে যেকোনো হামলার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।’
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, প্রেস উইংয়ের এই বিবৃতির পরও মাজারে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা থেমে নেই। কারও কারও মতে, মাজারে হামলার এই সংখ্যা আরও বেশি। এই তো গত সোমবারও (৪ আগস্ট) বরগুনার একটি মাজারে দ্বিতীয় দফায় হামলা হয়েছে। এসব থামাতে অন্তর্বর্তী সরকারের নিশ্চয়ই সদিচ্ছার অভাব রয়েছে? নয়তো পুনরাবৃত্তি হয় কীভাবে?
এদিকে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং আহত ছাত্র-জনতার কল্যাণ ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে তহবিল গঠন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবুও শোনা যায়, হাসপাতালে যথাযথ চিকিৎসা পাচ্ছে না গণঅভ্যুত্থানে আহতরা। এমনকি আহতাবস্থায় তাঁদেরকে চিকিৎসার দাবি নিয়ে রাস্তায় পর্যন্ত নামতে হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আরও একটি দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ যে, অভ্যুত্থানের এক বছরেও জুলাই শহীদ ও আহতদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করতে না পারা। অথচ সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কর্তব্যই হওয়ার কথা ছিল–শহীদ ও আহতদের একটি নির্ভুল তালিকা প্রস্তুতকরণ। কিন্তু না, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর যেমন শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নির্ভুল তালিকা প্রস্তুত করা যায়নি, এবারও তেমন চিত্রই দেখা গেল।
এ ছাড়া আইন‑শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্ম-অনীহা, নির্বিকারত্ব যেমন সামাজিক পরিসরে আলোচনায় রয়েছে, তেমনি ‘থানায় ঢালাও মামলা’ নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বাদী জানেনও না বিবাদী কে, অথচ মামলা হয়ে গেছে! পতিত ফ্যাসিবাদী যুগে যেমন গ্রেপ্তার বাণিজ্য ছিল হরহামেশা, তেমনি সাম্প্রতিক সময়ে ঢালাও মামলা বাণিজ্যের কথাও শোনা গেছে।
সম্প্রতি মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরবর্তী সময়ে অন্তত ২৯টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত আগস্ট থেকে চলতি বছর জুন পর্যন্ত গণপিটুনিতে মৃত্যু হয়েছে ১০৮ জনের। কারাগারে মৃত্যু হয়েছে ৬১ জনের। রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছে ২৩৩ জন।
এদিকে, মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কিছুদিন আগেই উদ্বেগ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। তাদের দাবি, এই সরকারের সময়েও অতীতের মতো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও অন্যায়ভাবে আটক করা হচ্ছে।
এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও যদি অতীতের মতোই প্রশ্ন উঠে, তবে তা সত্যিই দুঃখজনক বৈকি! কেননা, বিগত কর্তৃত্ববাদী সরকার ও তার নেতা‑কর্মীরা যেসব অপরাধ করেছে, সেখানে অনিয়মের পথে না হেঁটে, বরং যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে সেইসব প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনাই যথেষ্ট। প্রশ্ন উঠতে পারে এমন পন্থা থাকবে কেন? সুনির্দিষ্ট অপরাধের ভিত্তিতে তথ্য-প্রমাণসহ মামলা হোক, অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত হোক।
এখনও যদি ভিন্নমত দমন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সামাজিক বিভাজন ও সম্প্রীতি নষ্টের মতো গুরুতর প্রশ্ন ওঠে, তাহলে ফ্যাসীবাদী সরকারের পতন হলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্রে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে? তবে কি জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানর সময়ে জনমনে নতুন বাংলাদেশ; অর্থাৎ, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, সেই স্বপ্ন এখনও অধরা?
লেখক: সাংবাদিক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



