নির্বাচনকে হিন্দু–মুসলিম সংঘাতে পরিণত করতে চান মোদি

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:১৭ পিএম

এবারের লোকসভা নির্বাচনে হিন্দুদের স্বার্থরক্ষার ত্রাণকর্তা হিসেবে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। তারা এটাও স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে, হিন্দুদের স্বার্থরক্ষা মানে মুসলমানদের কাছ থেকে তাদের রক্ষা করা। 

মোদি ও তাঁর দলের মতে, ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা সংকটে পড়েছেন। কেননা মুসলমানদের সঙ্গে মিলে প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেস তাদের সম্পদ ও অধিকার লুট করে মুসলিমদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে।

গত ২১ এপ্রিল (রোববার) রাজস্থানে এক রাজনৈতিক সভায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধীরা ক্ষমতায় এলে হিন্দুদের সম্পদ কেড়ে নিয়ে ‘যাদের পরিবারে বেশি সন্তান রয়েছে’ তাদের মধ্যে বিলিয়ে দেবে। এখানে স্পষ্টতই মুসলমানদের দিকে ইঙ্গিত করেন তিনি। এরপর তিনি মুসলমানদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে অভিহিত করেন। 

মোদির এমন বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে। হিংসাত্মক বক্তব্যের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) কাছে আবেদন করেছেন অনেক নাগরিক ও সংস্থা।

এভাবে প্রকাশ্যে সাম্প্রদায়িক উসকানির জন্য মোদিকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছে পিপল’স ইউনিয়ন অব সিভিল লিবার্টিজ নামের একটি অধিকার সংগঠন।

এমন প্রতিক্রিয়াতেও কোনো কাজ হয়নি। দুদিন বাদেই দ্বিগুন উদ্যমে একই কথা বলেন মোদি। 

গত মঙ্গলবার (২৩ এপ্রিল) রাজস্থানে আরেকটি জনসভায় মোদি দাবি করেন, হিন্দুদের সম্পদ কেড়ে নিয়ে একটি ‘নির্দিষ্ট’ মানুষদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে কংগ্রেস।

ব্যাপারটি আরও স্পষ্ট করার জন্য মোদি বলেন, শিক্ষা, চাকরি, সরকারি প্রকল্প থেকে অনগ্রসর শ্রেণি, তফসিলি জাতিগোষ্ঠী ও আদিবাসীদের জন্য নির্ধারিত কোটা কেড়ে মুসলমানদের দিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করছে কংগ্রেস। এখানে এটা স্পষ্ট যে, এর মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া ও দলিত হিন্দুদের ভোট বিজেপির পক্ষে আনতে চাইছেন মোদি।  

মঙ্গলবারের সমাবেশে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বলেন, কংগ্রেস শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এর মাধ্যমে ভারতে ইসলামীকরণের ভীতি ছড়াতে চাইছেন তিনি।

রাজস্থানের সমাবেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: রয়টার্স ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা ব্যবহারে করে সমর্থন আদায়ে মোদি বেশ পটু। ‘মুসলিম’ শব্দটি উচ্চারণ না করেই তিনি মুসলমানদের চরম অবমাননা, উপহাস ও আক্রমণে সিদ্ধহস্ত। 

উদাহরণ দিলে ব্যাপারটি বোঝা যাবে। ২০০২ সালে মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে সেখানে দাঙ্গা শুরু হয়। দাঙ্গায় হাজারো মুসলমান বাড়ি ছেড়ে উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। গুজরাটের রাজ্য সরকার সেসব আশ্রয়শিবির গুড়িয়ে দিতে শুরু করে। এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে মোদি বলেন, তিনি ‘সন্তান উৎপাদনের কারখানা’ পরিচালনার অনুমতি দিতে পারেন না। 

মুসলিম শব্দটি ব্যবহার না করে মোদি বলেন, এরা হচ্ছে এমন মানুষ যাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, ‘আমরা পাঁচ, আমরা হব পঁচিশ’। এর মাধ্যমে মুসলমানদের চার বিয়ে ও পঁচিশ সন্তান থাকার বিষয়েই ইঙ্গিত করা হয়েছে।

পরবর্তি সময়ের বিভিন্ন বক্তব্যেও সরাসরি না বলে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের ক্ষেপিয়ে তুলেছেন মোদি। যেমন– ‘পিঙ্ক রেভ্যুলিউশন’ (নন ভেজিটেরিয়ানিজম) ও ‘হোয়াইট রেভ্যুলিউশন’ (ভেজিটেরিয়ানিজম) বা ‘কবরস্থান’(মুসলমানদের দাফনের জায়গা) ও ‘শ্মশান’ (হিন্দুদেশ শেষকৃত্যের জায়গা)।

রোববারের (২১ এপ্রিল) বক্তৃতায় মুসলিমদের ‘যারা অধিক সন্তান জন্ম দেয়’ ও ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে আখ্যা দেন মোদি। এতে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন যে, মুসলমানরা বাইরে থেকে এসেছে এবং এদের উদ্দেশ্য জনসংখ্যার দিক দিয়ে হিন্দুদের ছাড়িয়ে যাওয়া।

স্পষ্টতই বিপজ্জনক খেলা খেলছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচনকে হিন্দু–মুসলমান সংঘাতে রুপ দিতে চাইছেন তিনি। আর নিজেদের হিন্দুদের দল বলে সরাসরি ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছে বিজেপি। 

শুধু হিন্দুরাই বিজেপির ভোটার—মোদির বক্তব্যের সারকথা এটি মনে করা হলে খুব একটা ভুল হবে না। দলটির অন্যান্য নেতারাও এটি স্পষ্ট করেছেন। গত বছর আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বশর্মা ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি মিঞাঁদের (বাংলাভাষী মুসলিম) ভোট চান না। 

কয়েকজন বিশ্লেষক মনে করছেন, নির্বাচনের প্রথম ধাপে প্রত্যাশিত ভোট না পাওয়ায় এমন মরিয়া হয়ে উঠেছে বিজেপি। এ কারণে তারা পুরোনো কৌশলে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কৌশলটি হলো, মুসলমানেরা ভারত দখল করে নেবে—হিন্দুদের মধ্যে এই ভয় ছড়িয়ে বিভাজন তৈরি করা।

তবে, নির্বাচনের শুরু থেকেই প্রচারের সময় মোদির বক্তব্যগুলো খেয়াল করলে বোঝা যাবে, তিনি শুরু থেকেই বিরোধীদের হিন্দু-বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করতে চাচ্ছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কংগ্রেসের ইশতেহারে ‘মুসলিম লীগের ছাপ’ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ব্রিটিশ শাসনকালে মুসলমানদের অধিকার রক্ষায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। 

মোদি আরও দাবি করেন, বিরোধী নেতাদের চিন্তাভাবনা ভারতে ১৬–১৮ শতকের মোগল মুসলিম শাসকদের মতো। তারা হিন্দুদের উৎসবের সময় মাছ খেয়ে এবং হিন্দুদের পবিত্র মাসে (শ্রাবণ) মাংস খেয়ে তাদের তিরস্কার করেছেন। নিজেদের ভোটারদের তুষ্ট করতেই এমন করছেন তারা। মুসলমান ছাড়া ওই ভোটার আর কে হতে পারে? 

এভাবে বিরোধী নেতাদের হিন্দুবিরোধী বলা হলেও তা একদম অযৌক্তিক। কেননা তাদেরও তো হিন্দুদের ভোট দরকার। এদের ভোট ছাড়া কিছুই করার সুযোগ নেই। কিন্তু অযৌক্তিক হলেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের লেলিয়ে দেওয়ার কাজে মোদি ও তাঁর দল বিজেপি থামার পাত্র নয়। 

উত্তর প্রদেশে এক রোড শোতে নরেন্দ্র মোদি ও দলটির কয়েকজন নেতা। ছবি: ফেসবুক এটি স্পষ্টতই ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন। বিধিতে বলা আছে, নির্বাচনী প্রচারে কেউ ধর্ম ও সম্প্রদায় নিয়ে কিছু বলতে পারবেন না। 

এটি ভারতের গণপ্রতিনিধি আইনেরও লঙ্ঘন। ওই আইনে বলা আছে, সাম্প্রদায়িক প্রচারণা হচ্ছে অপরাধ। দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ৬ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

এই আইনের আওতায় ১৯৯৯ সালে রাজনৈতিক দল শিবসেনার প্রতিষ্ঠাতা বাল ঠাকরেকে নির্বাচনে ৬ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উসকানির চেষ্টার অভিযোগ ছিল।

এবারের নির্বাচনে বিজেপি নেতাদের এমন মন্তব্যে পদক্ষেপ নেওয়ার আবেদন করা হলেও এই ইস্যুতে নির্বাচন কমিশন একদম চুপ। এর কারণ, তারা আগেই আপস করে ফেলেছে। 

গত ডিসেম্বরে বিজেপি এমন একটি আইন পাস করাতে সক্ষম হয়, যার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটি পরিবর্তনের অধিকার এমপিদের ওপর ন্যস্ত হয়। এর আগে প্রধান বিচারপতি, প্রধানমন্ত্রী ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এই কমিটির সদস্য ছিলেন। নতুন আইনে প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ করা কোনো এক মন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে।

আর তাতেই নিজেদের স্বাধীনতা হারিয়েছে কমিশন। তখন থেকেই তারা সরকারের একটি অংশ হিসেবেই কাজ করছে। বিরোধীদের কথায় পান থেকে চুন খসলেই নোটিশ দিচ্ছে ইসি। আর বিজেপি নেতাদের বেলায় ‘সাত খুন মাফ’। এর মানে এটাই যে, ভারতের নির্বাচনের ব্যাপারে সমঝোতা আগেই হয়ে গেছে।

বিজেপির এমন উসকানিমূলক প্রচার চলতে থাকায় মুসলমানদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যাতে তারা প্রতিক্রিয়া না জানায়। কেননা এতে হিন্দুরা বিজেপির দিকেই যাবে। মুসলমানরা চুপ; চুপ নির্বাচন কমিশন এবং আদালতও। আর এই নিরবতায় আমরা ভারতে গণতন্ত্রের মৃত্যুর শোক প্রকাশ করছি।

লেখক: দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দির শিক্ষক ও সাহিত্য-সংস্কৃতি বিশ্লেষক

নিবন্ধটি আল–জাজিরা থেকে নেওয়া  

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি দীর্ঘদিন ধরেই একটি মৌলিক নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আর তা হলো ‘সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।‘ কিন্তু বৈশ্বিক ভূরাজনীতির পরিবর্তন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির...
ভারতের সঙ্গে ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী ভাগাভাগি এ অঞ্চলের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও ন্যায্য পানি–অধিকারের প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপড়েন, ক্ষমতার অসমতা এবং...
নেপালসহ দেশে দেশে সরকার পতন ও এরপরের ‘খিচুড়ি’ হয়ে যাওয়া পরিস্থিতিতে সেসব অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো না হয় ‘ডাল’ আর ‘চাল’-এর ভূমিকা নিয়েছে। আগুন হিসেবে কাজ করেছে জেন জি-র ক্ষোভ। কিন্তু খিচুড়ি রান্নার...
‘বিপ্লব, নাকি করপোরেট শক্তির খেল’–প্রশ্নটা আজ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির সামনে এক বিরাট ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চার বছরের মধ্যে ভারতের তিন প্রতিবেশী দেশ–শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং নেপাল–গণআন্দোলনের জেরে...
কক্সবাজারের উখিয়ায় ইনানী মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাটুয়ারটেক এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
বাতাসে আদ্রতা বেড়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে দশ ভাগ। দিন ও রাতের তাপমাত্রা এক থেকে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তি। তাই অক্টোবরে এবার রাতে অসহনীয় গরম অনুভূত হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, নভেম্বরের শেষে শীত শুরু...
সাপ্তাহিক ছুটির দিন হলেও আজ খোলা থাকছে সরকারি দপ্তরের পাশাপাশি ব্যাংক। একই সঙ্গে স্বাভাবিক থাকছে শেয়ারবাজারের লেনদেন। দুর্গাপূজার ছুটি সমন্বয়ের কারণে এ পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।
শারদীয় দুর্গোৎসবের মহাসপ্তমী আজ। এ বছর পঞ্জিকা অনুযায়ী দুই দিন তিথি থাকায় আগামীকালও উদযাপিত হবে মহাসপ্তমী। সপ্তমী পূজার সবচেয়ে প্রধান এবং প্রথম আচার অনুযায়ী সকালে শাস্ত্রীয় বিধি অনুসারে নবপত্রিকা...
লোডিং...

এলাকার খবর