গত ১৯ এপ্রিল থেকে ভারতে শুরু হয়েছে ১৮তম লোকসভা নির্বাচন। প্রথম পর্বের নির্বাচনে ২১টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ১০২ আসনে ভোটগ্রহণ হয়েছে। ঠিক একই আসনে ২০১৯ সালের নির্বাচনে এবারের তুলনায় চার শতাংশ বেশি ভোট পড়েছিল। ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) এই তথ্য জানিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছে এবং বলেছে, ভোটার তালিকা আরও স্বচ্ছ করা দরকার। আর ভোটারদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো দরকার।
প্রথম ধাপের নির্বাচনী এলাকাগুলোতে মোট ভোটার ছিল ১৬ কোটি। ভোট পড়েছে ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ। অথচ ২০১৯ সালে এই একই এলাকার কেন্দ্রগুলোতে মোট ভোট পড়েছিল ৭০ শতাংশ। ইসিআই বলছে, তামিলনাড়ু ও উত্তরাখণ্ডসহ ১৯টি কেন্দ্রে আগের নির্বাচনের তুলনায় এবার কম ভোট পড়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস বলছে, তামিলনাড়ুতে ৩ শতাংশ কম ভোট পড়েছে, আর উত্তরাখণ্ডে ভোট কম পড়েছে ৫ দশমিক ১৬ শতাংশ। ভোটের হার কমেছে রাজস্থানেও। সেখানে ভোটের হার কমেছে ৬ শতাংশ। ভোটার উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কম ছিল উত্তর প্রদেশ ও বিহারের কেন্দ্রগুলোতেও। একমাত্র ব্যক্তিক্রম ছিল ছত্তিশগঢ়ের বস্তারের একটি কেন্দ্র, যেখানে ২০১৯–এর তুলনায় বেশি ভোট পড়েছে।
এই ব্যতিক্রমটুকু বাদ দিয়ে বলা যায়, সামগ্রিকভাবে ভোটার উপস্থিতি কমে গেছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তেমন কোনো হেলদোল অবশ্য দেখা যায়নি। এ নিয়ে মাথাব্যাথা নেই সাধারণ মানুষেরও। তবে ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়াকে ‘উল্লেখযোগ্য পতন’ বলে অভিহিত করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। একই সঙ্গে এই আপাত স্বাধীন প্রতিষ্ঠানটি উদ্বেগ ও আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে।
শুধু উদ্বেগ–উৎকণ্ঠা জানানোই শেষ কথা নয়। এর পেছনে কারণ উদঘাটন করও জরুরি। বিশ্লেকেরা বলছেন, ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়ার একটা বড় কারণ হতে পারে মাত্রাতিরিক্ত গরম ও তাপপ্রবাহ। বেশ কয়েকটি এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পেরিয়ে গিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ভোট দেওয়া ছিল সত্যিই কষ্টকর। অনেকেই এই কষ্ঠ মানতে চাননি। তাই ভোট দিতেও যাননি। অনেক ভোটার অভিযোগ করে সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে বলেছেন, ‘ভোটকেন্ত্রে পান করার মতো পানির ব্যবস্থাও ছিল না। তীব্র গরমে গলা শুকিয়ে নাজেহাল হয়ে পড়েছিলেন অনেক ভোটার।’
তবে এসবের বাইরেও সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি ভোটারদের উদাসীনতা। রাজনৈতিক দলগুলো হয়তো মানতে চাইবে না, কিন্তু সাধারণ মানুষদের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যায়, প্রচলিত দল কিংবা নেতাদের প্রতি তাদের মোটেও আস্থা নেই। যার প্রতি আস্থা নেই, তাকে জিতিয়ে আনার জন্য এত কষ্ট করে রোদে পুড়ে ভোট দিতে যাবে কোন আহাম্মক?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামত–বিশ্লেষণগুলো পড়লেও এর সত্যতা মেলে। বেশির ভাগ বিশ্লেকের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো এবার প্রচারের ক্ষেত্রে বহু ধরনের বিভাজন সৃষ্টি করেছে। বিরোধীদের গালিগালাজ করে শুধু বিদ্বেষ ছড়িয়েছে। এসব ভালো চোখে দেখেনি সাধারণ ভোটার। তাছাড়া অনেক নেতার দল বদল করা ‘ডিগবাজি’ স্বভাবকেও ভালোভাবে গ্রহণ করেনি ভোটারেরা।
মনোবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক কর্মী যোগেন্দ্র যাদব একটি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো ঐতিহ্যবাহী মিছিল–সমাবেশের মাধ্যমে প্রচারণায় না গিয়ে এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। আর এই কাজ করতে গিয়ে তারা ব্যাপক আকারে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়েছে।’
কিন্তু মানুষ তো এত বোকা নয়। আগের চেয়ে মানুষ বিদ্যা–বুদ্ধিতে একটু হলেও এগিয়েছে নিশ্চয়। তাই তারা রাজনৈতিক দলগুলোর এসব উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণার ফাঁদে পা দেয়নি। তারা নিরবে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং কোনো দলকেই ভোট দিতে যায়নি।
ভারতের প্রথম দিকের নির্বাচনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশটিতে বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় লোকসভা নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম ছিল। পরে ১৯৮০–এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ যখন বেশি করে নির্বাচনে অংশ নিতে শুরু করল, তখন থেকে লোকসভা নির্বাচনেও ভোটার উপস্থিতি বাড়তে শুরু করে। তাই মধ্য আশি থেকে ৯০–এর পুরো দশককে ‘দ্বিতীয় গণতান্ত্রিক উত্থান’ বলে অভিহিত করেছেন নির্বাচনবিষয়ক গবেষক সুভাষ পলিশিকর।
কিন্তু এবারের লোকসভা নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি এতটাই কমে গেছে যে, খোদ নির্বাচন কমিশনও বাধ্য হয়ে উদ্বেগ–উৎকণ্ঠা ও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
নির্বাচন কমিশন বলছে, ২০০৪ সালের নির্বাচনে ভোটের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ১৯৯৯ সালের নির্বাচনের তুলনায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ কম।
আর এবারের নির্বাচনে গুজরাট, বিহার ও উত্তর প্রদেশসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে ভোটার উপস্থিতি ২০০৪ সালের নির্বাচনের চেয়েও কম ছিল। হিন্দুস্তান টাইমস বলছে, এসব রাজ্যে ভোটার উপস্থিতি ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে।
ভারতের সংসদীয় নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছিল ২০১৪ সালে। ওই বছরের নির্বাচনে ৬৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছিল, যা ২০০৯ সালের নির্বাচনের তুলনায় ছিল ৭ শতাংশ বেশি। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ২৮২টি আসনের জয় নিয়ে ক্ষমতায় বসেছিল বিজেপি। আর ২০১৯ সালের নির্বাচনে মোট ভোট পড়েছিল ৬৪.১৩ শতাংশ।
বিজেপি এবারেও ক্ষমতায় থাকার জন্য অতিমাত্রায় আত্মপ্রত্যয়ী। আর বিরোধী কংগ্রেসও ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য আত্মবিশ্বাসী। তাদের আত্মপ্রত্যয়ী ঢংকানিনাদের মধ্যে গ্রামে গ্রামে ধান কাটায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে সাধারণ মানুষ। ভোট দেওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে বিশেষ মাথাব্যথা নেই।
তাদের এই মাথাব্যথা না থাকা কিংবা ভোটের প্রতি উদাসীনতা প্রদর্শনের পেছনে শুধুই কি অতিমাত্রায় গরম, ভোটকেন্দ্রে পানির ব্যবস্থা না থাকা ও ফসল কাটার মৌসুমের ব্যস্ততাই দায়ী? নাকি রাজনৈতিক দলগুলোর লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি, হিংসা, ঘৃণা, বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ানোর জন্য সাধারণ মানুষদের আস্থা কমে যাওয়াও দায়ী, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। মণিপুর রাজ্যের বেশ কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে সহিংসতা হয়েছে এবং ১১টি কেন্দ্রে ভোট বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া নাগাল্যান্ডের ছয় জেলায় ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতি ‘শূন্য’ ছিল বলেও খবর প্রকাশ করেছে দ্য হিন্দু, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসসহ বেশ কয়েকটি সংবামাধ্যম। অর্থাৎ এসব ভোটকেন্দ্রে একজন ভোটারও ভোট দিতে যাননি।
এভাবে ভোটার উপস্থিতি কমতে কমতে একসময় যদি কোনো মানুষই আর ভোট দিতে ভোটকেন্দ্রে না যায়, তখন কী হবে? মানুষ যদি ভোট ব্যবস্থাকেই প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশটিতে গণতন্ত্র টিকবে তো?
লেখক: সহ–সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন


মোদি-বিরোধীরা এতটা ছন্নছাড়া কেন?
মোদি আবার মুসলিম বিরোধিতায় ফিরলেন?
ক্ষমতার পালা বদলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে কি পরিবর্তন আসবে?
